নৌপরিবহন উপদেষ্টার আশ্বাসের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার কর্মবিরতি দুই দিনের জন্য স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বন্দর ভবনে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর। এ সময় নৌ উপদেষ্টার আশ্বাস অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে রোববার থেকে আবার কর্মবিরতি কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দেন তিনি। এদিকে নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, আগামীকাল (আজ শুক্রবার) সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর সচল করা হবে, কেউ বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যাবে।
নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল ডিপিওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চলমান আন্দোলন কর্মসূচির ষষ্ঠ দিনে এই ঘোষণা দিলেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা। এর আগে শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করে আসছেন তারা। এ সময় বন্দরের পক্ষ থেকে কোনো আলোচনার উদ্যোগ না নিয়ে কর্মচারীদের বদলির ব্যবস্থা করা হয়, যে কারণে আন্দোলন কর্মসূচি তীব্র হয়েছিল বলেও জানান শ্রমিক নেতারা।
তারা বলেন, আমাদের দুইজন সমন্বয়ককে বোট ক্লাবে উপদেষ্টার সাথে একান্তে বৈঠকের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। আমরা ওই প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বন্দর ভবনেই বৈঠক করতে হবে এবং সেই বৈঠকে বন্দর চেয়ারম্যান থাকতে পারবেন না মর্মে শর্ত দিই। পরে আমাদের শর্ত মেনেই বন্দরের বার্থিং সভাকক্ষে বৈঠক হয়। বৈঠকে বন্দর চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন না।
উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের কথা তুলে ধরে সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন সাংবাদিকদের বলেন, উপদেষ্টা মহোদয়ের সঙ্গে বৈঠকে আমরা চারটি দাবি জানিয়েছি। এই চারটি হলো নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপিওয়ার্ল্ডকে দেওয়া যাবে না। কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করতে হবে। বন্দর চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের পদত্যাগও দাবি করেছি।
ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে তিনি (উপদেষ্টা) উচ্চপর্যায়ে আলাপ করার কথা বলেছেন। বাকি দাবিগুলোর বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। এ জন্য আমরা শনিবার পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করেছি। তবে শনিবারের মধ্যে যদি কোনো সিদ্ধান্ত না আসে, তাহলে রোববার থেকে কর্মসূচি আবার চলবে।’
এর আগে শনি–সোম প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার সরকারি প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। মঙ্গলবার থেকে প্রথমে ২৪ ঘণ্টার এবং পরে টানা কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিকরা। টানা কর্মবিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়ে। বন্দরে জাহাজ বার্থিং কিংবা ছেড়ে যাওয়া, কন্টেনার হ্যান্ডলিং, ডিপোতে কন্টেনার স্থানান্তর কিংবা ডিপো থেকে বন্দরে কন্টেনার আনা নেয়াসহ বন্দরের সব কাজই বন্ধ হয়ে পড়ে। বন্দর থেকে আমদানি পণ্য ডেলিভারি কিংবা রপ্তানি পণ্য শিপমেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতির চরম অবনতিতে উদ্বিগ্ন বন্দর ব্যবহারকারীরা শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান সরকারকে। এই আহ্বানের একদিনের মাথায় চট্টগ্রামে আসেন নৌ পরিবহন উপদেষ্টা।
চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে গতকাল বেলা ১১টা নাগাদ নৌপরিবহন উপদেষ্টা আন্দোলনরত শ্রমিক কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন। ওই সময় আন্দোলনকারীরা নানা স্লোগান দেন।
আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে গাড়ি থেকে নেমে যান উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। এ সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থেকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন উপদেষ্টাকে বলেন, ‘৩২ বছর ধরে বন্দরে চাকরি করছি। এ রকম চেয়ারম্যান আমরা দেখিনি। গত দেড় বছরে আমাদের নানাভাবে হয়রানি করেছে। দেখা করতে গেলে দেখা পাই না। এই চেয়ারম্যানের অপসারণ চাই।’
এ সময় উপদেষ্টা আন্দোলনকারীদের বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলব। চেয়ারম্যান থাকবেন না।’ উপদেষ্টার কথায় আশ্বস্ত হন আন্দোলনকারীরা। তিনি আন্দোলনকারীদের বলেন, গত দেড় বছর আপনাদের সঙ্গে কাজ করছি। আমি আপনাদের কথা শুনব। আপনাদেরও আমার কথা শুনতে হবে।
পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় বন্দর ভবন থেকে বৈঠক শেষে বের হওয়ার সময় উপদেষ্টা আবারও আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। উপদেষ্টা তাদের বলেন, আমি শ্রমিক নেতাদের কথা শুনব, আমিও কথা বলব। দেশের কোনো ক্ষতি হোক আমি তা চাই না। পরে তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বন্দর ভবনে বৈঠক করেন।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে নৌ উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, ‘রোজার আগে বন্দর বন্ধ করে এ ধরনের আন্দোলন অত্যন্ত অমানবিক। বন্দর বন্ধ রাখার কারও কোনো এখতিয়ার নেই। বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যাবে। কাল সকাল থেকে সচল না হলে সরকার হয়তো অন্যভাবে দেখবে।’ নৌ উপদেষ্টা যখন সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছিলেন, তখনো বিক্ষুব্ধ শ্রমিক কর্মচারীরা মিছিল করছিলেন।
নিউমুরিং টার্মিনালের চুক্তি নিয়ে নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘চুক্তি বোধ হয় ঠেকানো যাবে না। তবে দেশের ক্ষতি করে কোনো চুক্তি হবে না।’ ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নেগোসিয়েশন চূড়ান্ত হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাড়াহুড়ো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো তাড়াহুড়ো নয়, তিন মাস আগ থেকেই নেগোসিয়েশন চলছে। ছয়মাস আগ থেকে তারা এখানে এসেছে।
সব বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, আমি তাদের সাথে কথা বলেছি, আমার বক্তব্যও দিয়েছি। এখন আমি ফিরে গিয়ে উচ্চ পর্যায়ে তাদের কথা পৌঁছে দেবো।
দেশের ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি করার অধিকার কারো নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর বলেন, এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরকার সরে না আসলে এবং শ্রমিকদের শাস্তিমূলক বদলি প্রত্যাহার ও হয়রানি বন্ধ না করলে আবারো কর্মবিরতি চলবে।
এনসিটি ইস্যুর এই আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দরে যে জাহাজ এবং কন্টেনার জট তৈরি হয়েছে তা সামাল দিতে বেশ কয়েকদিন সময় লাগবে বলেও বন্দরের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা গতকাল বিকেলে বোট ক্লাবে বন্দর ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে বৈঠক করেন। এতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, সিএন্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশন, বার্থ অপারেটরস এন্ড শিপ হ্যান্ডলিং এসোসিয়েশন, বিকডাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন। বৈঠকে বন্দর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে সূত্র জানিয়েছে।












