বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনা ও শিক্ষকদের সম্মান

পিংকু দাশ | সোমবার , ৩ অক্টোবর, ২০২২ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

গ্রীক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থে শিক্ষাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণের উপযুক্ত মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং সুশিক্ষার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, জীবন বিকাশের প্রক্রিয়া, মানবিক গুণ বিকাশের প্রধান হাতিয়ার। শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে অন্ধকার, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদের ছোবল থেকে রক্ষা করতে। একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো সুদৃঢ় করে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
দীর্ঘদিন স্বৈরশাসন ও সামপ্রদায়িক বিষবাম্পে জর্জরিত বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে অর্থনৈতিক মুক্তির আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। দেশকে স্বাবলম্বী করার মহতী উদ্দেশ্য নিয়ে ‘অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ’ প্রণয়ন করেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বারের মত দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তিনি। সেই থেকে অদ্যাবধি তাঁরই নেতৃত্বে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদাবান জাতি হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছে, আমরা হয়েছি গৌরবান্বিত ।
শিক্ষা ছাড়া যেমন অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়, তেমনি দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও শিক্ষা দান ঠিকমত হয় না। একজন শিক্ষক সমাজের রোল মডেল এবং শ্রদ্ধার পাত্র। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘শিক্ষকরা যাতে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে উন্নত জীবনমান বজায় রেখে মর্যাদার সাথে চলতে পারেন সেজন্য তাদের যথাযোগ্য বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা বাড়ানো এবং তা জীবনযাত্রা ব্যয়ের উঠানামার সাথে সঙ্গতিশীল হতে হবে। অধিকন্তু শিক্ষকদের পদমর্যাদা যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াতে হবে। কারণ তারাইতো সমাজের আলোকবর্তিকা, উন্নয়নের দিশারী’। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে যে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয় তা খুবই অপ্রতুল। গত জুনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের ৫২তম বাজেট। এবারের বাজেটের আকার ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১২ দশমিক শূন্য এক শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ আগের মতই গতানুগতিক। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে খ্যাত এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকসহ সচেতন মহল। জাতির শিক্ষার মান বাড়াতে হলে দেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মান উন্নয়ন, নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু, দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা জাতীয়করণ, শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো এবং মানসম্মত শিক্ষক ও শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমান সরকারের অন্যান্য অনেক অর্জনের মধ্যে বড় অর্জন, ডিজিটাল বাংলাদেশ। করোনায় বিপর্যস্ত অন্যান্য দেশে যখন শিক্ষাব্যবস্থায় স্থবির অবস্থা বিরাজ করছিল। তখন আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে শিক্ষকদের আন্তরিক সহায়তায় অনলাইনে ক্লাস করতে সক্ষম হয়েছে। এতে করে করোনা মহামারীর ধাক্কা অতিক্রম করে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টায় শিক্ষা খাতকে গতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছেন, বর্তমান মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। শিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী করতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে সবার আগে নজর দিতে হবে। তাই শিক্ষার মানোন্নয়নে আইসিটিভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের রূপকার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেসব খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তারমধ্যে অন্যতম ছিল শিক্ষা। বঙ্গবন্ধু সবসময় বলতেন, পুঁথিগত জ্ঞান বা শুধুমাত্র সার্টিফিকেট অর্জনই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। সেজন্য তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে প্রণীত ড.কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল শিক্ষা খাতে মোট জিডিপির ৫ থেকে ৭ শতাংশ দরকার। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও শিক্ষাক্ষেত্রে জিডিপির ২. ২ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ ইউনেস্কো বলছে শিক্ষিত সুন্দর দেশ গড়ার জন্য বাজেটের ২০ শতাংশ অথবা জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ থাকা উচিৎ। বর্তমান বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ মাত্র জিডিপির ৩ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন শিক্ষার তথা শিক্ষকদের উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
১৯৪৮ সালের ১ ডিসেম্বর এক ছাত্র সভায় শিক্ষা সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘শিক্ষাদীক্ষাই হল মানব সভ্যতার মাপকাঠি, অথচ আমাদের দেশের অগণিত জনসাধারণকে অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখে কোন মুখে আমরা বিশ্ব দরবারে নিজদিগকে সভ্য জাতি বলিয়া গৌরব করিব? আজ দেখতে পাচ্ছেন আমাদের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ধ্বংস হতে বসেছে। শিক্ষকদের বেতন না বাড়ালে শিক্ষা সমস্যার সমাধান অসম্ভব। শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন দরকার’।
