জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘নির্বাচনে যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, যারা দেননি, কিংবা যারা কাউকেই ভোট দেননি–এই সরকারের কাছে তাদের সবার ‘সমান অধিকার’ থাকবে।’ শপথ গ্রহণের পর বুধবার প্রথম কর্মদিবসের কর্মসূচি সেরে রাত পৌনে নয়টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। ভাষণে তারেক রহমান তার সরকারের কয়েকটি অগ্রাধিকার জানিয়ে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বার্তাও দেন। বিএনপি সরকার কীভাবে দেশ চালাতে চায়, সেই বার্তা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অথবা জোর জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা’। তিনি বলেন, ‘আমি দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বার্তা দিতে চাই, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তথা দল–মত ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই এই দেশকে আমরা একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য’।
জনগণের মনে শান্তি নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বক্তব্যে ঐক্য ও সমঝোতা এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার যে অঙ্গীকার এসেছে, সেটা বর্তমান রাজনৈতিক পটভূমিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। এদেশের সকল নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সবার নিরাপদ ও শান্তিময় জীবন ফিরিয়ে আনাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। আমরা তাঁর এই অবস্থান ও বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। সরকার গঠনের পর তাঁর এসব নীতি ও অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ় ও আন্তরিক থাকবেন, সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি।
সারাদেশে জুয়া এবং মাদকের বিস্তারকেও বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, ‘জুয়া এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সব রকমের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি–নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তি অথবা জোর জবরদস্তি নয়/ আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা’।
কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে সরকারপ্রধান বলেন, “আমাদের চারপাশে সমস্যার শেষ নেই। তবে সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাও কিন্তু কম নয়। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে এই জনসংখ্যাই হবে আমাদের ‘জনসম্পদ’। আমরা নিজেদেরকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে শুধু বাংলাদেশই নয় বিশ্ব বাজারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত। তথ্য প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং সচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে”।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অর্থনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবেশও চ্যালেঞ্জিং। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস জনমনে প্রভাব ফেলেছে। সমর্থকদের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ থাকবে, কিন্তু সুশাসনের জন্য সংযম অপরিহার্য। প্রতিশোধমূলক রাজনীতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং চক্রকে দীর্ঘায়িত করে। একটি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনো কখনো আত্মতুষ্টি বা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ মতবিনিময়ের সুযোগ রাখা জরুরি।
বিশ্লেষকরা বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, দুর্নীতি বন্ধ করা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরানো ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়াবে না। ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান পর্যালোচনা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অবসান অপরিহার্য। রপ্তানি বহুমুখীকরণও জরুরি–তৈরি পোশাকের বাইরে নতুন খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে এবং আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে সংযুক্তি গভীর করতে হবে।







