বঙ্গবন্ধুর দর্শন-সমবায়ে উন্নয়ন

মোহাম্মদ শাহজাহান | শনিবার , ৫ নভেম্বর, ২০২২ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

আজ জাতীয় সমবায় দিবস। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের প্রথম শনিবার সরকারিভাবে এই দিবসটি পালিত হয়। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও গুরুত্বের সাথে এ দিবসটি একই দিনে সারা দেশে উদযাপন করা হচ্ছে। এবার এ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধু দর্শন-সমবায়ে উন্নয়ন’ রাখা হয়েছে।
একটি জনগোষ্ঠী যখন তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য সংগঠিত হয়ে একই লক্ষ্যে মুক্তির পথ খোঁজে তারই নাম হচ্ছে সমবায়। কবির ভাষায় বলতে গেলে সমবায় এর আর্দশকে নিম্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।
‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’
সমবায় সমিতির ইতিহাস প্রায় মানব সভ্যতার ইতিহাসের ন্যায় প্রাচীন। বর্তমানের সমবায় সমিতির সাংগঠনিক প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয় ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের কিছু আগে। ১৭৬১ সালে সর্বপ্রথম ফেনউইক উইভারস্‌ সোসাইটি গঠন করা হয়। ১৯০৪ সালে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের জেনারেল লর্ড কার্জন সমবায় সমিতি আইন জারীর মাধ্যমে এই উপমহাদেশের সমবায় আন্দোলনের যাত্রা শুরু করেন। সমবায় শুধু একটি উন্নয়ন দর্শনই নয়, এটি আর্থ-সামাজিক আন্দোলনও বটে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি ছিল সাধারণ মানুষের কল্যাণের রাজনীতি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এদেশের মানুষ স্বাবলম্বী হবে এবং বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তাই তিনি বহির্বিশ্বের সাহায্য গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ করতেন এবং বহিঃবিশ্বের সাহায্য এনে এই সকল সমস্যা সাময়িকভাবে দূর করার পথ পরিহার করে স্থায়ী পদ হিসাবে সমবায়কে বেছে নিয়েছিলেন। তাই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করতে সমবায়ের ডাক দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণমুখী সমবায় আন্দোলনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনিই প্রথম দেশের বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ জনগণ, যারা হতদরিদ্র এবং অশিক্ষিত, তাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য সমবায়কে একমাত্র অবলম্বন হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। সদ্য স্বাধীন দেশকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে গিয়ে তার গভীর পর্যবেক্ষণে বেড়িয়ে এলো অমিত সম্ভাবনাময় এদেশের মাটি ও মানুষ। পরিবেশ ও প্রকৃতিই সবচেয়ে বড় সম্পদ। যেহেতু বঙ্গবন্ধু এদেশের মাটি ও মানুষকে গভীরভাবে ভালবাসতেন তাই এই সম্পদকে যথার্থ কাজে লাগাতে এবং দেশ গঠনের নিয়ামক হিসাবে এক পর্যায়ে গ্রহণ করলেন সমবায় ভিত্তিক কর্মযজ্ঞ। দেশকে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নে বিভোর বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষের মূখে হাসি ফোটানোর লক্ষে এবং মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ, সম্পদের সুষম বণ্টন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সুযোগ সুবিধা দান নিশ্চিত করার গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৩ (খ) অনুচ্ছেদে দেশের উৎপাদন ব্যয়, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালী সমূহের মালিকানার ক্ষেত্রে সমবায়ী মালিকানাকে রাষ্ট্রের দ্বিতীয় মালিকানা খাত হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের র‌্যালীতে সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়ার আহবান জানিয়ে বলেছিলেন ‘আগামী পাঁচ বৎসরে সরকার বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে বাধ্যতামূলকভাবে বিভিন্নমুখী সমবায় চালু করবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে সমবায়ের মাধ্যমে দেশের সম্পদকে সুষমভাবে ব্যবহারের জন্য জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ইংগিত দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে বলা যায় ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ গঠন করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠন করা এবং দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আনয়নপূর্বক সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন করা। এই প্রসঙ্গে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে এবং পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটা করে কো-অপারেটিভ হবে। পাক-ভারত উপমহাদেশে সমবায় আন্দোলনের ইতিহাস বেশ পুরানো। তবে তথ্য মতে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০৪ সালে প্রথম কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটি অ্যাক্ট সর্বপ্রথম জারি করা হয়। এরপর থেকে সমগ্র ভারতে সমবায় আন্দোলন বিকাশ লাভ করতে থাকে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরে সমবায় আন্দোলন সবচাইতে বেশি ক্ষতি হয়। ২০৪১ এ উন্নত দেশের সারিতে আমাদের অবস্থান সুনিশ্চিত করার প্রত্যয়ে আমরা আজ টেকসই উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নয়নের পথে যাচ্ছি। কিন্তু এ স্বপ্নের বীজ যার দ্বারা রোপিত হয়েছিল তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশ কিংবা বাঙালির যে কোনো উন্নয়ন দর্শনের অভিযাত্রায় বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ একই সত্তার এপিঠ-ওপিঠ। বঙ্গবন্ধু হচ্ছে এমন একটি সমবায় দর্শন যা বাংলার আপামর জনগণের মুক্তির আলোক শিখা। বঙ্গবন্ধু মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন সমবায় সমিতি একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়, সমবায় সমিতি এমন একটি জনকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক অর্থ সামাজিক প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে থাকে গণতন্ত্র, অর্থনীতি, সম্মিলিত কর্ম প্রচেষ্টা, উৎপাদনের কর্মযজ্ঞ, সদস্যদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির প্রয়াস, সর্বোপরি সদস্যদের আর্থ সমাজিক উন্নয়ন সাধান করা। