২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বন্ধ হওয়া দেশের সব শিল্প–কারখানা ফের চালু হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যেসব শিল্প–কারখানা বন্ধ হয়েছে, তা চালু করা হবে।’ শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। বৈঠকের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের সব দেশেই অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তা মোকাবেলায় উন্নয়ন বাজেটে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশজনিত যেসব প্রকল্প দেশে চলমান আছে, সেগুলোতে আর্থিক সহায়তা করবে সংস্থাটি।’অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বেসরকারি খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা কাউন্সিলের প্রথম বৈঠকের বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের সরকারি সহায়তার কথা বলেছেন তাঁরা। তিনি বলেন, ‘চলমান ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বিদেশি ভ্রমণকারীদের জন্য ই–ভিসা চালুর দাবি জানিয়েছেন। বিমানবন্দরের ঝামেলা ছাড়াই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে যাতে বাংলাদেশে আসতে পারেন, তার ব্যবস্থা নেওয়া।’ তিনি আরো বলেন, ‘ব্যাংকঋণের সুদহার কমানো, এনবিআর সংস্কার এবং নির্দিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। মাঝারি উদ্যোক্তাদের রপ্তানিতে উৎসাহিত করতে লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজীকরণ এবং আমদানি–রপ্তানি ও বাণিজ্যের গতি আনতে গভীর সমুদ্রবন্দর চালুর আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এর আগে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিতে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা বিএনপির একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেছেন, রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এ উদ্যোগের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হবেন, মালিকানা বা অংশীদারত্বের ধরন কেমন হবে, সে বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রুগ্ন ও বন্ধ পাটকল ও চিনিকলগুলো খুলে দিয়ে সেখানে পুরাতন শ্রমিকদের বহাল রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের জুন মাসে সংসদে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৩৯৭টি। এর মধ্যে বিসিকের নিয়ন্ত্রণাধীন রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প ৩৮২টি, বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন পাঁচটি, বিএসএফআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন ছয়টি চিনিকল এবং বিএসইসির চারটি কারখানা রয়েছে। এরপর গত দুবছরে এ সংখ্যা আরো বেড়েছে। তবে, হালনাগাদ কোনো পরিসংখ্যান সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপটে শিল্প খাতের অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এবং শিল্প খাতের বিকাশে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার বিভিন্ন ধরনের শিল্পনীতি প্রণয়ন করছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করছে। এসব নীতির লক্ষ্য হলো শিল্প খাতের প্রসার ঘটানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে শিল্প খাতের বিকাশে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁরা বলেন, বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প খাতের আরেকটি বড় সংকট। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং ওষুধ শিল্পে এর প্রভাব গভীর। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি শুধুমাত্র উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ডলার সংকটও শিল্প খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবের কারণে কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা তাঁদের প্রয়োজনীয় উপকরণ আনতে না পেরে উৎপাদন প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চালাচ্ছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হচ্ছে। তাই সঠিক পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাত একটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এই খাতের উন্নয়ন শুধু দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, বরং একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





