আমরা এখন তথ্যের যুগে বাস করছি। মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য তথ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু তথ্যের এই প্রাচুর্যের সঙ্গে সঙ্গে বোঝার গভীরতা কমে যাচ্ছে। আমরা অনেক কিছু দেখি কিন্তু খুব কম ভাবি। জানি অনেক কিছু কিন্তু বুঝি অল্প। এর ফলে মানুষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় কিন্তু ধীর এবং গভীর চিন্তার ক্ষমতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
এই অবস্থায় মানুষের চিন্তার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মতামত তৈরি হচ্ছে খুব দ্রুত কিন্তু তা স্থায়ী হচ্ছে না। আবেগ প্রবল হচ্ছে কিন্তু বিশ্লেষণ দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি কার্যকর এবং নির্ভরযোগ্য পথ আছে। সেটি হলো নিয়মিত পড়ার অভ্যাস।
বই পড়া কোনো বিলাসিতা নয়। এটি কেবল অবসর বিনোদনের বিষয়ও নয়। বই পড়া মানুষের চিন্তার জন্য একটি মৌলিক প্রয়োজন। যেমন শরীর সুস্থ থাকতে খাদ্য চায়, তেমনি মন সুস্থ থাকতে চায় গভীর চিন্তা। আর গভীর চিন্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় এখনো বই। যে মানুষ পড়ে না সে অজান্তেই অন্যের চিন্তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তার মতামত অনেক সময় ধার করা হয়। তার সিদ্ধান্ত সহজেই প্রভাবিত হয়। তার দৃষ্টিভঙ্গি সীমিত হয়ে আসে। অন্যদিকে যে মানুষ পড়ে সে নিজের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি করতে শেখে। যুক্তি খুঁজে পায়। নিজের মতো করে ভাবার সাহস অর্জন করে। তাই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা মানে শুধু জ্ঞান বাড়ানো নয়। এটি নিজের চিন্তার স্বাধীনতা অর্জন করা।
অনেকে বই পড়তে চায় না কারণ তারা জানে না কেন পড়বে। উদ্দেশ্যের অভাব পড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। যে মানুষ জানে না সে কেন পড়ছে সে বেশিদিন পড়তে পারে না। কিছুদিন ভালো লাগলেও একসময় ক্লান্তি আসে। কিন্তু যখন কেউ বুঝতে পারে একটি বই তাকে ভাবতে শেখাবে, জীবনের জট খুলতে সাহায্য করবে অথবা নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলোর ভাষা দেবে, তখন বই আর বোঝা থাকে না। তখন বই ধীরে ধীরে সঙ্গী হয়ে ওঠে। উদ্দেশ্যের পাশাপাশি পরিবেশের প্রভাবও খুব গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যা দেখে তাই করতে শেখে। যে ঘরে বই নেই সেখানে পড়ার অভ্যাস সহজে জন্মায় না। বই যদি আলমারির গভীরে পড়ে থাকে, মনও ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। কিন্তু বই যদি টেবিলে থাকে, বিছানার পাশে থাকে, চোখের সামনে থাকে, তাহলে বই নিজেই মনকে ডাক দেয়। এই ডাক উপেক্ষা করা সহজ নয়। পরিবেশ মানুষের আচরণ গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। পড়ার পরিবেশ তৈরি করা মানে নিজের ভবিষ্যৎ অভ্যাসের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী অভ্যাস গড়ে ওঠে।
অনেকে বলে সময় নেই। বাস্তবে সময়ের অভাব খুব কম ক্ষেত্রেই আসল সমস্যা। সমস্যাটি হলো অগ্রাধিকারের অভাব। প্রতিদিন যদি পড়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় ঠিক করা যায়, তাহলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে সেই সময়কে গ্রহণ করে নেয়। প্রতিদিন একই সময়ে পড়া মানে নিজের ভেতরে একটি ছন্দ তৈরি করা। এই ছন্দ একবার তৈরি হলে তা ভাঙতে মন চায় না। আরেকটি বড় ভুল হলো শুরুতেই বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা। অল্প সময়ে বেশি পড়ার চাপ পড়াকে আনন্দ থেকে দায়িত্বে পরিণত করে। অথচ অভ্যাস কখনো চাপ দিয়ে তৈরি হয় না। অভ্যাস গড়ে ওঠে ছোট ছোট পদক্ষেপে। প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা পড়া ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এই ছোট কাজের ধারাবাহিকতাই একসময় বড় পরিবর্তন আনে।
পড়ার ক্ষেত্রে আনন্দ একটি অপরিহার্য বিষয়। যা ভালো লাগে না তা দীর্ঘদিন করা যায় না। তাই সমাজ কী পড়তে বলছে বা অন্যরা কী পড়ছে সেটি মুখ্য নয়। নিজের মন কী পড়তে চায় সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ গল্পে ডুবে থাকতে চায়, কেউ বাস্তব জীবনের সমাধান খোঁজে, কেউ ইতিহাসে নিজের শেকড় খুঁজে পায়। সব রুচিরই মূল্য আছে। পড়া তখনই অভ্যাসে পরিণত হয় যখন পড়া আনন্দ দেয়।
বই সঙ্গে রাখা একটি সহজ কিন্তু কার্যকর অভ্যাস। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনেক ফাঁকা মুহূর্ত থাকে। যাতায়াতের সময়, অপেক্ষার সময় কিংবা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়। এই সময়গুলো সাধারণত স্ক্রিনে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু সঙ্গে একটি বই থাকলে এই মুহূর্তগুলো অর্থবহ হয়ে ওঠে। তখন মানুষ অনুভব করে সে আবার সময়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে।
মনোযোগ ছাড়া পড়া সম্ভব নয়। মোবাইলের নোটিফিকেশন এবং নানা বিভ্রান্তি মনোযোগ ভেঙে দেয়। পড়ার সময় এগুলো দূরে রাখতে পারলে পড়া গভীর হয়। গভীর পড়া মানে গভীর চিন্তা। আর গভীর চিন্তাই মানুষকে ভিড় থেকে আলাদা করে।
সঙ্গের প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যার সঙ্গে থাকে তার প্রভাব ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে ধারণ করে। যদি চারপাশে বইপ্রেমী মানুষ থাকে, বই নিয়ে আলোচনা হয়, চিন্তার আদানপ্রদান ঘটে, তাহলে পড়া নিজে থেকেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অনেক সময় একটি ভালো আলোচনা নতুন করে পড়ার আগ্রহ তৈরি করে।
পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা মানে শুধু বই শেষ করা নয়। এটি নিজের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি করা। এই সম্পর্ক মানুষকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে, যুক্তিবাদী করে তোলে, মানবিক করে তোলে।
একটি সমাজ সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায় তখনই, যখন তার মানুষ বইয়ের সঙ্গে একটি জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তোলে। বই মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, চিন্তার জগত কে প্রসারিত করে। মানুষ তখনই এগিয়ে যায় যখন সে ধীরে ধীরে ভাবতে শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে, নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকে শুনতে শেখে। এই ভাবার অভ্যাস মানুষকে আরও সংবেদনশীল করে, মানবিক করে ও দায়িত্বশীল করে তোলে। আর এই চিন্তার পথে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ সঙ্গী এখনো বই। এই পথে হাঁটার জন্য বড় কোনো প্রস্তুতির দরকার নেই। দরকার শুধু নিজের জন্য একটু সময়, একটু যত্ন এবং আন্তরিক সিদ্ধান্ত। যার শুরু আজ থেকেই হতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।











