চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের সাথে স্বজনদের সাক্ষাতের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। দীর্ঘ ভোগান্তির পর গতকাল দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কারাগারটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে ইন্টারকম টেলিফোন সেবা। এর ফলে গ্রিলের দুই পাশে দাঁড়িয়ে বন্দি ও স্বজনদের আর চিৎকার করে কথা বলতে হচ্ছে না। স্বজনদের সাথে সরাসরি এবং স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারবেন বন্দিরা।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই ওয়ান–টু–ওয়ান ইন্টারকম সেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। তার আগ্রহেই মূলত কারাগারে আধুনিক এ সেবা চালু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোহার গ্রিলের এক পাশ থেকে অপর পাশে চিৎকার করে বন্দি–স্বজনের কথা বলার যে প্রচলিত পদ্ধতি ছিল, তা যেমন কষ্টসাধ্য ছিল তেমনি এতে গোপনীয়তা বজায় থাকত না। নতুন এই ইন্টারকম সিস্টেম স্থাপনের ফলে দুই প্রান্তে থাকা বন্দি ও তাদের স্বজনরা রিসিভারের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে কথা শুনতে পাবেন। উচ্চস্বরে কথা বলার প্রয়োজন হবে না, সেই সাথে সাক্ষাৎ কক্ষে আগের মতো হট্টগোলও হবে না। মোটাদাগে বলা যায় যে, ইন্টারকম সেবা চালুর মাধ্যমে কারাগারে শৃঙ্খলার বড় রকম উন্নতি পরিলক্ষিত হতে যাচ্ছে। একইভাবে বন্দি ও স্বজনদের মধ্যে মানসিকভাবে স্বস্তিদায়ক যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি হবে।
কারাগার সূত্র জানায়, কারাগারকে সংশোধনাগারে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় ইন্টারকম সেবা চালু একটি বড় পদক্ষেপ। পর্যায়ক্রমে এ পরিধি আরো বাড়ানো হলে বন্দি ও তাদের স্বজনরা আরো বেশি উপকৃত হবে। ইন্টারকম সেবার মাধ্যমে কথা বলার সময় নির্ধারিত থাকবে উল্লেখ করে জানানো হয়, এ সংক্রান্ত প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
কারাগার সূত্র আরো জানায়, এটি একটি ব্যতিক্রম ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশের কারাগারগুলোতে ইন্টারকম চালুর এটি দ্বিতীয় উদ্যোগ হলেও একসাথে ৩২টি বুথ স্থাপন কার্যক্রম প্রথমবার বাস্তবায়িত হয়েছে চট্টগ্রাম কারাগারে। উদ্বোধনী দিনে ইন্টারকম ব্যবহার করে বন্দির সাথে কথা বলা এক স্বজন বলেন, আগে চিৎকার করে কথা বলতে হতো, অর্ধেকের বেশি কথা বোঝা যেত না। আজকে (গতকাল) খুব শান্তিতে এবং স্পষ্টভাবে কথা বলতে পেরেছি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া।
হত্যা মামলায় প্রায় ১ বছর ধরে বন্দি নগরীর খুলশীর আমবাগান এলাকার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বাবুলের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন তার স্বজনরা। তার বন্ধু সাইফুল হোসেন বলেন, আগে কিছুই বুঝতাম না। আমরা কী বলছি, ভেতর থেকে কী বলছে– সব শব্দের মধ্যে হারিয়ে যেত। আজ ইন্টারকমে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বললাম।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বর্তমানে এই কারাগারে ৬ হাজার ৪৫৫ জন বন্দি রয়েছেন। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক স্বজন সাক্ষাতে আসেন। ভিড় ও শব্দের কারণে এতদিন অনেকেই ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না। তিনি বলেন, আমি নিজেও কথা বলে দেখেছি। একটি ছোট শিশু তার বাবার সাথে কথা বলেছে। কিছুই সে ঠিকমত বুঝতে পারেছে না। বিষয়টি কষ্টদায়ক। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার আদালত করবে জানিয়ে তিনি বলেন, বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা তো কোনো অপরাধী নন। কারাগারে অবস্থানকালে আমরা যতটুকু সম্ভব মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই।
ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে একসময় হয়তো অনলাইনে সাক্ষাৎ বা ভিডিও কলে দেখেও কথা বলার ব্যবস্থা হবে। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারা অধিদপ্তরের অনুমোদনে আলহাজ্ব শামসুল হক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে কারাগারের নিচতলায় দুই পাশে ১৬টি করে মোট ৩২টি ইন্টারকম সেবা চালু করা হয়েছে। এরমধ্যে ১২টি পুরুষ ও ৪টি মহিলা বন্দিদের জন্য বরাদ্দ। পর্যায়ক্রমে দ্বিতীয় তলাতেও সম্প্রসাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছে কারাগার কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন জানান, পুরনো যে পদ্ধতি সেটি স্বস্তিদায়ক নয়। এখন আর চিৎকার করে কথা বলতে হবে না। সারাদেশের কারাগারের মধ্যে চট্টগ্রাম কারাগারেই প্রথম এত বড় পরিসরে ইন্টারকম সেবা ব্যবস্থা চালু হল।












