এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (এইউডাব্লিউ) এর শিক্ষার্থীরা তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কোর্সে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইকে (প্যারেড পোকা) অন্তর্ভুক্ত করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটা পরিবেশবান্ধব কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। দীর্ঘদিন যাবত তাদের পচনশীল বর্জ্যের একটা বড় অংশ ল্যান্ড ফিলে যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা তাদের পচনশীল বর্জ্যগুলোকে উৎপত্তিস্থলে আলাদা করে প্রত্যেকদিন শহরের ক্যাম্পাসগুলো থেকে তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস বায়েজিদ আরিফেরনগর Black Soldier Fly Research Center for Waste Managerment এ নিয়ে যান। শিক্ষার্থীরা বর্জ্যগুলোকে নিষ্পত্তির জন্য বিএসএফ মাছি ব্যবহার করেন, আমরা যাকে প্যারেড পোকা বলে থাকি। এরা আমাদের পরিবেশেই বসবাস করছে। গ্রাম অঞ্চলে হাঁস–মুরগি, মাছ ও পাখিরা এই পোকা সব সময়ই খেয়ে আসছে যদিও এটা (Hermetia illuvens) মূলত আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসী। এটি এখন বিশ্বব্যাপী ময়লা আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, টেকসই প্রোটিন ও জৈব সার উৎপাদনে ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ পোকার জীবন চক্র ৪৫ দিন, চারটি প্রধান ধাপে বিভক্ত–মাছি, ডিম, লার্ভা ও পিউপা। পুরুষ মাছি, স্ত্রী মাছির সাথে মিলনের পরে মারা যায় এবং প্রতিটি স্ত্রী মাছি ৪০০ থেকে ৯০০ ডিম দেয়ার পর মারা যায়। এরা আমাদের পরিবেশের নরম, পচনশীল বস্তু, যেমন– ভাত, তরি–তরকারি, শাকসবজি, পচা মাছ, মাংস, গরু, ছাগল, মাছ–মুরগির নাড়িভুড়ি, তাদের বিষ্ঠা ও গোবর ইত্যাদি সবই খায়। মাছির ডিমগুলো হ্যাচিংয়ের পর পচনশীল খাবারের উপরে ছেড়ে দিলে ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে খেয়ে কয়েক হাজার গুন বড় হয় এবং তাদের রং হয় বাদামি যাকে আমরা লার্ভা বলি। এ লার্ভাই হলো হাঁস– মুরগি ও মাছের উত্তম খাবার। এদেরকে জীবিত বা মৃত উভয় অবস্থায় খাওয়ানো যায়। একটি পরিপক্ক লার্ভার ওজন সাধারণত ০.১০ থেকে ০.২২ গ্রাম (বা ২২০ মিলিগ্রাম) পর্যন্ত হতে পারে। লার্ভাগুলো ২ সপ্তাহের মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ ওজনে পৌঁছায় এবং ১ গ্রাম ডিম ব্যবহার করে প্রায় ৩ থেকে ৫ কেজি ওজনের লার্ভা ও সমপরিমাণ জৈব সার উৎপাদন সম্ভব। ডিম ফুটে বের হওয়ার পর প্রায় ১৪–২১ দিন পর্যন্ত এরা খাবার খেয়ে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি করে। উক্ত সময়ে লার্ভাগুলো তাদের শরীরের ওজনের চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি খাবার গ্রহণ করে থাকে। এরা জৈব বর্জ্য খেয়ে খুব দ্রুত ওজন বৃদ্ধি করে, তাই এগুলো মাছ ও মুরগির উন্নত মানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরা পরিবেশবান্ধ, কোন রোগজীবাণু বহন করে না, মানুষের বাসস্থান বা খবরের প্রতি আকৃষ্ট হয় না।
আমার তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে অন্যদিকে হাঁস ও মুরগির উপর বর্জ্য থেকে উৎপাদিত লার্ভার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, তাছাড়া গত ৪ই এপ্রিল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ক্লাবের উদ্যোগে ‘ Zero Waste Day Celebration 2026‘ উপলক্ষ্যে ফারাঙ্গিস পাইয়েজ এর উপস্থাপনা এবং ড. নাজিফা রাফার সঞ্চালনায় এক গঠনমূলক মূলক আলোচনা সভা এম এম আলী ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষজ্ঞ প্যানেলে ছিলেন প্রফেসর ড: সৈয়দ নাজিম উদ্দিন, সীমা এম করিম, প্রফেসর ড: মোঃ আবুল কাসেম ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন এইউডব্লিউ এর স্বনামধন্য শিক্ষক মন্ডলী ও শিক্ষার্থীবৃন্দ। আলোচনায় দেশ–বিদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আলোকে আমাদের নিত্য দিনের বর্জ্যসমূহকে উৎপত্তিস্থলেই অচনশীল, পলিথিন, পেপার ও অন্যান্য এই চারটি ভাগে বিভক্ত করার জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাতে বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস, জৈব সার, পুন:ব্যবহার ও রিসাইক্লিং করা সহজ হবে।
তবে পচনশীল (কঠিন বর্জ্যের ৬০%) বর্জ্যের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ‘বিএসএফ‘ পদ্ধতি যা পরিবেশবান্ধব ও সার্কুলার অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত, ইহা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এই প্রযুক্তির জন্য উন্নত মানের কোন অবকাঠামোর প্রয়োজন হয় না, পরিত্যক্ত শিল্প কারখানা, পরিত্যক্ত বাড়ি বা একটা টিনের চালার নিচে এদের চাষ করা যায়।
আগ্রহী গ্রাহকগণ এই এইউডাব্লিউ এর প্রকল্প থেকে নামমাত্র মূল্যে লার্ভা ও জৈব সার ক্রয় করে শিক্ষার্থীদেরকে গবেষণার কাজে সহায়তা করতে পারেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা নতুন উদ্যোক্তাদেরকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে সিটি কর্পোরেশন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলাবদ্ধতা নিরসন, সুলভ মূল্যে হাঁস–মুরগি ও মাছের বিকল্প খাদ্য সরবরাহ ও উৎপাদিত জৈব সার মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
লেখক : অধ্যাপক, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।













