বর্ষা সামনে রেখে একগুচ্ছ কাজ করবে চসিক-সিডিএ

জলাবদ্ধতা নিরসন ।। সমন্বয় সভায় বেশ কিছু সিদ্ধান্ত

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ৯ মার্চ, ২০২৬ at ৮:৫৬ পূর্বাহ্ণ

নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান মেগা প্রকল্পভুক্ত জামালখান খাল ও হিজরা খালের সিংহভাগ কাজ মে মাসে মাসের মধ্যে শেষ করবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনী। একইসঙ্গে ইতোপূর্বে সম্পন্ন হয়েছে প্রকল্পভুক্ত এমন খালগুলো বর্ষাকে সামনে রেখে এপ্রিল মাসে আবারও পরিষ্কার করবে সংস্থাটি।

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) মে মাসের মধ্যে তাদের বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের কাজ শেষ করবে এবং বর্ষার আগে বিভিন্ন ড্রেন পরিষ্কার করবে। পাশাপাশি মেগা প্রকল্পের বাইরে থাকা ২১টি খাল সংস্কারে দ্রুত ডিপিপি প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করবে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বন্দর সংলগ্ল খালগুলোর মুখ পরিষ্কার করবে। বর্ষাকে সামনে রেখে নগরে জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিকসিডিএসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গতকাল রোববার টাইগারপাস নগর ভবনের অস্থায়ী কার্যালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো আজাদীকে নিশ্চিত করেন তিনি। সভায় মেয়র জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে গত বর্ষায় নগরীতে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে এসেছে। সেই সাফল্য ধরে রেখে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সভায় বক্তব্য রাখেন সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম। মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরেন সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালক কর্নেল মো. তারিকুল আলম।

সভায় জানানো হয়, চলমান ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে ৯৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রকল্পভুক্ত ৩৬ খালের মধ্যে ২৬টির কাজ শেষ হয়েছে। চলমান আছে ১০টির। চলমান খালগুলোর মধ্যে জামালখান খালের ৫৮ শতাংশ ও হিজরা খালের অগ্রগতি হয়েছে ৩২ শতাংশ। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পভুক্ত ২১টি রেগুলেটর বা স্লুইচগেটের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৭টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি চারটির কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার কার্যক্রম চলছে। এসব স্লুইচগেট বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানি নিয়ন্ত্রণ এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কী বললেন মেয়র এবং অন্যরা : সভায় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে খাল পুনরুদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সিডিএ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে ৩৬টি খালের উন্নয়নকাজ চলছে। এর বাইরে নগরীতে বাকি ২১টি খালের উন্নয়ন পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু খালনালা পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলো পরিষ্কার রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য খালনালায় ফেলার কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

ডা. শাহাদাত বলেন, আমরা খাল পরিষ্কার করলাম, পলি অপসারণ করলাম, কিন্তু পরে আবার যদি সেখানে ময়লা বা বর্জ্য পড়ে, তাহলে সেই প্রচেষ্টা বৃথা যাবে। এজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

এ সময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে মেয়র বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে ইতোমধ্যে বিনামূল্যে ডোরটুডোর ময়লা সংগ্রহ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যাতে কেউ যত্রতত্র ময়লা না ফেলে। একই সঙ্গে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যে একাধিক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। হালিশহর এলাকায় একটি কোরিয়ান কোম্পানি গত ছয় মাস ধরে বায়োগ্যাস উৎপাদন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এছাড়া একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান তিন বছরের সমীক্ষা শেষে বর্জ্য থেকে প্রায় ১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। একইভাবে যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠান বর্জ্য থেকে গ্রিন ডিজেল উৎপাদনের বিষয়ে চসিকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সভায় চসিকের বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় প্রকল্পটির পরিচালক ও চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফরহাদুল আলম জানান, প্রকল্পটির প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও এর আগেই অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।

তখন মেয়র প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ১৫ মে’র মধ্যে আমাকে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি বুঝিয়ে দিতে হবে। কারণ মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।

শাহাদাত বলেন, বারইপাড়া খালের কাজ সফলভাবে শেষ করা গেলে বাকি ২১টি খালের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা সমস্যার একটি পূর্ণাঙ্গ সমাধান চট্টগ্রামবাসীকে উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।

তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যদিও নগর সরকারের পূর্ণ কাঠামো এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবু সিডিএ, সেনাবাহিনী, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা, জেলা প্রশাসন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যেতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, খাল খনন প্রকল্প শেষ হলে এর হস্তান্তর এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম, সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শাহিদ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বর্ণ হক, সিডিএর সদস্য জামিলুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ মইনুদ্দিন ও মেয়রের উপদেষ্টা শাহরিয়ার খালেদ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিমসহ দুজন ভারতে গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধনগরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায়