বই হলো জ্ঞানের ভাণ্ডার। বই–ই একমাত্র পথ যার মাধ্যমে অন্ধকারকে আলোর পথ দেখায়। এই বই দিয়ে মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছে। বিদ্যা অমূল্য ধন। সেই বিদ্যা অর্জন করা হয় বইয়ের মাধ্যমে। জ্ঞান পিপাসুদের একমাত্র নেশা হলো বই পড়া। শিশু বয়সে যে দিন অক্ষর জ্ঞান শিখতে পড়তে বসি সেইটাই ‘বই’। সেই যে শুরু হলো তাকে ছাড়া জীবন চলে না। চীন দেশে কাগজ আবিষ্কার হওয়ার পর থেকে বই পুস্তকের প্রচলন বেড়ে যায়। কেহ কেহ বলে চীন দেশে ছাপাখানা আবিষ্কারের আগে বইয়ের প্রচলন হয়। লক্ষ কোটি বছরের বিশ্ব ইতিহাস। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে জানতে পারা, বিভিন্ন সভ্যতার উত্থান পতন। ধ্বংস এবং আবির্ভাব সব জ্ঞান ছড়িয়ে পড়েছে বইয়ের মাধ্যমে। পাঠ্যবই থেকে শুরু করে, বড় বড় ধর্মগ্রন্থ, পৌরানিক কাহিনী, আবিষ্কার, মানব সভ্যতা, ভ্রমণ কাহিনি সব বইতে লিপিবদ্ধ থাকে। স্বভাবজাত কারণে মানুষ এইগুলো সংগ্রহ করে রাখে সরকারিভাবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, ব্যক্তিগতভাবে পাঠাগারের মাধ্যমে বইগুলো সংরক্ষিত করা হয়। শত শত বৎসর পরেও প্রজন্মের পর প্রজন্ম এইগুলো পড়ে। জ্ঞান অর্জনে ও বিস্তার বইয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি জ্ঞান লাভের জন্য অন্যান্য বই পড়া অভ্যাস করা স্কুল জীবন থেকে শুরু হলে ভালো। পিতামাতা, শিক্ষক এবং ভাইবোন ও বন্ধুদের একে অপরকে বই পড়তে উৎসাহিত করা উচিত। আমাদের কৈশোর, যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্ত্বেও আমরা বই পড়া অভ্যাস ছাড়িনি। আজ ইন্টারনেটের যুগেও স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের বদৌলতে বই পড়ুয়া লোকদের সংখ্যা কমে গেলেও মানসিক চাপ কমানোর সবচেয়ে সহজ পথ বই। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে বই পড়া মানসিক চাপ কমাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে মাত্র ৬ মিনিট বই পড়লে ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্রেস কমে যায়। একটি গান শোনা, হাঁটাহাঁটি করা বা গেইম খেলার চেয়েও কার্যকর। মনে রাখবেন বই পড়া আমাদের মনকে প্রশান্ত করে। চিন্তাকে হালকা করে, এক ধরনের মানসিক মুক্তি দেয়। মানসিক চাপ, স্ট্রেস আজকের দিনে প্রতিটা মানুষের জীবনে নিত্যসঙ্গী। আর্থিক অবস্থা, বেকারত্ব, চাকরির প্রতিযোগিতা, পারিবারিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন–এইগুলো অনেকের জীবনে নিত্যসঙ্গী। উপদেশমূলক বই পড়া ও তার সাথে একটু যোগাভ্যাস আপনাকে ধৈর্য ধারণে সহায়তা করবে। মাথার উপর এইভাব হালকা করতে অনেকে বেছে নেন প্রযুক্তি নির্ভর বিনোদন আবার কেউ পড়েন বই। বিভিন্ন রঙের বিভিন্ন আকারের বই ছাপানো হয়। সুস্থ মননশীলতা গঠনে বইয়ের ভূমিকা অফুরন্ত। যারা বই পড়ে তাদের চিন্তা চেতনা প্রগতি ও সৃষ্টিশীলতা অন্যদের চেয়ে বেশি। আমাদের ছাত্রজীবনে দেখতাম উপন্যাস পড়ার একটা অদ্ভুত নেশা ছিল। প্রতিযোগিতা হতো কে কয়টা উপন্যাস শেষ করছে। এমন অবস্থা হতো মা ভাত খেতে ডাকছে–আসি–আসি করে ভাত ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এখন সেই দৃশ্য নেই। কারণ আধুনিক তথ্য প্রযুক্তি স্মার্টফোন সব বয়সী লোকদের বই বিমুখ করে দিয়েছে। আমি বলবো যুগের ও জীবনের গতিধারার পরিবর্তন হওয়ায় বইতে বেশিক্ষণ সময় দিতে চায় না। বই পড়ার অভ্যাসটা নিজের থেকে আসতে হবে। জ্ঞান আহরণের পিপাসা থাকতে হবে। সেই পুরোনো কথা বিদ্যা অমূল্য ধন–সেটা অর্জন করতে হয় বইয়ের মাধ্যমে। মাদকাসক্তি, উত্ত্যক্তকরণ, কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে মুক্তি পেতে বই পড়ার আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত। বই চিরকাল জ্ঞানের ভাণ্ডার ছড়িয়ে দিচ্ছে। ভারতের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালামের ছোটবেলাকার কথা–তিনি বলতেন একটি বই একজন বন্ধুর