বাসা থেকে বেরুনোর পর গলির মুখে দেখলাম বাদামগাছে নতুন পাতা। মনটা নরম হয়ে গেল। প্রবর্তক মোড় পেরুনোর পর চোখ পড়ল পলাশগাছে। পলাশ ফুটেছে। মনে মনে হাসলাম এবং সাথে সাথে পেলাম বসন্তের ঘ্রাণ। চোখ বন্ধ করে একটা ঋতু, একটা কাল অনুভব করলাম। মন গাইল, বসন্ত এসে গেছে।
নতুন পাড়া যখন পার হচ্ছি রাস্তার বাঁ পাশে বেশ কয়েকটা তেঁতুলগাছ। পাতা ভরা, ছায়া ছায়া। সেই ছায়াটা মনের উপর পড়ল। মনটা আরো শান্ত হয়ে এলো। ইচ্ছে হলো তিন নম্বর গাড়ি থেকে নামি। গাছটাকে জড়িয়ে ধরি, কাণ্ডে হাত বুলাই, পাতায় হাত বুলাই।
আমার ভেতরে কেউ প্রশ্ন করল, ‘গাছ কী?’
মনের মধ্যে আরেকজন বলল, ‘গাছ হলো শান্তি। এত অস্থিরতা, ঘৃণা, নীচতা নিয়ে মানুষ চলছে; তার মধ্যে শান্তিটা কমে যাচ্ছে। মানুষ যদি একবার গাছের দিকে তাকায়, গাছকে ধরে, অনুভব করে, তাহলে মনে শান্তি নেমে আসবে। মনটা অমানুষ থেকে মানুষ হয়ে উঠবে। মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত থাকবে। অমনুষ্য যা কিছু আছে তা ধীরে ধীরে নেমে যাবে।’
চলছে গাড়ি, যাচ্ছি আমি। দেখছি গাছপালা, ফসলের মাঠ। শুকনো নদী, পুকুর। একটা পুকুর জলে ভরা। বড় দুটি বক দুই পাশে পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা গলা ঝুঁকিয়ে গভীর মনোযোগে পানির দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা কি পানি দেখছে নাকি অন্য কিছু? বক দুটি যেন কিছু বলল আর আমি শুনতে পেলাম।
আরেকটু এগোলে আলুখেত। ঝুরঝুরে মাটি, আলুগাছ দেখলাম। মাথার উপর দুপুরের রোদ। কৃষক ব্যস্ত। এক কিশোরী আলপথে হেঁটে বাবার কাছে যাচ্ছে।
আমি দেখি আর দেখি। গাড়ির গতির সাথে মিলিয়ে দেখার মধ্যে আলাদা আনন্দ। দেখলাম আর হারিয়ে ফেললাম। আসলে নিজের ভেতরে জমা রেখে দিলাম। নতুন ঘ্রাণ বুক ভরে নিয়ে আমি চোখ বন্ধ করলাম। তারপর খুলে তাকালাম বাইরে। আকাশ যেন বলছে, ‘হে মানুষ, বসন্ত এসে গেছে।’
গাড়ি থেকে নেমে নতুন হাওয়ায়, নতুন ঘ্রাণে মানুষের মুখ দেখি। একটা পাখি চোখের সামনে দিয়ে উড়ে গেল। হঠাৎ মনে পড়ল কোকিলের কথা। নগরে কোকিলের ডাক শুনেছি সেই পৌষ মাসে। এখন এই বসন্তে তো আরো পরিপূর্ণ হয়ে ডাকবে।
রিকশাওয়ালা যেতে চাচ্ছিলেন না। মৃদু হাসলাম। আমার হাসি দেখেই যেন রাজি হলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম বসন্তের কথা। তিনি হাসলেন। হেসে তাকালেন পাশের আমগাছটির দিকে। গাছটি বোলে বোলে ভরা। ফুলভারে এমন পরিপূর্ণ, দেখলেই ভালো লাগে। গাড়ির গতি কমিয়ে যা বলতে চাইলেন তা অনেকটা এমন : বাংলার এ প্রকৃতিতে আমরা কেমন করে বাঁচতে চাই, আপনি শিক্ষিত মানুষ হয়ে বুঝতে পারছেন? আমরা শান্তি চাই, নিজের কর্ম করে নিজের মতো বাঁচতে চাই। কোনো হানাহানি, কোনো হিংসা, ঘৃণা–বিদ্বেষ লালন করতে চাই না। বাংলার গাছপালা, আবহাওয়া ঘৃণার কথা বলে না, ভালোবাসার কথা বলে।
আমি মনে মনে বললাম, ওমা! এ যে একজন দার্শনিক। আমি শুধু মাথা নাড়লাম। তিনি গতি বাড়িয়ে দিলেন। গায়ে লাগল নতুন হাওয়া। মনেও নতুন হাওয়ার দোলা।
ভাবছিলাম, বসন্ত এলে কী হয়? বাংলার ষড়ঋতুর শেষ ঋতু বসন্তকালকে ঋতুরাজ বলা হয় কেন? আর বসন্তকাল এলে এত ভালোও কেন লাগে?
আড়মোড়া ভেঙে বিদায় নেয় শীত। শীতের বিদায়ের পর গাছে গাছে গজায় নতুন পাতা। শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়াসহ নানারকম ফুল প্রকৃতিকে বর্ণিল করে তোলে। দখিনা বাতাস বয়। কোকিল ডাকে। নতুন রূপে সাজে প্রকৃতি। উৎসবমুখর পরিবেশ প্রকৃতিকে রূপময় করে তোলে।
বসন্ত নতুন রূপ, প্রাণশক্তি এবং উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে। ফাগুনের হাওয়ায় মর্মর ধ্বনি, কচি পাতা ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে। তা ছড়িয়ে পড়ে সবার মনে। ফুল–পাখিদের সমারোহ, উষ্ণতার ছোঁয়ায় মনের এবং শরীরের জড়তা দূর হয়। বসন্তকে তাই ভালো লাগে। আবহাওয়া স্বস্তিদায়ক থাকায় মানুষ বাইরে বের হয় বেশি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে মন চাঙা হয়। কাজে–কর্মে উৎসাহ বাড়ে। এ সময় মানুষের মুখে বেশি হাসি ফোটে। দূর হয় মানসিক চাপ। তাই তো কবি বলছেন : ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান/ তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান… কিংবা বলছেন : ‘বসন্ত আজ আসলো ধরায়, ফুল ফুটেছে বনে বনে, শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায় ফাল্গুনী মোর মন বনে।’
বসন্ত এখন মনে মনে, বসন্ত এখন বনে বনে। বসন্ত এখন এ জনপদে। বসন্ত এখন খুলে দিল আমাদের মনের দুয়ার।












