চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে দেশের উত্তর এবং পশ্চিমাঞ্চলে একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। ঢাকা–চট্টগ্রাম–উত্তর–পশ্চিম সংযোগ জোরদারে অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিনিধিদলটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করবে। প্রতিনিধিদলটি গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। আজ সকাল থেকে তারা বিভিন্ন বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক করা, বহুমুখী পরিবহন সংযোগ জোরদার এবং আঞ্চলিক একীভূতকরণ শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে নর্থওয়েস্ট–ঢাকা–সাউথইস্ট ইকোনমিক করিডর নিয়ে চলমান গবেষণার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনে আসছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উচ্চপর্যায়ের একটি মিশন। এ মিশনের জন্য সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কাছে আনুষ্ঠানিক মিশন ক্লিয়ারেন্স চেয়ে চিঠি দিয়েছে এডিবির বাংলাদেশ রেসিডেন্ট মিশন। দুদিনের এই সফরে এডিবির প্রতিনিধিদল চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করবে এবং বন্দরভিত্তিক লজিস্টিকস, সড়ক–রেল সংযোগ, পণ্যপ্রবাহ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও উন্নয়ন চাহিদা বিশ্লেষণ করবে। এডিবি চিঠিতে জানিয়েছে, এই পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহের ভিত্তিতে করিডরভিত্তিক অর্থনৈতিক হাব ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে।
সূত্র জানায়, বন্দরের দক্ষতা ও সংযোগ ব্যবস্থা এই মিশনের মূল ফোকাস হিসেবে রয়েছে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা মূল্যায়ন, বন্দরের সঙ্গে হিন্টারল্যান্ড সংযোগ (ঢাকা ও উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ) পর্যালোচনা, আমদানি–রপ্তানি ট্রেড ফ্লো বিশ্লেষণ, অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিতকরণ, বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সুযোগ অনুসন্ধান প্রভৃতি দেখা হবে।
এডিবি মনে করছে, চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে সড়ক, রেল ও বহুমুখী পরিবহন নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা গেলে জাতীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে গতি আসবে এবং করিডরভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
গতকাল সন্ধ্যায় প্রতিনিধিদলের সদস্যরা চট্টগ্রামে পৌঁছেছেন। মিশনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এডিবির বাংলাদেশ রেসিডেন্ট মিশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর হো ইউন জিয়ং। তার সঙ্গে রয়েছেন সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট স্পেশালিস্ট ও মিশন লিডার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, লিড ইনভেস্টমেন্ট অফিসার (পিএসওডি) বিদ্যুৎ কে সাহা, প্রিন্সিপাল ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর অফিসার মারুফ হোসেন, সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার (ট্রান্সপোর্ট) মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ও প্রজেক্ট অফিসার (ট্রান্সপোর্ট) অমৃতা কুমার দাস।
দলটি বন্দর উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ, আঞ্চলিক সংযোগ এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগ–ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে কৌশলগত ও কারিগরি আলোচনা করবে। মিশনের কার্যপরিধিতে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বর্তমান অবস্থা এবং সীমাবদ্ধতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ও উত্তর–পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান সড়ক করিডরের সক্ষমতা ও জটের কারণ, চলমান ও প্রস্তাবিত সড়ক প্রকল্পগুলোর বন্দর অ্যাকসেসের সঙ্গে সামঞ্জস্য, রেল সংযোগের সক্ষমতা, গেজ কনভার্সন, ইলেকট্রিফিকেশন ও মাল্টিমোডাল ইন্টিগ্রেশন, ধীরাশ্রম আইসিডি ও অন্যান্য ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপোর ভূমিকা খতিয়ে দেখবে। এছাড়া সম্ভাব্য পিপিপি (পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ) ও বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ, আর্থিক বিশ্লেষণ এবং এডিবির মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকি মূল্যায়নও করা হবে।
প্রতিনিধিদলটি আজ সকালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক ও বন্দর পরিদর্শন শেষে সড়ক ও রেল বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বন্দর অ্যাকসেস প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করবে। এডিবির অনুরোধে ইআরডি এই মিশনে মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক এই করিডর গবেষণা বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে সড়ক–রেল–লজিস্টিকস অবকাঠামোয় সমন্বিত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে, যা জাতীয় বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগেও নতুন মাত্রা যোগ করবে।












