বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা। এখানে আধা কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে ৪টি ইটভাটা। বিরোধপূর্ণ জায়গা ও কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ফলে ১টি ইটভাটা বন্ধ থাকলেও বাকি ৩টির ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে ইলশা এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর, স্কুল-মাদ্রাসা। তবে ইটভাটার মালিকেরা প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পান না।
বিগত দিনে এসব ইটভাটা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর গুটিয়ে দিলেও আবারো গড়ে উঠেছে। এলাকার পরিবেশ নষ্ট ও কাঠ পোড়ানোর অভিযোগে ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা প্রশাসন বরাবরে আবেদন করলেও এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। গত ২ মার্চ জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর, বাঁশখালী প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেছেন ইলশা গ্রামের মো. ইউসুফ, ওসমান, রশিদ, মহিউদ্দিন, নাছির, রহমত, ছুর আহমদসহ অনেকে। তাদের আবেদন, পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। ইলশা এলাকার আহমদ ছগির, সরোয়ার আলম ও মিজানুর রহমানসহ কয়েকজন বলেন, একই স্থানে ৩/৪টি ইটভাটা। অপরদিকে তারা সকল ফসলি জমি চড়া দামে নিয়ে ফেলায় এখন ধানি জমি নেই বললেই চলে। আগে যেখানে ২/৩ বার ধান হতো, সেখানে বর্ষা মৌসুম ছাড়া আর ধান উৎপাদন করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাঁশখালীতে ১১টি ইটভাটা রয়েছে। তার মধ্যে চাম্বলের এনটি ব্রিক ও ইজ্জতনগরের এমবিএম ব্রিক-২ এর অনুমোদন থাকলেও রত্নপুরের মেসার্স চৌধুরী ব্রিক ম্যানু.-৪ ব্রিক, ইলশার মেসার্স এমবিএম ব্রিক ম্যানু., সাদাত ব্রিক, মেসার্স খাজা আজমীর ব্রিক, মেসার্স চৌধুরী ব্রিক ওয়ার্কশপ, এলাহী ব্রিক ম্যানু. লিমিটেড, মেসার্স ওয়ান স্টার ব্রিক, জামাল ব্রিক ও মেসার্স ফাইভ এমটিএম অবৈধভাবে ইট উৎপাদন করছে। তবে এদের মধ্যে কয়েকটি ইটভাটা উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
বাঁশখালীর চাম্বলে একটি, শেখেরখীলে একটি, সরলে একটি, বাহারছড়ায় পাঁচটি, লটমনিতে চারটি ও পুকুরিয়ায় দুটি ইটভাটা আছে। এর মধ্যে বাহারছড়ার দুটি ও পুকুরিয়ার একটি ইটভাটা আপাতত উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। প্রতিটি ইটভাটায় কয়লায় ইট পোড়ানোর কথা থাকলেও বেশিরভাগই বনের কাঠ পুড়িয়ে জলকদর খালের মাটি দিয়ে ইট উৎপাদন করছে। প্রতিটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে জনবসতিপূর্ণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-সংলগ্ন এলাকায়। ইটভাটার ধূলিকণায় গাছ ও বাড়িঘরের অবস্থা বেহাল।
স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও জরিমানা দিয়ে পুনরায় ইট উৎপাদন করে ইটভাটাগুলো। স্থানীয় মিজান অভিযোগ করেন, বাহারছড়ায় গড়ে ওঠা ইটভাটা নিয়ে একের এক সংঘর্ষের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫/৬ জন মারা গেলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে ইটভাটাগুলো। এছাড়া ইটভাটায় ট্রাক চলাচল করার কারণে সড়কগুলোর বেহাল অবস্থা।
সরলের মিনজীরিতলায় লবণ মাঠের পাশে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। গন্ডামারার নবনির্মিত এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত ৪০০ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনটি এই ইটভাটার চিমনির পাশ দিয়ে গেছে। লবণ মাঠ, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাছে হলেও মেসার্স চৌধুরী ব্রিকস ম্যানুফ্যাকচারের পরিচালক মহিউদ্দিন চৌধুরী জাহাঙ্গীর জানান, এই ইটভাটার অনুমোদন দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম না মেনে অনুমোদনহীন যেসব ইটভাটা কার্যক্রম চালাচ্ছে তা আমি সমর্থন করি না। আমার প্রত্যাশা, অবৈধ ইটভাটার ব্যাপারে প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বাঁশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ইটভাটার ধোঁয়ার ফলে ফলগাছে মুকুল নষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া ধানি জমিতে ইটভাটা করা বৈধ হতে পারে না। ইটভাটায় টপ সয়েল নিয়ে ফেলায় ফসল উৎপাদনে ঘাটতি হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান চৌধুরী বলেন, পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া কোনো ইটভাটা বৈধ নয়। তাদের বিরুদ্ধে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মুফিদুল আলম (উপ-সচিব) সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রাম জেলায় অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে কার্যক্রম চলছে। মহামান্য হাই কোর্টের আদেশ অনুসারে পরিবেশ অধিদপ্তর সবগুলো ইটভাটা উচ্ছেদ করবে। ইতোমধ্যে লোহাগাড়া-চকরিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাঁশখালী উপজেলায় অবৈধ ইটভাটাগুলো উচ্ছেদ করা হবে।












