বন্দরে আজ থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি

এবার বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধ করার ঘোষণা । এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেয়ার সরকারি ঘোষণাসহ ৪ দাবি বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের । শঙ্কায় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ

দুদিন চালু থাকার পর আজ সকাল থেকে আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। এবার বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেওয়ার সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণাসহ চার দাবিতে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ আজ রোববার সকাল ৮টা থেকে পুনরায় চট্টগ্রাম বন্দরে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি আহ্বান করেছে।

গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দুই সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকন লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। অপরদিকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের এবারের কর্মসূচি কার্যকর হলে পুরো বন্দর অচল হয়ে পড়বে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। নতুন করে বন্দর অচলের কর্মসূচিতে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিসহ বন্দর ব্যবহারকারীদের মাঝে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গত শনিবার থেকে ৮ ঘণ্টা করে তিন দিন এবং মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করে আসছিল বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার পরিবহন এবং জাহাজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে। তবে বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর বিকালে লাগাতার কর্মবিরতি দুদিনের জন্য স্থগিত করেন সংগঠনটির নেতারা। শ্রমিক নেতারা নৌ উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপকালে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিলের সুস্পষ্ট ঘোষণা এবং শ্রমিককর্মচারীদের বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন। নৌ উপদেষ্টাকে তারা বলেছিলেন, দাবি মানা বা স্পষ্ট ঘোষণা দেয়া না হলে রোববার সকাল থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দরে কর্মবিরতি পালন করা হবে।

এদিকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন স্থগিত করার পরপর আন্দোলনরত ১৫ জন কর্মচারীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন জানায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানাতে অনুরোধ করা হয়। এ খবর জানতে পেরে আন্দোলনকারীরা ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন।

গতকাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, বৃহস্পতিবার উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে পূর্ণাঙ্গ আশ্বাস না পেলেও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ও রোজার পণ্য খালাসের কথা বিবেচনা করে আমরা লাগাতার কর্মবিরতি কর্মসূচি স্থগিত করেছিলাম। তবে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্দোলনকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ চিঠি দেয়। এই পদক্ষেপ নিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান (রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান) পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছেন। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আবারো লাগাতার কর্মসূচিতে যাওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।

সংবাদ সম্মেলনে সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন চার দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হচ্ছে, এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেয়ার ঘোষণা দিতে হবে সরকারকে। এছাড়া ‘চট্টগ্রাম বন্দরের সংকটের প্রধান কারণ’ বর্তমান চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে বন্দরের চেয়ারম্যান পদ থেকে প্রত্যাহার করে আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা, বিগত আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে তা বাতিল করে প্রত্যেক কর্মচারীকে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বস্ব পদে পুনর্বহাল করতে হবে। আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগ্রাম পরিষদের নেতা ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মোহাম্মদ হারুণ, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, কার্যকরী সভাপতি আবুল কাসেম, মার্চেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সমন্বয়ক ইয়াসিন রেজা রাজু, জাহিদ হোসেন, মোহাম্মদ হারুন, উইন্সম্যান সমিতির ইমাম হোসেন খোকন, শরীফ হোসেন ভুট্টো প্রমুখ।

উল্লেখ্য, দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত আমদানিরপ্তানি পণ্যের ৭৮ শতাংশ পরিবহন হয়। কন্টেনারজাত পণ্যের প্রায় পুরোটা পরিবহন হয় এই বন্দর দিয়ে। বন্দর বন্ধ হলে কন্টেনারে রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কন্টেনারে বোঝাই করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত শিল্পের কাঁচামাল খালাসও বন্ধ হয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর জানান, এবারের ধর্মঘটে জেটি, ইয়ার্ড, টার্মিনাল, প্রশাসনিক ভবনের পাশাপাশি বহির্নোঙরেও (আউটারে লাইটারিং) অপারেশনাল কাজ বন্ধ থাকবে। গেল সপ্তাহের আন্দোলনে বন্দর অচল থাকলেও বহির্নোঙরে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলেছিল। শ্রমিক কর্মচারীদের কর্মসূচি কার্যকর হলে আজ সকাল থেকে বহির্নোঙরের কার্যক্রমও বন্ধ থাকবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না এমন বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান নিয়ে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করে। এসব পণ্য দেশের অন্তত ২৫টি অঞ্চলে পরিবাহিত হয়। বহির্নোঙরে অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হলে সারা দেশের সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি ভেঙে পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর ও এর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এনসিটি রক্ষার স্বার্থে এই আন্দোলন যৌক্তিক, সময়োপযোগী এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর বলে মন্তব্য করেছেন স্কপ নেতৃৃবৃন্দ। স্কপের পক্ষে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, স্কপ চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক এস কে খোদা তোতন ও ইফতেখার কামাল খান, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি খোরশেদুল আলম, বিএফটিইউসির সভাপতি কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, বিএলএফের সভাপতি নুরুল আবসার তৌহিদ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা হেলাল উদ্দিন কবির, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ উদ্দিন শাহিন এক যুক্ত বিবৃতিতে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) . এম সাখাওয়াত হোসেন চট্টগ্রাম সফরকালে আমরা আশা করেছিলাম তিনি স্কপ ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে হার্ড লাইনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে ও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছেন। তাঁর নির্দেশে আন্দোলনের নেতা ইব্রাহীম খোকন ও হুমায়ুন কবিরসহ ১৫ জন কর্মকর্তাকর্মচারীর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের সম্পদের তদন্তের উদ্যোগ স্পষ্টত প্রতিহিংসাপরায়ণ ও উস্কানিমূলক পদক্ষেপ।

স্কপ মনে করে, শ্রমিককর্মচারীদের ন্যায্য দাবি ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার আন্দোলনকে দমনপীড়নের মাধ্যমে দমিয়ে রাখার চেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক হয়রানি পরিস্থিতিকে সমাধানের পথে না নিয়ে বরং সংঘাতের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের হার্ড লাইনে যাওয়া ছিল অনিবার্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকেই প্রতিরোধ