বস্ত্রখাতকে বাঁচিয়ে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন

| বুধবার , ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বস্ত্রখাতের ইতিহাস পর্যালোচনা করে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, একসময় সুতা ও ফ্যাব্রিকের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। তবে গত তিন দশকে বড় বিনিয়োগের ফলে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠেছে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরাই এখন নিটওয়্যারের প্রায় পুরো চাহিদা এবং ওভেন পোশাকের প্রায় অর্ধেক চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

গত দুইতিন বছরে সেই সাফল্য চাপের মুখে পড়েছে। আমদানিকৃত সুতামূলত ভারত থেকে আমদানী করাসস্তা হওয়ায় পোশাক রপ্তানিকারকরা ক্রমশ আমদানির দিকে ঝুঁকেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২২৩ অর্থবছরের পরবর্তী দুই বছরে সুতা আমদানি দ্বিগুণ হয়েছে; এই সরবরাহের শীর্ষে রয়েছে ভারত। এর ফলে স্থানীয় মিলগুলোর ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পোশাকের অর্ডার কমে যাওয়ায় স্পিনিং মিলগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিনচারগুণ বেশি মজুত জমেছে। একইসঙ্গে উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই অলস পড়ে আছে। এই মন্দার আঁচ উইভিং, ডাইং ও প্রিন্টিংয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার টেক্সটাইল ইউনিটের কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।

মিল মালিকদের কয়েক মাসের অনুরোধের পর সরকার বন্ড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানিতে লাগাম টানার উদ্যোগ নেয়। প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসতেই রপ্তানিকারকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। এর পরপরই বিটিএমএ মিল বন্ধের হুঁশিয়ারি দেয়। এতে এই দুই খাত প্রকাশ্যে বিরোধের দিকে চলে যায়।

এদিকে, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব টেক্সটাইল মিল বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)। দেশের সুতা উৎপাদনকারী মিলগুলোকে রক্ষায় সরকারের ‘কার্যকর পদক্ষেপ না থাকা’র অভিযোগ তুলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি। ২২ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিটিএমএ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এই ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ সভাপতি বলেন, ‘আগামী ১ তারিখ থেকেই ফ্যাক্টরি বন্ধ। আমরা বন্ধ তো করবই, ব্যাংকের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নেই।’ মালিকদের বর্তমান আর্থিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের পুঁজি অর্ধেক হয়ে গেছে। ব্যাংকের টাকা পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা নেই। সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেও শোধ করা যাবে না।’ সমস্যা সমাধানে সরকারি দপ্তরে ঘুরেও কোনো সুরাহা পাননি বলে অভিযোগ করেন বিটিএমএ সভাপতি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘সব মন্ত্রণালয়ের সব ডিপার্টমেন্টের কাছে গিয়েছি। তারা কেবল পিলো পাসিংয়ের মতো দায়িত্ব অন্যদের কাছে দিয়ে দিচ্ছে।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানিকৃত সুতার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করেবিশেষ করে সরবরাহের উৎস সংকুচিত বা এককেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে সস্তা কাঁচামাল প্রাপ্তির সুযোগ হুট করে বন্ধ করে দিলে তা ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান পত্রিকান্তরে বলেন, সরকারের উচিত ঢালাওভাবে আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর সমাধান খোঁজা। এসব সমাধানের মধ্যে থাকতে পারে সীমিত আকারে নগদ ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা, এলডিসি বিধিমালার আওতায় বিশেষ ঋণের সুবিধা, অ্যান্টিডাম্পিং তদন্ত, অথবা একটি কোটা ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ থাকবে।

কেউ কেউ বলছেন, তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর সরকারের যে ০.৩ শতাংশ বিশেষ নগদ প্রণোদনা রয়েছেযার পরিমাণ বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকাতা সরাসরি টেক্সটাইল খাতকে সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।

সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদের পরামর্শ, এনবিআর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প থেকে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। একইসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেও দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে শুল্ক কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সমাধানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে বসার আহ্বান জানান।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১৩ শতাংশ। কাজেই এ খাতের বিপর্যয় মানে জাতীয় অর্থনীতিতে ধস এবং কয়েক লাখ শ্রমিকের বেকারত্ব। সরকার যখন ব্যাংক লুটেরাদের কারণে হওয়া ক্ষতি পোষাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে, তখন বস্ত্র খাতের মতো একটি উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতের জন্য উদ্যোক্তাদের মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা চাওয়া মোটেও উচ্চাভিলাষ নয়।’ তাই দেশীয় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে