বন্দরের অচলাবস্থা কাটেনি আজও ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি

এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারার সিদ্ধান্ত বন্দর ভবন অভিমুখে আজ স্কপের কালো পতাকা মিছিল কন্টেনার ও জাহাজজটের শঙ্কা

আজাদী প্রতিবেদন | সোমবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৫৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের মতো অচলাবস্থা বিরাজ করছে চট্টগ্রাম বন্দরে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি ঘোষণা করেছে। সব শ্রমিক সংঘঠন ও বন্দর ব্যবহারকারীদের এই আন্দোলনে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল রোববার বিকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর।

এদিকে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ডাকা দুদিনের কর্মবিরতির শেষ দিন গতকাল সকাল থেকে বন্দরের অপারেশনাল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতির কারণে জেটিতে অবস্থানরত জাহাজ থেকে কন্টেনার ও পণ্য ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে আমদানিরপ্তানি কার্যক্রমে ধস নামার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তৃতীয় দিনের ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) গতকালের পূর্বঘোষিত বন্দর ভবন অভিমুখে কালো পতাকা মিছিল একদিন পিছিয়ে আজ বিকালে করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। একইসাথে স্কপের পক্ষ থেকে আজকের ৮ ঘণ্টা কর্মবিরতি কর্মসূচির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। শ্রমিককর্মচারীদের আন্দোলনের পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলছিল বিষয়টি নিয়ে। গত বৃহস্পতিবার হাই কোর্ট এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিট খারিজ করে। চুক্তি করার প্রক্রিয়াটিকে বৈধ ঘোষণা করে উচ্চ আদালত।

এই আদেশের খবর চট্টগ্রাম বন্দরে ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিককর্মচারীদের মাঝে উত্তেজনা দেখা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে তারা বন্দর ভবনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। গত শনিবার এবং গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করা হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ অফিস চলাকালে মিছিল, মহড়া এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাকর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও শ্রমিককর্মচারীরা তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।

শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় সিএমপি কমিশনার এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্দর এলাকায় মিছিলসমাবেশ ও অস্ত্র বহনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত এক মাসের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। গতকালও বন্দর ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) টার্মিনালে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এনসিটি ও চট্টগ্রাম কন্টেনার টার্মিনালে (সিসিটি) কিছু কার্যক্রম চললেও আন্দোলনের ফলে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে দেখা গেছে। বন্দরের ইকুইপমেন্ট অপারেটর ও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনার এবং বহির্নোঙরে জাহাজের জট দেখা দেয়ারও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত এলাকায় গতকাল অপেক্ষমাণ প্রচুর গাড়ি দেখা গেছে। ওখানে স্ক্র্যাপবাহী গাড়ির দীর্ঘ জটও চোখে পড়েছে। বন্দরের গেটগুলো খোলা থাকলেও কর্মবিরতি চলাকালে কোনো গাড়ি ঢুকতে বা বের হতে দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব মোহাম্মদ রুহুল আমিন সিকদার আমদানিরপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বলে স্বীকার করেন।

বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী বলেন, শ্রমিক ও অপারেটররা কাজে না আসায় জিসিবিতে কোনো কাজ হচ্ছে না। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।

শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ৪ শ্রমিক নেতাকে ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেনার টার্মিনালে (আইসিটি) বদলি করা হলেও গতকাল বদলিকৃত শ্রমিক নেতা ইব্রাহিম খোকন, মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির, মোহাম্মদ আনোয়ারুল আজিম ও মোহাম্মদ ফরিদুর রহমানকে আন্দোলনে দেখা গেছে। তাদেরকে পানগাঁও যোগদান করতে বলা হলেও সেখানে তারা যাননি বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। অবশ্য শ্রমিক নেতারা বদলির এই আদেশকে আন্দোলন দমানো এবং প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন গতকাল বলেন, স্বার্থবিরোধী চুক্তির মাধ্যমে লাভজনক এনসিটি টার্মিনাল দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। আমরা দেশ ও বন্দরের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানাচ্ছি।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ আজ পুনরায় সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি ঘোষণা করছে। গতকাল বিকালে প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই কর্মসূচি ঘোষণা করে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে রাখা এবং চুক্তি করার উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিবাদে ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ঘোষিত সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দুদিনের ১৬ ঘণ্টার কর্মবিরতি সফল হয়েছে। উক্ত কর্মসূচি সফল করায় চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বস্তরের কর্মকর্তাকর্মচারী, স্কপ ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সর্বস্তরের সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকন বলেন, দুদিনের আন্দোলনসংগ্রামের পরও কর্তৃপক্ষ বা সরকার আমাদের সাথে কোনো আলোচনা করেনি। অধিকন্তু কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের চট্টগ্রাম থেকে পানগাঁও আইসিটিতে ট্রান্সফার ও স্ট্যান্ড রিলিজ করে যাচ্ছেন। এতে করে আন্দোলন আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। দুই সমন্বয়ক বলেন, কর্তৃপক্ষ ও সরকার আমাদের সাথে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ালে আমাদের হয়তো আর কোনো প্রোগ্রামে যেতে হতো না। কিন্তু তা না করে আমাদেরকে আন্দোলনে যেতে বাধ্য করছে।

অপরদিকে স্কপ নেতৃবৃন্দ গতকাল সকালে সভা করে আজকের কর্মসূচির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহারের সভাপতিত্বে এবং টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও স্কপের যুগ্ম সমন্বয়ক ইফতেখার কামাল খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তপন দত্ত, বিএফটিইউসির সভাপতি কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান হোসেন, টিইউসি কেন্দ্রীয় সংগঠক ফজলুল কবির মিন্টু, বন্দর শ্রমিক দলের নেতা ইব্রাহীম খোকন ও হুমায়ুন কবির সভায় উপস্থিত ছিলেন। সভায় পূর্ব ঘোষিত কালো পতাকা মিছিল অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করে আজ সোমবার সকাল ১১টায় আগ্রাবাদের বাদামতল থেকে বন্দর ভবন অভিমুখে যাত্রা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিসহ বন্দর ব্যবহারকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বন্দরের এই অচলাবস্থার কারণে সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সঠিক সময়ে পণ্য ডেলিভারি না হলে শিল্প উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধইইউর সঙ্গে দ্রুত এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরুর আহ্বান প্রধান উপদেষ্টা
পরবর্তী নিবন্ধবেলুচিস্তানে বোমা ও বন্দুক হামলা, নিহত ১৯৩