বাঁচাই পৃথিবী, বাঁচাই পরিবেশ

বনশ্রী বড়ুয়া রুমি | রবিবার , ৫ জুন, ২০২২ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

নিভন্ত এই চুল্লীতে মা
একটু আগুন দে,
আরেকটু কাল বেঁচে থাকি
বাঁচার আনন্দে।

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ দূষণের মাত্রা যখন চরম পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে তখনই অতিমারীর এই মহা সংকট সামনে উপস্থিত। যখন বাঁচার সমস্ত দ্বার বন্ধ হয়ে আসছে তখন কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার মতো অসহায় মানুষের একটাই চাহিদা-‘আরেকটু কাল বেঁচে থাকি বাঁচার আনন্দে’।
প্রকৃতিকে জয়ের নেশায় মেতে উঠেছিল মানুষ। বিজয় নিশান গেঁথে দিয়েছিল সর্বত্র। সর্বস্তরে মানুষের ব্যাপক বিস্তার। মানুষ আধিপত্য করেছে প্রকৃতি ও পরিবেশের উপর। জলে-স্থলে, মহাশূন্যে এমন কি বিশ্ব পরিমণ্ডলের সবখানে জয়ের দামামা বাজাতে গিয়ে এখন পরাজয় ঢেকে এনেছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার প্রতি মানব সভ্যতার উদাসীনতা, অবহেলা, নিষ্ঠুরতাই আজ এই মহামারীর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহামারীর সংক্রমণ দিনে দিনে বাড়ছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে বিজ্ঞান। অসহায়ত্ব মেনে নিয়েছে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ।

শোষণের মাত্রা সীমাহীন। নির্বিচারে হত্যা করেছে প্রাণী। এ হত্যাযজ্ঞে রক্ষা পায়নি মানুষও। হিংসা হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ কেড়ে নিয়েছে সহস্র প্রাণ। বর্তমানে প্রাকৃতিক সম্পদের জলজ কি বনজ কোনোটায় সুরক্ষিত নয়। ভয়াবহ হুমকির মুখে আমাদের পরিবেশ। অরণ্যে এখন আর পাখি ডাকে না। মানুষ প্রকৃতির সাথে যথেচ্ছা ব্যবহার করছে নিজ স্বার্থ চরিতার্থের নেশায়।

গাছপালা কেটে কেটে অরণ্য হয়েছে মরুভূমি, ধু ধু প্রান্তর। গবেষণায় পরিলক্ষিত হয় গত ৬০ বছরে ৮০টিরও বেশি প্রজাতির প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়েছে। বিলুপ্ত হয়েছে কয়েক’শ গাছ।

প্রকাশ্যে পাহাড় কেটে মাটি লুট করছে, জমি দখল করে গড়ে তুলছে অবৈধ আবাসস্থল। নির্মাণ হচ্ছে বহুতল ভবন, কারখানা। পাহাড় এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য্য এখন পাহাড়খেকো ভূমিদস্যুদের দখলে।

বন্যপ্রাণী কিংবা অভয়ারণ্যে আজ এ কেমন হুংকার? মানব সভ্যতা কি এটাই চেয়েছিল? পরিবেশের এই বিপর্যয় মানব সভ্যতার জন্যে অভিশাপ। প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ হেক্টর জমি মরুভূমিতে পরিনত হচ্ছে।

নদী নালা, খাল বিল যেদিকেই চোখ যায় সেখানেই নদী দখল, দূষণ, বালু উত্তোলন, প্রবাহস্বল্পতা আর ভরাটের চিত্র। এই কি সেই প্রকৃতি! কোথায় সেই কলকল ধ্বনিকারী স্রোতাস্বিনী?

নদীতে ভাসছে মৃত মাছ। অতিরিক্ত কীটনাশক ও কারখানার বর্জ্য কি এর জন্যে দায়ী নয়? নদীতে ভাসছে পশুপাখি এমন কি মানুষেরও লাশ! মানুষের ব্যবহৃত প্লাস্টিক যত্রতত্র ফেলার ফলে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে অসংখ্য প্রাণীকুল। প্লাস্টিকে পেঁচিয়ে মৃত্যু হচ্ছে বোবা প্রাণীর। একদিকে ধ্বংস হচ্ছে হাজারো প্রাণ অন্যদিকে জীব ও অনুজীবের ধ্বংস হচ্ছে প্রজনন ক্ষমতা।

মানুষ জাতি একদিন দ্বিখণ্ডিত হবে প্রকৃতির বিচারে। প্রকৃতির উপর তাণ্ডব চালিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। প্রকৃতির কান্না আমরা হয়ত টের পাই না। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এই অসহনীয় নির্যাতনই বিশ্বকে ধাবিত করেছে মহামারীর দিকে।

কোভিড -১৯ এর হাতে গোটা বিশ্ব আজ জিম্মি। চার দেয়ালে হাঁসফাঁস করছে কিন্তু বাঁচার পথ বন্ধ। এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তির পথ অজানা। এই সংকট শুধু সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের নয়। এই সংকট পুরো পৃথিবীবাসীর।

বাড়ছে পৃথিবীর উষ্ণতা। ভূগর্ভের সঞ্চিত জল ও জ্বালানি তলানিতে ঠেকছে। খুব শীঘ্রই মানব সভ্যতা পড়বে আরও ভয়ানক বিপাকে। ওজোন স্তরের আয়তন সংকোচনের ফলে সূর্যের মারাত্নক অতিবেগুনী রশ্মি প্রাণীজগৎকে স্পর্শ করছে। প্রাণীকুল হয়ে উঠেছে বিপন্ন।

সমপ্রতি ‘ইয়াস’ ভাসিয়ে নিয়েছে নিম্নাঞ্চল। প্রাণহানিও ঘটেছে। কিছু কিছু এলাকায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে সম্পদ ও জীবনের উপর আসে করাল থাবা। বিনষ্ট হয় ফসল। ধ্বংস হয় প্রাকৃতিক সম্পদ। ভয়াবহ নদী ভাঙনের ফলে অনেকে হারায় বাস্তুভিটা।

এই বিনাশ, এই ক্ষতি কেন? যদি যথাযথ যত্ন আর সুরক্ষা কিংবা এর সঠিক ব্যবহার হতো, যদি বিশ্বের পরিবেশ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকতো তাহলে কি এই প্রাণঘাতী দেখতে হতো? অপরিকল্পিত উন্নয়ন মূলক কর্মকাণ্ডের ফলে প্রকৃতি ও চারপাশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে যার কারণে আজ অস্তিত্ব ধরে রাখা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে।

এই বিপর্যয় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র সচেতনতা। থামাতে হবে এই অত্যাচার। পরিবেশই মূলতঃ প্রাণের ধারক, জীবনীশক্তির বাহক। প্রকৃতির লীলা একেক ঋতুতে একেক রকম। পরিবেশ ও মানুষের ভেতর রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। মানুষ প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ভয়াবহ তাণ্ডবলীলায় ধ্বংস করছে। যার ফলে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচতে হলে বাঁচাতে হবে পৃথিবী। বাঁচাতে হবে প্রকৃতি ও পরিবেশকে। আসুন প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সোচ্চার হই। প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। বাঁচবে প্রাণিকূল। ভারসাম্য রক্ষা হবে এই ভূমণ্ডলের।

সৃষ্টিকর্তা তাঁর অপার মহিমা দিয়ে এই পৃথিবীর সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিই একে অপরের পরিপূরক। মানুষ, উদ্ভিদ, প্রাণী, নদী, জল, পাহাড়, সবুজ অরণ্য সকল কিছুই সৃষ্টির শুরু থেকে প্রতিকূল পরিবেশে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে একে অপরের উপর নির্ভরশীল।

সবুজ নগর, বিশুদ্ধ পবন
দাও হে ধরনী;
দাও আর একটিবার।

মানবোত্তম স্কট নিসনের ভাষায়, ‘জীবনে এমন একটি মুহূর্ত আসবে,আপনার ভেতরের কেউ আপনাকে রক্তাক্ত করতে থাকবে নিরন্তর। মানুষের জন্যে কিছু করে যাওয়ার তাগিদে। ওই মুহূর্তটিতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে হবে আপনি কোন পথে যাবেন’?

সুতরাং এখনই সঠিক পথে আসুন। কৃতজ্ঞতা জানান প্রকৃতির কাছে। নত হোন এই বিপুল সম্ভারের কাছে। মনে রাখতে হবে পারষ্পরিক গূঢ় মিথস্ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে মানব সভ্যতা সুখ ও সমৃদ্ধির মুখ দেখবে। মানুষের মঙ্গলে, গোটা বিশ্বের কল্যাণে আসুন সকল অত্যাচার, হিংস্রতা, হানাহানি, দস্যুপ্রবৃত্তি ছেড়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের যত্ন নেই। আগামী প্রজন্মের জন্যে রেখে যাই একটি সুস্থ ও নিরাপদ পৃথিবী। আসুন রুখে দেই অতিমারী, মহামারী কিংবা ভয়াল তাণ্ডব। বাঁচাই পৃথিবী, বাঁচাই পরিবেশ।

লেখক : কবি ও শিক্ষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধকন্টেনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
পরবর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে