দীর্ঘ ১৫ বছর পর চারুকলার শিক্ষার্থীরা মূল ক্যাম্পাসে ফিরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। এ আয়োজনকে ঘিরে পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে চলছে নানা প্রস্তুতি, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাকসুর উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী উদ্যোক্তা মেলা। এতে বেড়েছে উৎসবের কলেবর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলা অনুষদের সামনে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা বাঁশ, কাগজসহ দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করে নান্দনিক কাঠামো, মুখোশ ও ভাস্কর্য তৈরি করছেন। পাশাপাশি রং–তুলির কাজে ব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে। বর্ণাঢ্য আয়োজনকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের এ সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
নববর্ষের এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) ও কারুবীথির যৌথ উদ্যোগে আগামী ১ ও ২ বৈশাখ উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী বৈশাখী উৎসব ও উদ্যোক্তা মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এ আয়োজনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে এবং বুদ্ধিজীবী চত্বরে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় ৭৫টি স্টলে বৈশাখী ঐতিহ্যের নানা উপকরণ ও পণ্য প্রদর্শিত হবে। মেলার স্টলগুলোতে স্থান পাবে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার বিশেষ করে পান্তা–ইলিশ, বিভিন্ন ধরনের পিঠা এবং বাঙালিয়ানার প্রতীক বহনকারী নানান হস্তশিল্প। এর মাধ্যমে গ্রামীণ সংস্কৃতি, নান্দনিকতা ও দেশীয় ঐতিহ্যের বহুমাত্রিক রূপ ফুটে উঠবে।
পহেলা বৈশাখের দিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে বৈশাখী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা–কর্মচারীরা অংশ নেবেন। শোভাযাত্রা শেষে জারুলতলায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া দিনব্যাপী কাবাডি ও বলি খেলার আয়োজন থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে বসবে বৈশাখী মেলা।
নববর্ষের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেল সংসদের ভিপি খন্দকার মাসরুল আল ফাহিম বলেন, ঈদের ছুটির কারণে মুখোশ ও ভাস্কর্যের কাজ কিছুটা দেরিতে শুরু হলেও বর্তমানে প্রস্তুতির কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। আমাদের কাজগুলো ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত একটা রুটিন অনুযায়ী সাজিয়েছি। সে অনুযায়ী আমাদের কাজ চলমান। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট, শহিদ মিনারসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আল্পনা আঁকবো। প্রাথমিকভাবে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে সবকিছু সমন্বয় করা হয়েছে।
চারুকলার শিক্ষার্থী সোহেল বলেন, ক্যাম্পাসে প্রথমবার বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে পারা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। তিনি জানান, তিনি রং–তুলির কাজে যুক্ত আছেন এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি কাজ শেষ হয়েছে। আরেক শিক্ষার্থী স্নেহা বলেন, আগে সীমিত পরিসরে ক্যাম্পাসের বাইরে নববর্ষ উদযাপন করা হলেও এবার বৃহৎ পরিসরে সবার অংশগ্রহণে উৎসব উদযাপন করা যাবে, যা তাদের জন্য বিশেষ আনন্দের।
পহেলা বৈশাখ আয়োজন কমিটির আহ্বায়ক ও উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) কামাল উদ্দিন বলেন, গত বছরের মতো এ বছরও সুন্দরভাবে নববর্ষ উদযাপনের লক্ষ্যে শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে। চারুকলার শিক্ষার্থীরা চমৎকার কাজ করছে।
চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক তাসলিমা আকতার বলেন, পূর্বে শহরে অবস্থান করার কারণে আলাদাভাবে নববর্ষ উদযাপন করা হতো। তবে এবার যেহেতু ইনস্টিটিউটটি মূল ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়েছে, তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয়ভাবে বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হচ্ছে।
উদ্যোক্তা মেলা সম্পর্কে চাকসুর ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মেহেদি হাসান সোহান জানান, কারুবীথি এমন একটি সংস্থা, যারা দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করে। তারা দেশের গ্রামাঞ্চল ও বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য সংগ্রহ করে এবং যেসব কারিগর এসব পণ্য তৈরি করেন, তাদের পরিচয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেই পণ্য বাজারজাত করে। ফলে এই মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি মানসম্মতভাবে নিজেদের পণ্য উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে তাদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। তারা কারুবীথির মাধ্যমে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন, যা তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদে উদ্যোক্তারা সাধারণত তাদের প্রতিভা বিকাশ ও পণ্য প্রচারের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। অনেক সময় তারা যথাযথ প্ল্যাটফর্মের অভাবে নিজেদের সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে পারেন না। এই আয়োজন সেই সীমাবদ্ধতা দূর করার একটি কার্যকর উদ্যোগ হিসেবে কাজ করবে। তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতেও চবি ক্যাম্পাসে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উদ্যোক্তা ক্লাবকেও এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছি। যাতে শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে এমন সুযোগ পেয়ে নিজেদের দক্ষতা ও উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন শিল্পী রশিদ চৌধুরী। ২০১০ সালের ২ আগস্ট এটি নগরীর সরকারি চারুকলা কলেজের সঙ্গে একীভূত হয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ইনস্টিটিউটটি শহরের মেহেদীবাগ এলাকায় স্থানান্তর করা হয়, যা মূল ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল। ২০২২ সালের নভেম্বরে শ্রেণিকক্ষের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। এক পর্যায়ে ইনস্টিটিউটকে মূল ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার দাবি জোরদার হয়। প্রশাসনের আশ্বাসের পর অবশেষে ২০২৫ সালের ২২ মে থেকে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা পুনরায় মূল ক্যাম্পাসে ক্লাস শুরু করেন। বর্তমানে এ ইনস্টিটিউটে প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।














