বন্দর থেকে ৪ দিনের মধ্যে পণ্য খালাসের নির্দেশনা অর্থমন্ত্রীর

দাম বাড়ার পেছনে বন্দর ঘিরে ' অ্যাক্টিভিটিজ ' দায়ী

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে চারদিনের মধ্যে পণ্য খালাসে প্রয়োজনী ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গতকাল শুক্রবার বিকেলে নগরের মেহেদীবাগের বাসভবনে চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন। এ সময় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার পেছনে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে বিভিন্ন ‘অ্যাক্টিভিটিজ’কে দায়ি করেছেন অর্থমন্ত্রী।

জানা গেছে, বৈঠকে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি আমিরুল হক ২৪ ঘণ্টায় পণ্য খালাসের ব্যবস্থার দাবি জানান। এ সময় কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ শফি উদ্দিন পণ্যের নমুনা পরীক্ষাসহ নানা কারণে একাংশ আমদানি পণ্যের শুল্কায়নে সময় লাগে বলে জানান। পরে সব দিক বিবেচনা করে অর্থমন্ত্রী চার দিনের মধ্যে শুল্কায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন। এ জন্য যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করতে নির্দেশনা দেন তিনি, যাতে দ্রুত সমাধান করা যায়।

সভা শেষে আমীর খসরু সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর যারা অপারেট করে, যারা স্টেকহোল্ডারতারা যার যার মতো করে এখানে একটা জীবন সৃষ্টি করেছে, যার যার মত করে বাবেল সৃষ্টি করেছে। এ কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। দাম বাড়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ছাড়াও শিল্পকারখানারসহ সার্বিকভাবে যেসব মালামাল আসছে, সব ক্ষেত্রে এটার প্রতিফলন ঘটছে। তিনি গতকাল শুক্রবার বিকেলে নগরের মেহেদীবাগের বাসভবনে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। খসরু বলেন, বন্দরের কারণে শুধু নিত্যপণ্যই নয়, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্টের কস্টও (মূল্যও) বাড়ছে। এজন্য চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস, সিএন্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন, শ্রমিককর্মচারীসহ সব স্টেকহোল্ডাদের নিয়ে বসেছি। পুঙ্খানুপুঙ্খানুভাবে আলোচনা করছি, বিবেচনা করছি। কোথায় কোথায় সমস্যা হচ্ছে, সমস্যার কারণে দাম বাড়ছে।

অনেকগুলো সমস্যার সমাধান দিতে পেরেছেন জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেকগুলো বিষয়ে সমাধান দিতে আমাদের সময় লাগবে। কারণ, এগুলোতে ইন্টার মিনিস্ট্রির বিষয় রয়েছে। আমরা আশা করছি, খুব সহসা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে গতি আসবে। সাথে সাথে যেসব পণ্য আটকে আছে এগুলো দ্রুত খালাস হবে। খালাস করতে পারলে এগুলোর ওপর যে আলাদা কস্ট আসছে, সেটা কমে আসবে।

