২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলের খনন কাজের উদ্বোধন করেন, সেদিন থেকে চট্টগ্রামের মানুষ অপেক্ষায় ছিল কবে শেষ হবে টানেলের টিউব খননের মূল কাজ। ২২শ’ টন ওজনের দৈত্যকার বোরিং মেশিনটি মাটি ফুঁড়ে ১৭ মাসে পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে আনোয়ারায় গিয়ে শেষ করে প্রথম টিউবের কাজ। তারপর মাত্র ১০ মাসে আনোয়ারা থেকে পতেঙ্গায় এসে বৃহস্পতিবার বিকালে শেষ হয় দ্বিতীয় টিউবের খনন। এ হিসাবে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেলের মূল খনন কাজ শেষ।
টিউবে স্ল্যাব বসানো, লাইটিং, কার্পেটিং ও এপ্রোচ সড়কের কাজ শেষ হলে খুলে দেয়া যাবে টানেল। তাতে চট্টগ্রাম শহর থেকে আনোয়ারা-কক্সবাজার হয়ে খুলে যাবে পূর্বমুখী দুয়ার। চীনের সাংহাইয়ের আদলে চট্টগ্রাম হবে ওয়ান সিটি টু টাউন। গতকাল শুক্রবার আনোয়ারা ও পতেঙ্গা প্রান্তে টানেলের কর্মযজ্ঞ দেখতে অনেকে এসেছিলেন। শুক্রবার টানেলের মুখ খুলে দেওয়া হবে এমন খবর চাউর থাকায় মূলত মানুষ এলেও সেরকম কোনো প্রস্তুতি দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত তারা দূর থেকে এপ্রোচ সড়কের কাজ দেখেই ফিরে গেছেন।
প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, দুটি টিউবের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হবে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল। এর খনন কাজ শেষ হলেও স্ল্যাবের কাজ বাকী রয়েছে। জানুয়ারিতে দ্বিতীয় টিউবে স্ল্যাব বসানোর কাজ শুরু হবে। আশা করছি, ২০২২ সালে ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষের আগেই টানেল খুলে দেওয়া সম্ভব হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে প্রকল্পের ৭৩ ভাগ কাজ শেষ। ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর আনোয়ারা প্রান্ত থেকে দ্বিতীয় টিউবের খনন কাজ শুরু হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার তা শেষ হয়। বর্তমানে প্রথম টিউবে স্ল্যাব স্থাপনের কাজ চলছে। বৃহস্পতিবার খনন শেষ হওয়া দ্বিতীয় টিউবটির ভেতর থেকে খনন যন্ত্রটি বের করে আনতে লেগে যাবে দেড় থেকে দুই মাস। এই হিসাবে জানুয়ারি মাসে এই টিউবে স্ল্যাব, কার্পেটিং কাজ শুরু করা যাবে। এ কাজ শেষ হলে ফিনিশিং কাজে হাত দেয়া হবে। পাশাপাশি চলবে প্রয়োজনীয় লাইটিং, অক্সিজেন সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় বিউটিফিকেশন কাজ। খনন কাজ শেষ হলেও যান চলাচল উপযোগী করতে আরো অন্তত বছর খানেক লেগে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ের এই টানেল প্রকল্পে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় বসানো হয়েছে দ্বিমুখী দুটি টিউব। প্রতিটি টিউবে থাকছে দুই লেন করে মোট চার লেন। টিউবগুলোর প্রশস্ততা ৩৫ ফুট, উচ্চতা ১৬ ফুট। টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এর মধ্যে পানির নীচে সুরঙ্গ থাকছে ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার।
বর্তমানে চলছে টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার এপ্রোচ সড়কের কাজ। পাশাপাশি শিকলবাহা ওয়াই জংশন থেকে আনোয়ারা কালাবিবির দীঘি পর্যন্ত টানেল বিকল্প সড়কের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে।
টানেলকে ঘিরে এর মধ্যে বদলে যাচ্ছে নদীর অপর তীরের আনোয়ারা। আনোয়ারা উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী বলেন, শিল্পায়ন, উন্নয়ন, পর্যটন সবক্ষেত্রে টানেল সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। আনোয়ারা হবে নতুন শহর।
২০১৯ সালে চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা প্রান্ত থেকে প্রথম সুড়ঙ্গ খননের কাজ শুরু হয়। এ কাজ শেষ হয় ২০২০ সালের আগস্টে। একই বছরের ১২ ডিসেম্বর আনোয়ারা প্রান্ত থেকে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের খনন কাজ উদ্বোধন করা হয়।
কর্ণফুলী টানেল চালু হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব কমে যাবে ১৫ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামমুখী যানবাহন চট্টগ্রাম শহরে না ঢুকে সরাসরি চলে যেতে পারবে গন্তব্যে। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথম বছরেই এই টানেল হয়ে চলাচল করবে ৬৩ লাখ গাড়ি। এতে চট্টগ্রাম শহরে যানবাহনের চাপ যেমন কমে যাবে, তেমনি যানজটও কমবে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শিল্পায়নের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।