বরকলের দুর্গম পাহাড়ে অজ্ঞাত রোগে তিন মাসে ৫ মৃত্যু

আক্রান্ত আরো ১৪, মেডিকেল টিম যাচ্ছে আজ

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি | বৃহস্পতিবার , ২১ মার্চ, ২০২৪ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ

রাঙামাটির দুর্গম বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ইউনিয়নের চান্দবীঘাট নামের একটি পাড়ায় ‘অজ্ঞাত রোগে’ তিন মাসে বাবামেয়েসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এটি গত ১০ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত সময়ের ঘটনা। ওই এলাকায় বর্তমানে ১২১৪ জন একই রোগে আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা ও স্বাস্থ্য বিভাগ মৃত্যু এবং আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ডাক্তারসহ ছয় জনের একটি মেডিকেল টিম চান্দবীঘাট পাড়ায় পৌঁছাবে।

রাঙামাটির সিভিল সার্জন (সিএস) ডা. নীহার রঞ্জন নন্দী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ওই এলাকায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার খবর পেতে দেরি হয়ে গেছে। আক্রান্ত এলাকাটি খুবই দুর্গম, সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কও নেই। আমরা খবর পেয়েছি গত মঙ্গলবার বিকালে। সেখানকার কেউই আমাদের বিষয়টি জানায়নি। ইতোমধ্যে ডাক্তারসহ ছয় সদস্যের একটি মেডিকেল টিম রেডি করে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে তারা পৌঁছাবে। ঘটনাস্থলে যেতে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় তাদের হাঁটতে হবে।’ সিভিল সার্জন আরও বলেন, মেডিকেল টিমকে রোগের নমুনা সংগ্রহ করে আনতে বলা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য আইইডিসিআর (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) –এ পাঠানো হবে। তখন রোগের কারণ ও রোগ সম্পর্কে জানা যাবে। তবে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, খাবারের সমস্যা থেকেই হয়তো এই রোগ ছড়িয়েছে।

এদিকে, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরকল উপজেলার ৪ নম্বর ভূষণছড়া ইউনিয়নের ১৪৯ নম্বর গুইছড়ি মৌজার চান্দবীঘাট পাড়ায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল গত জানুয়ারিতে; ওই মাসের ১০ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। তবে বিষয়টি অগোচরেই থেকে যায়। আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গ হিসেবে শরীরে হঠাৎ করে ব্যথা অনুভব, তীব্র তাপমাত্রায় জ্বর আসে, বমি বমি ভাব হয়; কেউ কেউ রক্ত বমিও করে। জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বাবামেয়েসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়। বর্তমানে আক্রান্ত রয়েছে আরো ১২১৪ জন। তবে গ্রামটি প্রত্যন্ত দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে বাংলাদেশী অপারেটরদের মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। পাড়ার দুয়েকজন যারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, তারাও সীমান্তের ওপার অর্থাৎ ভারতের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন। গ্রামের আশপাশে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কমপ্লেঙ না থাকায় পাহাড়ি ওই গ্রামের বাসিন্দারা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছেন স্থানীয় বৈদ্যকবিরাজ দিয়ে।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে বাবামেয়েসহ মারা যাওয়া পাঁচজনের নামপরিচয় পাওয়া গেছে। মৃতরা হলেনলবিন্দর চাকমার ছেলে পত্ত রঞ্জন চাকমা (২৫), পিদেয় চাকমার ছেলে বিমলেশ্বর চাকমা (৫৫), লবিন্দর চাকমার ছেলে চিত্তি মোহন চাকমা (৬০), মিলন শংকর চাকমার ছেলে ডালিম কুমার চাকমা (৩৫) ও ডালিম চাকমার মেয়ে সোনি চাকমা ()। পাঁচজনের মধ্যে পত্ত রঞ্জন চাকমা গত ১০ জানুয়ারি, বিমলেশ্বর চাকমা ৭ ফেব্রুয়ারি, ডালিম কুমার চাকমা ২৬ ফেব্রুয়ারি, চিত্তি মোহন চাকমা ১৫ মার্চ ও সর্বশেষ ১৭ ফেব্রুয়ারি সোনি চাকমা নামের এক ছাত্রী মারা যান। এরমধ্যে ডালিম কুমার চাকমা ও সোনি চাকমা সম্পর্কে বাবামেয়ে।

চান্দবীঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হামিদ জানান, ‘ওই এলাকায় গেল তিন মাস ধরে একটা অজ্ঞাত রোগ দেখা দিয়েছে। শরীর ব্যথা হয়, জ্বর, বমি বমি ভাব, রক্তবমি দেখা যাচ্ছে রোগের উপসর্গ হিসেবে। এ পর্যন্ত শিশুসহ ৫ জন মারা গেছেন। এরমধ্যে আমার বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীও রয়েছে। এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সেখানে কোনো স্বাস্থ্য ক্লিনিক বা চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান না থাকায় স্থানীয়রা কবিরাজি চিকিৎসা চালাচ্ছেন। আমি জানতে পেরেছি এখনো ওই গ্রামের ১২১৪ জনের মতো আক্রান্ত রয়েছে।’

চান্দবীঘাট পাড়াবাসীর বিশ্বাস, এর আগে গ্রামের মানুষ একটি পুরনো বটবৃক্ষ কেটে ফেলেছে। বৃক্ষটি একটি ‘আধ্যাত্মিক বৃক্ষ’ হওয়ায় স্থানীয়রা ‘অজ্ঞাত রোগে’ আক্রান্ত হচ্ছেন। যদিও এই বিশ্বাস উড়িয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, খাদ্যজনিত কারণে এমন রোগ দেখা দিতে পারে।

বরকল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মংক্যছিং সাগর জানান, ‘গত মঙ্গলবার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। এর আগে কেউ বিষয়টি জানায়নি। আমরা এ পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। বুধবার আমরা ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সিভিল সার্জনের সঙ্গে আলাপ করে ছয় সদস্যের একটা মেডিকেল টিম গঠন করেছি। আশা করছি, আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) তারা সেখানে পৌঁছে চিকিৎসাসেবা দিতে পারবেন।’

ছয় সদস্যের গঠিত মেডিকেল টিমের সদস্য এবং আক্রান্ত এলাকার দায়িত্বরত স্বাস্থ্য সহকারী করণ চাকমা দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘চান্দবীঘাট পাড়ায় বাবামেয়েসহ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। একটি মেডিকেল গঠন করা হয়েছে। আমরা সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও চিকিৎসাসামগ্রী গুছিয়ে নিয়েছি। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) সকালে ওই পাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেব।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছয় সদস্য বিশিষ্ট ওই মেডিকেল টিমে একজন এমবিবিএস ডাক্তারসহ সিনিয়র নার্স, হেলথ ও মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট রয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসবচেয়ে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড, ১১ ধাপ পেছাল বাংলাদেশ
পরবর্তী নিবন্ধঈদের আগে ছাঁটাই, লে-অফ চলবে না : শ্রম প্রতিমন্ত্রী