তিনি বলেন, এখন রোজার যে পণ্যগুলো আছে, এগুলোর ডেলিভারি খুব স্লো। এগুলো যাতে তাড়াতাড়ি ডেলিভারি দেওয়া যায় তার ব্যবস্থা করছি। ডেলিভারি কম থাকলে বাজারে পণ্যের দাম তো বাড়তে থাকবে। খসরু বলেন, সার্বিকভাবে বন্দরে অনেক সমস্যা আছে। প্রত্যেকটা স্টেকহোল্ডারের সাথে বসতে হবে। কিছু কিছু সমাধান হয়েছে। আর কিছু বিষয়ে আলাপআলোচনার বিষয় রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যার কারণে দেশের অর্থনীতি যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এটার কারণে কস্ট অব প্রোডাক্ট (পণ্যমূল্য) বেড়ে যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে, অনেকগুলো কারণের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম একটা বিশেষ কারণ। আমরা এসব সমস্যার সমাধান দিতে চাইবো।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস কমিশনার মো. শফিউল্লাহ, চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ, পরিচালক (নিরাপত্তা) লে. কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম, পোর্ট ইউজার্স ফোরামের আহ্বায়ক আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতি ও এলপিজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুল হক, বিজিএমইএর পরিচালক এম এ সালাম, বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিকলস ইমপোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সাবেক নেতা হাবিবুর রহমান, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছেচট্টগ্রাম বন্দর ট্যারিফ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করার কারণে বন্দর ব্যবহারকারীগণ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। যার প্রভাব পড়ছে সরাসরি পণ্যের বাজারদরের উপর। এক্ষেত্রে বর্ধিত ট্যারিফ স্থগিত করে স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনাক্রমে যৌক্তিকহারে ট্যারিফ পুননির্ধারণ করা। বন্দরের স্ক্যানিং মেশিন প্রায় সময় বিকল থাকার কারণে কন্টেনার স্ক্যানিংয়ে বিলম্ব হয়। ফলে যথাসময়ে পণ্য খালাস নেওয়া সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে দ্রুত স্ক্যানিং সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নতুন স্ক্যানিং মেশিন সংযোজনের ব্যবস্থা করা। বন্দরের অন্যান্য ইয়ার্ডে পণ্য স্পেশাল পারমিশনের মাধ্যমে দ্রুত ডেলিভারী নেওয়া গেলেও এনসিটি ইয়ার্ডে পণ্য ডেলিভারীর জন্য স্পেশাল পারমিশন পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে দ্রুত পণ্য ডেলিভারী নিশ্চিতকল্পে এনসিটি ইয়ার্ডে স্পেশাল পারমিশন ব্যবস্থা চালু করা। বন্দরে রাত ১২টা পর্যন্ত আনস্টাফিং কার্যক্রম চালু রাখার লক্ষ্যে শিফিটিং ডিউটির মাধ্যমে কাস্টমস আনস্টাফিং কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। পণ্যের কায়িক পরীক্ষণ কার্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বেলা ১২ টা থেকে কায়িক পরীক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা। বন্দরের বাইরে যানজট নিরসনে গেইট পাস নেওয়া পণ্যবাহী গাড়ি যেকোনো গেইট দিয়ে প্রবেশের অনুমতি প্রদান করা এবং বন্দরের মহেশখালী ব্রিজ দিয়ে সিকিউরিটি পারমিশন ব্যতিত গাড়ি যাতায়াতের সুযোগ প্রদান করা। অনচ্যাসিস কন্টেনার ডেলিভারী দ্রুত করার লক্ষ্যে ট্রেইলার পারমিশন ব্যবস্থা সহজীকরণ করা। গ্যান্ট্রি ক্রেন বিকল ও স্বল্পতার কারণে জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গ্যান্ট্রি ক্রেন সংযোজন করা। পণ্য খালাস দ্রুততর করতে অফডকগামী কন্টেনার চট্টগ্রাম বন্দরে স্ক্যানিংয়ের পরিবর্তে অফডকে খালাসকালে কায়িক পরীক্ষা করা। লাইটারেজ জাহাজ স্বল্পতা দূরীকরণে নতুন লাইটারেজ জাহাজ সংযোজন করা এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বন্ধ করা। পণ্য পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণে পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটদের চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বন্দরের জনবল কাঠামোর তুলনায় কম। বন্দরের কার্যক্রম গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া। অধিকাংশ অফডকে পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এর পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে সময়ক্ষেপণ ঘটে এবং পণ্য খালাস প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। এক্ষেত্রে দ্রুত কন্টেনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইক্যুইপমেন্ট রাখা বাধ্যতামূলক করা। অফডকে শ্রমিক কর্তৃক পণ্য জিম্মি করে অনৈতিকভাবে বকশিস দাবি করে হয়রানি বন্ধ করা।

বৈঠকে আমীর খসরু বন্দরের অধিকাংশ স্ক্যানিং মেশিন দীর্ঘদিন অচল থাকার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিকল মেশিনগুলো সচল করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এত গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি কীভাবে দিনের পর দিন অচল থাকে? এ ধরনের গাফিলতি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। পণ্যজট ও ধীরগতির সরবরাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে এসব স্ক্যানিং মেশিনের অচলাবস্থা।

তিনি বলেন, সর্বোচ্চ দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের পদ্ধতি অনুসরণ করে বন্দর পরিচালনার বিকল্প নেই। বাজারে পণ্যমূল্য, বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে পরিচালন ও সেবার ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে।

খসরু বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নির্বিঘ্ন পরিচালনা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে নৌপরিবহন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি নিজে বিষয়গুলো তদারকি ও পর্যবেক্ষণ করবেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসহানুভূতি ও মমত্ববোধই সিয়াম সাধনার দর্শন
পরবর্তী নিবন্ধএকুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা