বর্ষবরণের আলোর ভেতর রাষ্ট্রের পথচলা

উজ্জ্বল সম্পু | সোমবার , ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:১০ পূর্বাহ্ণ

নতুন বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাঙালি আবারও উৎসবের মধ্য দিয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে। বর্ষবরণ আমাদের কাছে কেবল বর্ষপঞ্জীর পাতা উল্টে যাওয়ার দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও সময়। মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্য, শহুরে উদযাপনসব মিলিয়ে এই দিনটি আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তার একটি উজ্জ্বল ঘোষণা। কিন্তু এও সত্য, উৎসবের রঙিন আবরণ ভেদ করলেই রাষ্ট্র ও সমাজের বহু জটিল প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আনন্দের এই প্রহরে তাই প্রশ্ন জাগেআমরা কি সত্যিই একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছি?

বর্ষবরণের মূল দর্শনই হলো নবায়ন। সেই নবায়নের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুশাসন। বাংলাদেশের অর্থনীতির রক্তস্রোত হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতকে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই খাতের বাস্তবতা বহু বছর ধরেই আমাদের জন্য উদ্বেগের। একদিকে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পরিকল্পনাহীনতাএই দ্বৈত সংকট অর্থনীতিকে নীরবে বিপন্ন করে তুলছে। জ্বালানি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপকরণ নয়’ এটি শিল্প, কৃষি, পরিবহন, এমনকি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ভিত্তি। ফলে তেলগ্যাস খাতে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শেষ পর্যন্ত গুনতে হয় সাধারণ নাগরিককেই।

অর্থনীতির সম্প্রাতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতির দীর্ঘ ছায়া এবং আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসাঞ্জস্য একটি নীরব সামাজিক ক্লান্তি তৈরি করেছে। রাষ্ট্রের উন্নয়নআখ্যান যতই উচ্চকণ্ঠ হোক মানুষের সংসার যদি স্বস্তি না পায়, তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যানের অলংকার হইে থেকে যায়। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো মানুষের জীবনমান, ক্রয়সক্ষমতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাশুধু অবকাঠামো নয়।

এই বাস্তবতার মধ্যেই পেস্কেল বা বেতন কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন স্তরের কর্মচারী ও পেশাজীবীদের দাবি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। বেতনবৈষম্য, পদমর্যাদাগত অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের অমিলএসব প্রশ্নকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখেন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসনিক কর্মী, মাঠপর্যায়ের সেবাদানকারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, কারিগরি জনবলঅসংখ্য মানুষ। তাঁদের ন্যায্য বেতন, মর্যাদা ও প্রণোদনা নিশ্চিত না হলে প্রশাসনিক দক্ষতা যেমন কমে, তেমনি দুর্নীতি ও হতাশার পথও প্রশস্ত হয়। কাজেই পেস্কেলের প্রশ্নকে কেবল দাবিদাওয়ার রাজনীতি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও ন্যায়বোধের প্রশ্নও বটে।

তবে পেস্কেল বৃদ্ধির দাবি বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থনীতির ভিত্তিও হতে হবে দৃঢ়। অযৌক্তিক ব্যয়, অদক্ষ প্রকল্প, লুটপাট, কর ফাঁকি ও আর্থিক খাতে অনিয়ম যদি অব্যাহত থাকে, তবে বাড়তি বেতনও শেষ পর্যন্ত মুদ্রাস্ফীতির ভেতর বিলীন হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ন্যায়সঙ্গত বেতন কাঠামোর পাশাপাশি দরকার স্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর করনীতি, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন। শুধু ভেতন বাড়ানো নয়অর্থনীতিকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সেই বেতনের প্রকৃত মূল্যও বজায় থাকে।

এখানেই এসে গণতন্ত্রের প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ অর্থনীতি, জ্বালানি নীতি, বেতন কাঠামোএসব কোনো বিচ্ছিন্ন কারিগরি ইস্যু নয়; এগুলো শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। আর সুস্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসে তখনই, যখন গণতান্ত্রিক পরিসর প্রাণবন্ত থাকে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয়, বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে নয়, বিকল্প কণ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

আজকের বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ এখানেইগণতন্ত্রকে আমরা কতটা কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছি?

গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিন নয়: গণতন্ত্র মানে জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ, সহনশীলতা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের আস্থা, স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন এবং নাগরিকের মর্যাদা। যখন রাজনৈতিক ভাষা ক্রমশ সংঘাতমুখী হয়, যখন ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, যখন নীতি নির্ধারণে জনআলোচনার জায়গা সংকুচিত হয়তখন রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একধরনের নৈতিক ক্লান্তিতে আক্রান্ত হয়। এই ক্লান্তি অর্থনীতিকেও দুর্বল করে, প্রশাসনকেও অকার্যকর করে, সমাজকেও বিভক্ত করে।

বর্ষবরণের উৎসব আমাদের শেখায়সমষ্টিগত আনন্দের মধ্য দিয়েই জাতি টিকে থাকে। কিন্তু সেই আনন্দকে টেকসই করতে হলে রাষ্ট্রকে হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি নতুন বছর, যেখানে জ্বালানি নীতিতে থাকবে দূরদর্শিতা, অর্থনীতিতে থাকবে মানুষের স্বস্তি, পেস্কেলে থাকবে ন্যায্যতা, আর গণতন্ত্রে থাকবে আস্থা। অন্যথায় বৈশাখের রঙিন মুখোশের আড়ালে সংকটের মুখই কেবল আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

নতুন বছর তাই শুধু উৎসবের আহ্বান নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের এক নীরব প্রশ্নওআমরা কি সত্যিই নতুন হওয়ার সাহস রাখি?

লেখক : কবি, কলেজ শিক্ষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধপহেলা বৈশাখ উদযাপন ও বাঙালি সংস্কৃতি
পরবর্তী নিবন্ধরক্তের রেখা থেকে চেতনার আলো