উন্নয়নশীল দেশে মানবসম্পদ তৈরির কারিগর, জাতীয় শিক্ষার ৯০ ভাগ দায়িত্ব পালনকারী বেসরকারি শিক্ষক সমাজ আজ বিভিন্নভাবে অবহেলিত। একজন শিক্ষক স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ঘর ভাড়া পায় মাত্র ১০০০টাকা । উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতাসহ সব ক্ষেত্রে চরম অবহেলার শিকার। অবসরের পর কোনো পেনশনের ব্যবস্থা নেই। দ্রব্যমূল্যের এই উর্ধ্বগতির বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে সীমাহীন। এতে করে বেসরকারি শিক্ষকরা সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারছে না। বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বেতন ভাতা বৃদ্ধি, তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। বেসরকারি শিক্ষকদের সম্মানজনক বাড়ি ভাড়া, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা ও মেডিকেল ভাতা প্রদান করলে এই সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হবে বলে আশা করা যায়।
উন্নত বিশ্বে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসেন। সেখানে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করা হয়, সম্মান করা হয়, সর্বোপরি সমাজে সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকার মত আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়। মানুষ গড়ার কারিগর যে শিক্ষক সমাজ তাঁদের অবজ্ঞা করে অবহেলা করে কিভাবে দেশের সুনাগরিক তৈরি হবে। যদিও বলা হয় শিক্ষাকে বাজেটের অগ্রাধিকার সেক্টরে রাখা হয়েছে। কিন্তু বাজেটের খরচের দিকে তাকালে দেখা যায় তা সাংঘর্ষিক। বাজেট যদি বাড়ানো না হয় তাহলে শিক্ষায় উন্নয়ন কিভাবে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণসহ মানসম্পন্ন শিক্ষা ও শিক্ষক নিশ্চিতের জন্য শিক্ষা আইনের যে নীতিমালা ঝুলে আছে তা বাস্তবায়ন না করলে শিক্ষা খাতে যেসব সমস্যা আছে তা সমাধান করা যাবে না। শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করা প্রয়োজন এবং শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে হবে, যাতে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা আগ্রহী হয়। আর তা না হলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে না।
শিক্ষক হচ্ছেন একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। শিক্ষার মান অনেকাংশে শিক্ষকদের গুণগত মান ও প্রচেষ্টার উপর নির্ভরশীল। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের প্রধান কাজ হল জাতি ধর্ম বর্ণের উর্ধ্বে উঠে জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষার্থীদের কাছে একেকজন শিক্ষক হবেন তার আদর্শ। সে আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে জীবন গড়ে তুলবে, চলার পথে সঠিক দিকনির্দেশনা হিসেবে অনুসরণ করবে। পৃথিবীতে যত রকম সম্পর্ক আছে তার মধ্যে অন্যতম শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী সম্পর্ক। একজন আরেকজনের পরিপূরক। রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক হবে বন্ধুত্বপূর্ণ, সহজ এবং সরল। পারস্পরিক ভাবের আদান প্রদানের মাধ্যমে গড়ে উঠবে শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়া। গুরু করবেন বিদ্যা দানের সাধনা, শিষ্য করবেন বিদ্যা গ্রহণের সাধনা, যেখানে সম্পূর্ণভাবে দান সম্ভব সেখানেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ সম্ভব। যেখানে অধ্যাপকগণ জ্ঞানের চর্চায় স্বয়ং প্রবৃত্ত, সেখানে শিক্ষার্থীগণ শিক্ষাকে সহজ সরলভাবে গ্রহণ করতে পারে’।
বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ভাবনার মূলে ছিল জাতি- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা, বৈষম্যহীন, শোষণহীন উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা, কর্মমুখী ও উৎপাদনশীল শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা। শিক্ষা খাত নিয়ে প্রত্যেক সরকারের নানা পরিকল্পনা শোনা যায়। কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। প্রতিটি বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়, কিন্তু তা খুবই অপ্রতুল। বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে উলম্ফন ঘটানো প্রয়োজন, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সেটি হচ্ছে না।
জাতীয় বাজেটের হিসাবে বা জিডিপি উভয় ক্ষেত্রে আমাদের বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অর্ধেক বা অর্ধেকের সামান্য বেশি। পৃথিবীর অনেক দেশ, এমনকি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল সবার শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় ও বরাদ্দ আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। আসলে বাজেটে শিক্ষায় যে বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে তা অপর্যাপ্ত। শিক্ষা খাতে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয় না। ভবিষ্যতে বাজেটে আমরা এই অবস্থার অবসান চাই।
পরিশেষে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিক্ষা প্রসঙ্গে যে কথা বলেছেন তা আজও সমসাময়িক। তিনি বলেছেন, ‘ঘুরিয়া ফিরিয়া যেমন করিয়াই চলি না কেন শেষকালে এই অলঙ্ঘ্য সত্যে আসিয়া ঠেকিতেই হয় যে, শিক্ষকের দ্বারাই শিক্ষাবিধান হয়, প্রণালীর দ্বারা হয় না’।
সূত্র : দশদিগন্তে বঙ্গবন্ধু রাশেদ রউফ, বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা – ড.এফ, এম, এনায়েত হোসেন
লেখক : প্রাবন্ধিক, সহকারী অধ্যাপক (অর্থনীতি),
বোয়ালখালী হাজী মোঃ নুরুল হক ডিগ্রি কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিস্মৃতপ্রায় নেতা অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরী
পরবর্তী নিবন্ধযুবকের কব্জিকাটা মামলার আসামি আটক