সমান। আবার একজন ভালো বন্ধু পুরো একটা লাইব্রেরির সমান। তিনি বইয়ের মূল্যবোধ সম্বন্ধে আরো বলেছেন–যে দেশে জুতা বিক্রি হয় এয়ার কন্ডিশন রুমে আর বই বিক্রি হয় ফুটপাতে সে দেশে দুর্নীতিবাজরা থাকবে পাঁচতলায় আর জ্ঞানী লোকেরা থাকবে গাছতলায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন–আজি হতে শত বর্ষ পরে কে তুমি পড়েছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহল ভরে। বড় বড় বিদ্বান, ঔপন্যাসিক, গ্রন্থাকার, তাদের লেখা, বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য আবিষ্কার, কবি, সাহিত্যিকের রচনাবলি বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে বইয়ের মাধ্যমে। সভ্যতার বিকাশ, জলবায়ু পরিবর্তন, ধর্মীয় অনুশাসন, পর্যটন–এসব জানতে মানুষ আজও খুঁজে বেড়ায় বইয়ের মাঝে। আমাদের ছাত্রাবস্থায়, কৈশোরে, যৌবনে দেখেছি বিয়েতে উপহার দেওয়া হতো বই। বিশেষ করে বন্ধুবান্ধবদের বিয়েতে। খ্যাতিমান, জনপ্রিয় কবি ও লেখকদের বইগুলো বিশেষ করে কেনা হতো। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং তাঁকে ‘নোবেল’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ইহার ইংরেজি অনুবাদ আছে। ঔপন্যাসিক বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল ছদ্মনাম) তাঁর পাঠকের মৃত্যু প্রবন্ধে লিখেছেন–১২ বৎসর আগে যে পাঠক নিবিড় মনে বই পড়ছিলেন এবং বই শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনোনিবেশ থাকতেন সেই পাঠক ১২ বৎসর পর বই পড়া মনোনিবেশ হারিয়ে ফেলেছেন। সেই ধ্যানমগ্নতা আর নেই। এখানে তিনি একজন পাঠকের কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা লক্ষ কোটি পাঠকের কথা বলবো। বই যতদিন ছাপাখানায় ছাপা হবে, বা কম্পিউটারে প্রিন্ট হবে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠক সমাজ বই পড়বে। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ডিকশনারী, অ্যানসাইক্লোপেডিয়া প্রভৃতি বইগুলো যুগের পর যুগ পৃথিবীতে থাকবে। যতই পরিবর্তন আসুক বইয়ের কোন বিকল্প হতে পারে না।
বই এমনি একটি উপাদান কথিত আছে ব্রাজিলের কারাগারে বই পড়লে বন্দিদের শাস্তি কমিয়ে দেওয়া হয়, এক বন্দি মাসে একটা বই পড়লে তার সাজার মেয়াদ মাসে চারদিন কমে। বৎসরে কমে যায় ৪৮ দিন। ইতিহাসের পাতা থেকে একটা সত্য ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করবো। বই একটা ছাত্রকে নিশ্চিত ফাঁসি থেকে কীভাবে বাঁচাল সেই ঘটনা। ১৬৫৬ সাল তখন পালতোলা জাহাজের যুগ। ইংল্যান্ড ও স্পেনের মধ্যে প্রায় যুদ্ধ হতো। ইংল্যান্ড থেকে একটি বাণিজ্যিক জাহাজ পর্তুগাল যাচ্ছিল। সেই জাহাজে করে ১৫ বছরের একটা ছাত্র ইংল্যান্ড থেকে পর্তুগাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে যাচ্ছিল। মাঝপথে স্পেনীয় যুদ্ধ জাহাজ সেটাকে আক্রমণ করে। স্পেনীয় সৈন্যরা জাহাজটির অনেক নাবিকদের কেটে সমুদ্রে ফেলে দিল। যে কয়েকজন বন্দি হলো তার মধ্যে ঐ ছাত্রটা ছিল। ছাত্রটি স্পেনীয় ক্যাপ্টেনকে বললো, ‘স্যার আমি নাবিক নই, আমাকে ছেড়ে দিন’। ক্যাপ্টেন বললো, যেহেতু তুমি এদের সাথে এসেছো, তুমি নিশ্চয়ই স্পেনীদের হত্যা করেছ। তোমাকে ফাঁসিতে লটকানো হবে। সে বললো, ‘আমি একজন ছাত্র। পর্তুগালে পড়তে যাচ্ছি।’ ক্যাপ্টেন বিশ্বাস করলো না। ক্যাপ্টেন প্রমাণ চাইলো, ছাত্ররা করজোড়ে বললো, ‘আমার কাছে বই আছে’। ছাত্রটা ক্যাপ্টেনের হাতে বইটা দিল। তিনি বললেন, এটা কি তোমার পাঠ্যপুস্তক? তাহলে বই থেকে কবিতা মুখস্থ বল, ছাত্রটা একটার পর একটা কবিতা মুখস্থ বলতে লাগলো। ক্যাপ্টেন পাতার পর পাতা উল্টাতে লাগলো, ক্যাপ্টেন খুব খুশি হয়ে নিজের হাতে ফাঁসির দড়িটা খুলে দিল, মহা কবি ভার্জিলের কবিতার বইটা সেদিন ছাত্র কর্ডিরোর প্রাণ বাঁচিয়েছিল। বই হোক নিত্যসঙ্গী।
লেখক: প্রাক্তন চিফ অ্যানাসথেসিওলজিস্ট, বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।












