বহির্নোঙরে মাদার ভ্যাসেলের সংখ্যা একশ ছাড়াল

আছে তিন লাখ টন পণ্য, এক মাস আগে আসা জাহাজও অপেক্ষায় । লাইটারেজ জাহাজের সংকট না কাটায় এ পরিস্থিতি । কোনো চক্রের কারসাজি কিনা খতিয়ে দেখার আহ্বান

হাসান আকবর | সোমবার , ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বের নানা দেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা অপেক্ষমাণ মাদার ভ্যাসেলের সংখ্যা একশ ছাড়িয়েছে। এক মাস আগে পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম এসেছে এমন জাহাজের সংখ্যাও কম নয়। তিন লাখ টনের বেশি পণ্য নিয়ে সাগরে অলস ভাসছে জাহাজ। লাইটারেজ জাহাজের সংকটের কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলো অনিশ্চিত অপেক্ষায় আছে। দিনে একটি লাইটারেজ জাহাজ দেয়া হচ্ছে কোনো জাহাজকে। আবার কোনো জাহাজ তাও পাচ্ছে না। এতে করে অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন রুটে পণ্য পরিবহন থমকে যাওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে।

এই সংকটকে ‘কৃত্রিম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের কারসাজি আছে কিনা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, লাইটারেজ জাহাজের সংকটের কারণে রমজানে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ নেটওয়ার্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে কোনো বিশেষ মহল ষড়যন্ত্র করছে। অনেকে জাহাজ কেটে ফেলেছে, অনেকে চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ সরিয়ে নিয়েছে। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট লাইটারেজ জাহাজের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করছে। এই চক্রের কারসাজি উদঘাটন এবং যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া না হলে আসন্ন রমজানে মানুষের কাছে পণ্য পৌঁছানো সরকারের জন্য কঠিন হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর এবং আমদানি বাণিজ্যের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা তৈরি করা গেলে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশের কোটি কোটি মানুষের প্রয়োজনীয় নানা ভোগ্যপণ্যসহ আমদানি বাণিজ্যের ৯০ শতাংশ খালাস হয় চট্টগ্রাম বন্দরে। এর সিংহভাগ হ্যান্ডলিং হয় বহির্নোঙরে। বিদেশ থেকে বড় বড় মাদার ভ্যাসেলে বোঝাই করে আনা চাল, গম, ডাল, সরিষা, মটর, ছোলাসহ নানা পণ্য বোঝাই জাহাজগুলো বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে না। এগুলো বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজে খালাস করে দেশের অন্তত ৪১টি ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। ওখান থেকে সরবরাহ দেয়া হয় বাজারে। এই কর্মযজ্ঞের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে লাইটারেজ জাহাজ। বর্তমানে লাইটারেজ জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে।

লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) প্রতিদিন বার্থিং সভা করে বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে চাহিদা অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে বিডব্লিউটিসিসি বার্থিং সভা করতে পারছে না। তিনচার দিন পরপর একটি সভা করে চাহিদার তুলনায় একেবারে নগণ্য সংখ্যক লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দিচ্ছে। একেকটি মাদার ভ্যাসেলের পণ্য খালাস করতে যেখানে প্রতিদিন তিনচারটি লাইটারেজ জাহাজের চাহিদা থাকে, সেখানে বর্তমানে জাহাজগুলোকে প্রতিদিন গড়ে একটি জাহাজও দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। লাইটারেজ জাহাজ না থাকায় অচলাবস্থায় পড়েছে বহির্নোঙর। ওখানে আমদানিকৃত কয়েক লাখ টন পণ্য নিয়ে অলস বসে আছে অনেক জাহাজ। কোনো কোনো জাহাজে সীমিত পরিসরে কাজ হলেও অধিকাংশ জাহাজ অলস অপেক্ষায় আছে। বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করে সর্বোচ্চ দশ দিনের মধ্যে যে জাহাজ চলে যেতে পারত সেগুলোকে এখন এক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে কোটি কোটি ডলার গচ্ছা দিতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। এর যোগান মূলত ভোক্তাদের দিতে হবে। বহির্নোঙরে যেখানে গড়ে ২০৩০টি মাদার ভ্যাসেল থাকত, সেখানে বর্তমানে তা একশ ছাড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর, আমদানি বাণিজ্য, ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ নেটওয়ার্ক সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে লাইটারেজ জাহাজের সংকট। কিন্তু এই সংকটের পেছনে সংঘবদ্ধ চক্রের কারসাজি রয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, পরিস্থিতি নজিরবিহীন। এমন ভয়াবহ সংকট এর আগে কোনোদিন অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সেক্টরে দেখা দেয়নি। এর পেছনে বিশেষ কোনো মহলের ষড়যন্ত্র আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তারা বলেন, জাহাজ ব্যবসায় বিগত ১৫ বছরে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। তৈরি হয়েছে অনেক লাইটারেজ জাহাজ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং গণ অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর অনেক জাহাজ মালিক পালিয়ে গেছেন। এদের অনেকে নিজেদের জাহাজ কেটে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করে দিয়েছেন। গত এক বছরে কয়েকশ জাহাজ কেটে ফেলা হয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আবার অনেকে ভোল পাল্টে জাহাজ পরিচালনা করলেও সংকট গভীর করার ষড়যন্ত্র করছে। অনেকে চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ সরিয়ে নিয়ে গেছেন পায়রা ও মোংলায়। অনেকে ভারতের সাথে জাহাজ পরিচালনা করছেন। বিগত সরকারের সময় নানাভাবে সুযোগসুবিধা নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন এমন অনেক জাহাজ মালিক কৌশলে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে মরিয়া। এদের কারসাজির কারণে বহির্নোঙরে পণ্যবোঝাই জাহাজের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে।

বিষয়টিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে সংঘবদ্ধ চক্রের কারসাজি থেকে দেশের আমদানি বাণিজ্যকে রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে সূত্রগুলো বলেছে, চক্রটি চট্টগ্রাম বন্দরকে টার্গেট করেছে। এই চক্রের টার্গেট যদি সফল হয় তাহলে বিশ্বের শিপিং সেক্টরে চট্টগ্রাম বন্দরের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি দেশের ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ নেটওয়ার্কও ভেঙে পড়বে।

বিডব্লিউটিসিসির নির্বাহী পরিচালক মেজর (অব.) জিএম খান বলেন, আমাদের কাছে কোনো জাহাজ নেই। জাহাজ মালিকেরা চট্টগ্রামে উপস্থিতি এবং পণ্য পরিবহনে প্রস্তুতির কথা জানিয়ে জাহাজ সিরিয়ালে দেন। ওখান থেকে আমরা মাদার ভ্যাসেলের চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ বরাদ্দ দিই। লাইটারেজ জাহাজ না আসা পর্যন্ত মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে বরাদ্দ দিতে পারি না। এখন তিনচার দিন পরপর বার্থিং সভা এবং রেশনিং করে চারটির চাহিদার বিপরীতে কোনো কোনোদিন একটি লাইটারেজ বরাদ্দ দিতে পারছি। কোনো ষড়যন্ত্র আছে কিনাএ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। তবে জাহাজের সংকট ভয়াবহ বলে স্বীকার করেন।

বিডব্লিউটিসিসিকে বেকায়দায় ফেলার জন্য একটি মহল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জাহাজ সরিয়ে নিয়েছে উল্লেখ করে অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, কিন্তু তারা দেশকেই বেকায়দায় ফেলে দিচ্ছে।

একাধিক শিল্পগ্রুপের মালিক গতকাল আজাদীকে বলেন, যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে সেটি শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, অস্বাভাবিক। এমন পরিস্থিতি হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবুও ঘটছে। এর পেছনে কারা রয়েছে তা খতিয়ে না দেখলে চড়া মূল্য দিতে হবে।

সার উপহার দিয়ে বেকায়দায় রাশিয়া! : বাংলাদেশ সরকারকে প্রায় ৩০ হাজার টন এমওপি সার উপহার দেয় রাশিয়া। এই সার নিয়ে পানামার পতাকাবাহী এমভি পিভিটি গ্লোরিয়া নামের একটি জাহাজ গত ৮ জানুয়ারি বহির্নোঙরে পৌঁছায়। কথা ছিল ৩৪ দিনের মধ্যে সারগুলো খালাস করে জাহাজটি ফিরতি পথ ধরবে। কিন্তু লাইটারেজ জাহাজের সংকটের কারণে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সারগুলো খালাস করতে পারছে না। গত দশ দিনে এই জাহাজ থেকে মাত্র ৭ হাজার ৪৫০ টন সার খালাস হয়েছে। বাকি ২২ হাজার ১৫৪ টন সার নিয়ে গতকালও জাহাজটি বহির্নোঙরে অপেক্ষা করছিল। গতকাল এই জাহাজটিতে কোনো লাইটারেজ জাহাজ দেয়া সম্ভব হয়নি।

রাশিয়া সরকার সারগুলো বাংলাদেশ সরকারকে উপহার হিসেবে প্রদান করেছে। গতকালের বাজারদর অনুযায়ী এই সারের দাম ৫৩ কোটি ৮৭ লাখ ৯২ হাজার ৮শ টাকা। কিন্তু উপহার দিয়ে তারা যেন সংকটে পড়ে গেছে। জাহাজের বাকি সারগুলো খালাস করতে আর কতদিন লাগবে তা অনিশ্চিত। লাইটারেজ জাহাজ না থাকায় বিডব্লিউটিসিসি এমভি পিভিটি গ্লোরিয়ার অনুকূলে কোনো লাইটারেজ বরাদ্দ দিতে পারছে না। জাহাজটির স্থানীয় এজেন্ট এশিয়ান স্টিম শিপ নানাভাবে চেষ্টা করেও জাহাজটি খালি করাতে পারছে না। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব বিডব্লিউটিসিসিতে ফোন করে জাহাজটির বিপরীতে লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়ার অনুরোধ করলেও জুটছে না জাহাজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসিএমপির ৩৩০ দুষ্কৃতকারীর তালিকায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে : নগর বিএনপি
পরবর্তী নিবন্ধস্বামী ও শাশুড়ির বিরুদ্ধে বিষ খাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