চট্টগ্রাম বন্দর এবং পানগাঁও কন্টেনার টার্মিনালসহ সকল সমুদ্রবন্দরের সাথে সংযোগে সর্বাধিক গুরুত্ব এবং তিনটা নৌবন্দরের কার্যক্রম মাথায় রেখে বহুমুখী (মাল্টি–মোডাল) পরিবহন রোডম্যাপ চূড়ান্ত করছে সরকার। ঢাকা–লাকসাম কর্ডলাইন এবং ধীরাশ্রমে ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই মাল্টি–মোডালে। ছয় মাসের পরামর্শ ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠকের পর প্রণীত সুপারিশসমূহের ভিত্তিতে এই কৌশলগত রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে পুরো বিষয়টির সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী পরিবহন মাধ্যম হচ্ছে জলপথ। বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। এই খাতে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব অপরিসীম। কন্টেনারভরতি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে জড়িত পানগাঁও কন্টেনার টার্মিনাল ও কমলাপুর আইসিডি। কমলাপুর আইসিডিতে চট্টগ্রাম বন্দরের রেল সংযোগ থাকলেও তা খুব একটা কার্যকর বিবেচনা করার সুযোগ নেই। রেলের সংকটের কারণে প্রায়শই চট্টগ্রাম বন্দরে আইসিডিমুখী কন্টেনারজট হয়। ধীরাশ্রম আইসিডি নির্মাণ প্রকল্প বহুদিন ধরে ঝুলে আছে।
অপরদিকে ঢাকা–লাকসাম কর্ড লাইন নির্মিত হলে চট্টগ্রামের সাথে দূরত্ব অনেক কমে যাবে। এতে যাত্রীদের কম সময়ে যাতায়াতসহ পণ্য পরিবহনে ব্যাপক গতি আসবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। সবকিছু মিলে বন্দরের পণ্য পরিবহনে রেলওয়েকে অগ্রাধিকার দিয়ে সড়ক, নৌ ও বন্দরভিত্তিক সমন্বিত বহুমুখী পরিবহন কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সড়কপথের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার এবং বন্দর–শিল্পাঞ্চল–অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেয়া হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র বলেছে, বর্তমানে দেশের মোট পরিবহন চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ সড়কপথনির্ভর। এতে সড়কের দ্রুত ক্ষয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং যানজটে ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। যানজটে পণ্য পরিবহনে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। সড়ক–মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের বাড়তি চাপ নাগরিক জীবনকেও ভোগান্তিতে ফেলছে। এ বাস্তবতায় সরকারের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সড়ক, রেল ও নৌপথে ভারসাম্য আনার সুপারিশ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারিত্ব বর্তমান ৫ শতাংশের কম অবস্থান থেকে বাড়িয়ে অন্তত ২০ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রেলখাতে প্রস্তাবিত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালু, নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা ও ঢাকা–জয়দেবপুর করিডরে আধুনিক কমিউটার সেবা চালু এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্ড লাইন উন্নয়ন। পাশাপাশি সব সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রেলসংযোগ জোরদার এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহের মাধ্যমে কন্টেনার ট্রেন পরিচালনা বাড়ানো হচ্ছে। পণ্য পরিবহন আরো আধুনিক, গতিশীল এবং সুসমন্বিত করতে পৃথক কন্টেনার কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। এই কোম্পানির মাধ্যমে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরেই নয়, মোংলা বন্দরেও কন্টেনার পরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সূত্র বলেছে, নৌপথে পণ্য পরিবহন সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে আশুগঞ্জ, পানগাঁও ও নোয়াপাড়াকেন্দ্রিক তিনটি বড় অভ্যন্তরীণ নৌ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন রুটের গুরুত্বপূর্ণ উক্ত তিনটি নৌ কেন্দ্রকে একটি গতিশীল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা গেলে ব্যবসা–বাণিজ্যে গতি আসবে। এ লক্ষ্যের সঙ্গে নদীবন্দরগুলোকে শক্তিশালী সড়ক–রেল সংযোগে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানিয়েছে, সমুদ্রপথে বাণিজ্য প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে ধীরাশ্রমে ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো দ্রুত শেষ করা, পদ্মা সেতুর সংযোগ কাজে লাগিয়ে মোংলা রুটে কন্টেনার পরিবহন বাড়ানো এবং সম্ভাব্য নতুন আইসিডি স্থাপনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা–চট্টগ্রাম–কক্সবাজার–মাতারবাড়ী করিডরে কত শতাংশ কন্টেনার সড়ক থেকে রেলে স্থানান্তর করা সম্ভব, সে বিষয়ে বিস্তারিত সমীক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বিকল্প মোডের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত না হওয়ায় সড়ক নেটওয়ার্ক তীব্র চাপে রয়েছে। তাদের মতে, কৌশলগতভাবে রেল ও নৌপথে বিনিয়োগ বাড়ালে সড়কের উপর নির্ভরতা কমবে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও হ্রাস পাবে। রেল, সড়ক ও নৌ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করতে হবে বলে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহন সেক্টরে বৈপ্লবিক অগ্রগতি হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বহুমুখী (মাল্টি–মোডাল) পরিবহন রোডম্যাপ বাস্তবায়িত হলে বন্দর, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্প ক্লাস্টার ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সমন্বিত ও নিরবচ্ছিন্ন বহুমুখী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এই উদ্যোগ পরিবহন ব্যয় কমানো, নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করবে।












