ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসন আমলে বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরাতে সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, পাচারের অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সেসব দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ ও পারস্পরিক আইনি সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। গতকাল বুধবার সংসদের নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ নেতা সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের প্রশ্নে সরাসরি জবাব দেন।
কুমিল্লা–৯ আসনের সরকার দলীয় সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য মতে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রা তা প্রায় ১ দশমিক ৮ লাখ কোটি টাকা। পাচার করা অর্থের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, এ লক্ষ্যে পারস্পরিক আইনগত চুক্তি সম্পাদন এবং বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। খবর বিডিনিউজের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ১০টি দেশের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে সরকার কাজ করছে। এসব দেশ হল–যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আবর আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও আরব আমিরাতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মতি পাওয়া গেছে। অপর সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে, বলেন সংসদ নেতা।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের নেতৃত্বে আন্তঃসংস্থা টাস্ক ফোর্স গঠনের তথ্য তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, টাস্ক ফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত মামলাগুলো অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। পুলিশের সিআইডি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দ ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে এসব দল।
বেলা ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে শুরু হয়। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী প্রথম ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব নির্ধারিত ছিল। এ পর্বে তারেক রহমান সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রথম প্রশ্নটি উত্থাপন করেন সিলেট–২ আসনের এমপি তাহসিনা রুশদীর। তার প্রশ্নটি ছিল, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত বিভিন্ন কার্যক্রমের কি কি অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। প্রশ্নের জবাব দিতে উঠলে সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ বিরোধী সদস্যরাও সরকারি দলের সদস্যদের সঙ্গে তাল মেলান। জাতীয় সংসদে তারেক রহমান এই প্রথম প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিলেন। তাহসিনা রুশদীর ছাড়াও সরকার ও বিরোধীদলীয় কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন উত্থাপন করেন।
জামায়াতে ইসলামীর মুজিবুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সরকার। আমরা অতীতে দেখেছি, সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের বিভিন্ন রকমের ইচ্ছা–আগ্রহের কারণে দেশের আইন–কানুন–নীতি–নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে যাকে যে কোনোখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে, যার কাছে থেকে যেরকম মনে হয়েছে জোর করে লিখিয়ে নিয়ে গেছে। বর্তমান সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, বর্তমান সরকার দেশের প্রচলতি আইন মেনে কাজ করতে চায় এবং আইনের ভিত্তিতে বিচার করতে চায়, যাতে করে কোনো মানুষ ন্যায্য আইন থেকে বঞ্চিত না হতে পারে। সেকারণেই আইনগতভাবে আমরা সকল প্রক্রিয়া গ্রহণ করব। আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে তাদের শাস্তি যারা এদেশের জনগনের অর্থ তসরুফ করেছে বা এদেশের জনগণের অর্থ পাচার করেছে।
জামায়াতের এই সদস্য অর্থপাচারকারীদের কোনো তালিকা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় করছে কিনা জানতে চাইলে তারেক রহমান বলেন, এই অন্যায়ের (বিদেশে অর্থ পাচারের) সাথে যারা জড়িত, তাদের তালিকা করার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নয়। এই তালিকা করার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের, তারা এটি করছে।
তাহসিনা রুশদীর প্রথম প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি যথাক্রমে ফ্যামিল কার্ড, ইমাম–মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মগুরুদের সম্মানি ভাতা, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ, খাল খনন প্রভৃতি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু কথা তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে আগামী পহেলা বৈশাখে কৃষক কার্ড দেওয়া শুরুর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আটটি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় এই পাইলটিং প্রকল্প শুরু হবে। প্রথমদিন প্রায় ২২ হাজার কৃষককে এই প্রকল্পের আওতায় কার্ড পাবেন। সকল কৃষককে পর্যায়ক্রমে কার্ড দেওয়া হবে।