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী সভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম মন্ত্রী হিসেবে কো-অপারেটিভ অর্থাৎ সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান এবং যোগদান করে সমবায়ের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন দেশের প্রতিটি গ্রামে সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করার। তিনি গণমুখী সমবায় আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছিলেন। সমবায় নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন কত বিশাল ছিল তা ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন কর্তৃক আয়োজিত সমবায় সম্মেলনে তার বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তিনি বলেছিলেন ‘আমার দেশের প্রতিটি মানুষ খাদ্য পাবে, আশ্রয় পাবে, শিক্ষা পাবে, উন্নত জীবনের অধিকারী হবে এই হচ্ছে আমার স্বপ্ন। এই জন্য গণমুখি সমবায় আন্দোলকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা সমবায়ের পথ গণতন্ত্রের পথ, সমাজতন্ত্রের পথ। সমবায়ের মাধ্যমে গরিব কৃষকেরা যৌথভাবে উৎপাদন খাতের মালিকানা লাভ করবে। সমবায়ের মাধ্যমে গ্রাম বাংলায় গড়ে উঠবে ক্ষুদ্র শিল্প। যার মালিক হবে সাধারণ কৃষক, শ্রমিক এবং ভূমিহীন নির্যাতিত দুঃখী মানুষ।
বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত ‘বাধ্যতামূলক বহুমুখী গ্রাম সমবায় কর্মসূচি ছিল একটি যুগান্তরকারী বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এটি ছিল একটি সমবায় উপযোগী জনমুখী ও উন্নয়নমুখী চিন্তার আলোকে জনবান্ধব কর্মযজ্ঞ। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থা তথা সামগ্রিক আর্থ সামাজিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক পরিবর্তন আসতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় বঙ্গবন্ধুই প্রথম দেশের সীমিত সম্পদ সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে ছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, যে মহান ব্যক্তি আজীবন হতভাগ্য বাঙালি জাতির স্বাধীকার ও ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্নে বিভোর থেকে আজীবন কঠিন সংগ্রাম করে গেছেন অশুভশক্তির বিরুদ্ধে সেই মহান পুরুষকে তার আজীবনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রস্তুতিতেই কিছু সংখ্যক কুচক্রি ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে রাতের আঁধারে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করে। কিন্তু বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান ও বাঙালি জাতির স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ বর্তমানে সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় চলমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের যোগ্য উত্তরসূরি, বিশ্বশান্তির বাতিঘর, বাংলার শান্তিকামী মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল, বর্তমান বিশ্ব মানবিক মূল্যবোধের লালন ও পালনকারী আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব জাতির পিতার রক্তের উত্তরাধিকারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নত ও আধুনিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। -আশা করা যায় বাংলাদেশের সম্পদ সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ অচিরেই সোনার বাংলায় পরিণত হবে। আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর জীবন দর্শন পর্যালোচনা করি তবে দেখা যাবে যে, বঙ্গবন্ধুর দর্শন ছিল সমবায়ের মাধ্যমে দেশের সীমিত সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করে দেশের হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা। বঙ্গবন্ধুর দর্শন ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন সহ সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, যেখানে তিনি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সমবায়কে। আজকের বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সমবায় ভাবনা ও উন্নয়ন দর্শন একান্তই প্রাসঙ্গিক। তাই বলতে হয় আমাদের যা কিছু অর্জন, যতসব উন্নয়ন তার ভিত্তিমূলে রয়েছে জাতির জনকের আজীবন স্বপ্নলালিত উন্নয়ন ভাবনা জনকল্যাণমুখী উন্নয়নের স্বপ্ন। দেশকে স্বনির্ভর করতে হলে সমবায়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর এ দর্শন বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সমবায় ভাবনাকে পাথেয় করে আমাদের মানসিকতার ইতিবাচক চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে আসুন আমরা সকলে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে গড়ে তুলি আমাদের কাঙ্খিত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা। ৫১তম জাতীয় সমবায় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বঙ্গবন্ধুর দর্শন-সমবায়ে উন্নয়ন’ সাফল্যমণ্ডিত করতে আসুন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও সমবায় ভাবনাকে পাথেয় করে বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনকে অর্থবহ করে তুলি।

লেখক : সাবেক সম্পাদক, দি চিটাগাং কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লি.

পূর্ববর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে
পরবর্তী নিবন্ধসাজেদা আজিজ