বহুল প্রত্যাশার ভোট কাল

সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি হবে গণভোট চট্টগ্রামে ভোটকেন্দ্র ১৯৬৫টি, প্রশাসন প্রস্তুত সমন্বয়ে প্রযুক্তি, নিরাপত্তার চাদরে পুরো জেলা লক্ষ্য সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়া : বিভাগীয় কমিশনার

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হচ্ছে আগামীকাল। জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে নাগরিকদের অনুমোদন নিতে একই দিনে গণভোটও হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে তাই প্রত্যাশাও বেশি। মানুষের প্রত্যাশা, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন, বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। এ ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টাও আশ্বাস দিয়েছেন।

অপেক্ষার প্রহর শেষ। রাত পোহালেই বহুল কাঙ্ক্ষিত সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে ভোটগ্রহণ। একইসঙ্গে হবে গণভোট। এজন্য ভোটারদের আলাদা একটি গোলাপি রঙের ব্যালট পেপার দেওয়া হবে, যেখানে জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কারের উপর ভিত্তি করে চারটি নির্দিষ্ট প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

চট্টগ্রামে ১৬ সংসদীয় আসনে ভোটাররা স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে সনাতন পদ্ধতিতে (ব্যালট পেপার) নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। নানা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে শেষ হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। নির্বাচনী মাঠে এখন ভোটার ও প্রার্থীদের ভোটের ক্ষণের অপেক্ষা। উৎসবমুখর পরিবেশে আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই নির্বাচন। এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় আজ বুধবার সকাল থেকে প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছে যাবে ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা, বিশেষ করে প্রিসাইডিং অফিসারগণ ব্যালট পেপারসহ ভোটের এসব সামগ্রী নিয়ে আজ সকাল থেকে কেন্দ্রে অবস্থান করবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণের জন্য আগে থেকেই অবস্থান নিয়েছেন।

চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র এবং ১২,০০১টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণের জন্য ৪০ হাজারের বেশি ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা (প্রিসাইডিং, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার) ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪০ হাজারের বেশি সদস্য এবার ভোটকেন্দ্র ও ভোটের নিরাপত্তার দায়িত্বে মাঠে রয়েছেন।

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও এলডিপিসহ প্রার্থীদের অভিযোগপাল্টা অভিযোগ ছাপিয়ে চট্টগ্রামের মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা বলছেন। বিশেষ করে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও এলডিপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থী, ভোটার এবং কর্মীসমর্থকদের মধ্যে চলছে ভোটের সর্বশেষ হিসাবনিকাশ।

১৬ আসনে ১১৫ প্রার্থী : চট্টগ্রামে ১৬ আসনে এবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, এলডিপি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, গণফোরাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, সুপ্রিম পার্টি, বাসদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলজেএসডি, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ বিভিন্ন দলের এবং স্বতন্ত্র মিলে এখন ১১৫ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ৫০টি দল।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসার ড. মো. জিয়াউদ্দীন আজাদীকে বলেন, এবার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের পাশাপাশি একাধিক সংস্থার স্ট্রাইকিং ফোর্স রয়েছে। পাশাপাশি র‌্যাবের একাধিক টিমও দায়িত্বে রয়েছে। কোথাও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে কোনো না কোনো বাহিনী উপস্থিত হয়ে যাবে। এবার বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আমাদের মনোবল অটুট আছে। আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে পারব। ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসেন এজন্য সব জায়গায় প্রচারণা চালিয়েছি। এমনকি হিন্দুবৌদ্ধখ্রিস্টান ঐক্য ফ্রন্ট এবং ঐক্য পরিষদের সাথেও বৈঠক করেছি, যাতে তারা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন। তাদের কোথাও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বা ভয়ের কিছু নেই। নির্ভয়ে যাতে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন সেইভাবে ব্যাপক সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করেছি। আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কোথাও বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ; সরকারি সেবক হিসেবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। পুরো জেলাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকতে সেনাবাহিনী, আনসার, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীসহ বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। মাঠে কাজ করছেন প্রায় ১১৫ জন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। জেলার ১৯৬৫টি কেন্দ্রে বর্তমানে ৪০ হাজারের বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।প্রতিটি কেন্দ্রে ১৩ জন আনসার সদস্য এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বিশেষ করে সন্দ্বীপের উড়িরচর, ফটিকছড়ি এবং বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকাসহ জেলার সব দুর্গম ও দূরবর্তী ভোটকেন্দ্রগুলোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, এসব এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। জেলা প্রশাসক বলেন, সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, ভোটের ফলাফল সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পুরোপুরি না পৌঁছানো পর্যন্ত কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্র ত্যাগ করতে পারবেন না। তিনি জানান, এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে এবং কেন্দ্রভিত্তিক প্রত্যেকের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

সমন্বয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার : সমন্বয় জোরদার করতে বিভাগীয়, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় সেল গঠন করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের কার্যক্রম জেলা সদর থেকে অনলাইনে সরাসরি তদারকি করা হবে। জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, বেশ কয়েকজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রের রিয়েল টাইম মুভমেন্ট ট্র্যাক করা সম্ভব হবে।

নিরাপত্তা চাদরে পুরো জেলা : নিরাপত্তা ব্যবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। আনসার বাহিনী নিজস্ব নিরাপত্তা অ্যাপ তৈরি করেছে, পুলিশ সদস্যরা বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করছেন এবং বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের কাছেও বডিওর্ন ক্যামেরা থাকবে। কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এবার কোনো নাটক করার সুযোগ নেই।

লক্ষ্য উৎসবমুখর পরিবেশ : ডিসি জোর দিয়ে বলেন, প্রশাসনের লক্ষ্য কেবল ভোট গ্রহণ বা ফল ঘোষণা নয়, বরং ভোটাররা যেন ভয়ভীতি ছাড়া কেন্দ্রে গিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।

জরুরি সাড়া ও গুজব প্রতিরোধ : জেলা প্রশাসক জানান, কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে স্ট্রাইকিং ফোর্স মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে। এছাড়া গুজব প্রতিরোধে সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোনো সন্দেহজনক লিংক বা তথ্য পাওয়া মাত্র অ্যাপের মাধ্যমে তার সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে।

ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি এবং নির্বাচনী এলাকায় ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছে গেছে উল্লেখ করে চট্টগ্রামের সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ বশির আহমেদ আজাদীকে বলেন, ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী আগে থেকেই সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। বুধবার (আজ) সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় ভোটকেন্দ্রে প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারগণ ব্যালট পেপারসহ সকল নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে অবস্থান নেবেন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে ৭ দিনের জন্য। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট ঘিরে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে থাকবে।

১৬ আসনে ভোটকেন্দ্র : চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্র এবং ১২০০১টি ভোটকক্ষে ভোট হবে। ভোটগ্রহণের জন্য ৪০ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। ১৬ আসনে ১৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬০৭টি সিএমপির ১৬ থানার অধীনে। অবশিষ্ট ১৩৫৮টি কেন্দ্র জেলা পুলিশের ১৭টি থানার অধীনে।

পুলিশের পক্ষ থেকে এসব কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ ও সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ৬৫৩টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। পুলিশি ভাষায় এসব কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তালিকা অনুযায়ী মহানগর পুলিশে

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামসহ সবখানে ছড়িয়ে পড়ে ভাষা আন্দোলনের ঢেউ
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