একই সঙ্গে ই–হেলথ কার্ড, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, চলতি অর্থবছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মধ্যে বিনামূল্যে স্কুল পোশাক বিতরণ, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯ হাজার শিক্ষককে ট্যাব প্রদান, ৩৮৩২টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম স্থাপন, ৪১৮টি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ওয়াই–ফাই চালু, ক্রীড়াবিদদের ক্রীড়া ভাতা চালু, ল্যাংগুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় জামানতবিহীন ১০ লাখ টাকা ঋণ প্রদান, সারাদেশে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন প্রভৃতি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, আপনি যে প্রশ্নটি করেছেন যে কতজন মানুষের কাছে আমরা কৃষক কার্ড পৌঁছে দেব এবং এতে মূল্যস্ফীতি হবে কিনা, বাজেট কত? স্বাভাবিকভাবে বাজেট কত এটি আমরা আপনাদেরকে এখনই বলছি না। অর্থাৎ আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে জিনিসগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাব। তিনি বলেন, কৃষক কার্ড যারা পাবেন, তারা আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। যেসব নারী ফ্যামিলি কার্ডে পাবেন তারা প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। আমরা যেহেতু প্রতি মাসে এটিকে সম্প্রসারণ করতে থাকব। অর্থাৎ অধিক সংখ্যক নারী ফ্যামিলি কার্ড পাবেন, অধিক সংখ্যক কৃষক কার্ড পাবেন। সেজন্য প্রতিবছরই আমরা বাজেটে বরাদ্দ বাড়াবো। প্রতিবছরই বাজেটে আমরা টাকা বরাদ্দ করব। এভাবেই পর্যায়ক্রমিকভাবে ধীরে ধীরে আমরা এগোবো।
তিনি বলেন, আপনি যেটা বলেছেন মূল্যস্ফীতি হবে কিনা? আমরা টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না। আমরা যেহেতু টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছি না, কাজেই মূল্যস্ফীতি হবে না। বরং আমরা মনে করি, এই টাকাগুলো যখন মার্কেটে যাবে, যারা কৃষক কার্ড পাচ্ছেন সেই সকল কৃষক, যারা প্রান্তিক পর্যায়ে নারীরা, যারা পাচ্ছেন টাকা নিশ্চয়ই তারা সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন দেশে টাকা পাচার করবেন না। সেই টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে তারা খরচ করবেন। তার মতে, সুবিধাভোগী নারী স্বাভাবিকভাবে সেই টাকা তার সন্তানের লেখাপড়ার পিছনে খরচ করবেন অথবা সেটি দিয়ে তার সন্তান বা পরিবারকে একটু ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবেন অথবা তিনি স্থানীয় কোনো ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন। ফলে যে টাকাটা সরকারের কাছ থেকে তার কাছে যাচ্ছে, সেটা স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি আস্তে আস্তে বড় হবে তুলে ধরে তিনি বলেন, কাজেই মূল্যস্ফীতি হবে বলে আমরা মনে করি না। আমাদের কোনো গবেষণায় মূল্যস্ফীতি হবে বলে না। বরং অর্থনীতি আরো সচল হবে, অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে এবং স্থানীয় যে সকল শিল্প আছে সেগুলোকে শক্তিশালী করার এটি আরেক একটি উপায়। তার ফলে যেটি হবে সামগ্রিকভাবে বঞ্চিত যে সকল মানুষ আছে… আমি বলছি না যে আগামী ছয় মাসের মধ্যে এটি হবে। তবে ইনশাল্লাহ তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আপনি যে পরিবর্তনটি দেখবেন, যারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষ তাদের জীবনযাত্রার মান ইনশাআল্লাহ অনেক উন্নত হবে।
সরকারি দলের সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে কেনো ফ্যামিলি কার্ড দেয়া হচ্ছে এবং নারীদের ক্ষমতায়ন ও স্বাবলম্বী করা হচ্ছে তার কারণ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল দর্শনই হচ্ছে–ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারের উন্নয়নই মূল একক।
মোশাররফ হোসেনের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিশ্বাস করে যে বাংলাদেশের জনগণই হচ্ছে তাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার শক্তি উৎস এবং এরই মধ্যে আমি আপনাদের সামনে উপস্থাপন করেছি যে আমরা বাংলাদেশের মানুষের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়ন প্রাথমিক কাজ বর্তমান সরকার শুরু করেছে।
জনগণের ক্ষমতার উৎস, এই বিশ্বাসের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার জনগণকে দেওয়া সকল ওয়াদা পূরণে বদ্ধপরিকর। সারাদেশে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমিকভাবে সকল কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারি দলের সদস্য মোশাররফের প্রশ্নের রেশ ধরে তারেক রহমান বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন রকম কমিটমেন্ট করেছিল নির্বাচনের আগে। আপনি দুই একটি কথা উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ বিভিন্ন রকম টিকেটও বিলি করেছিল। তবে বিগত নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতি জনগণ যে সমর্থন দিয়েছে, যে ম্যান্ডেট দিয়েছে তাতে পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশের মানুষ এই ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ যে সকল পরিকল্পনা আপনাদের এই মহান জাতীয় সংসদে আপনার মাধ্যমে আমি উপস্থাপন করেছি, সেই সকল পরিকল্পনার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন আছে। এ সময়ে সরকারি দলের সদস্যরা মুহুর্মুহু টেবিল চাপড়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন দেন।
কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো শ্রমিক কার্ড চালুর কোনো পরিকল্পনা সরকারের আছে কি না, নেত্রকোণা–৫ আসনের সংসদ সদস্য মাহফুজ মোস্তফা এই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের এইরকম কোনো শ্রমিকদের জন্য কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। তবে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের যে সকল অর্থ আছে শ্রমিকদের জন্য শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য, অবশ্যই সেই অর্থগুলি সত্যিকারভাবে শ্রমিকদের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে কিনা, আমরা সেটি অবশ্যই খোঁজখবর করব।
তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব যে সত্যিকারভাবে অন্য কোনো কিছুর পিছনে যাতে সেই অর্থ ব্যয় না হয়। সেই অর্থ যাতে সঠিকভাবে সত্যিকারভাবে শ্রমিকদের কল্যাণের জন্যই ব্যয় করা হয়… আমাদের সরকারের এটি থাকবে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এছাড়া ঢাকা–১৯ আসনের দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, কুড়িগ্রাম–২ আসনের আতিকুর রহমান মোজাহিদ ও নরিসংদী–৫ আসনের মো. আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।











