আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের লাইন ছিল প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ। মোহাম্মদপুর টাউন হল ঘুরে ইকবাল রোড পার্ক মাঠে পর্যন্ত ছিল লাইনের লেজ। অন্যদিকে প্রাইভেট কারের লাইন বিহারী ক্যাম্পের পাশ ঘেঁষে শিয়া মসজিদ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সরেজমিনে গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এমন চিত্র দেখা গেছে। যেসব পাম্প নিরবচ্ছিন্নভাবে তেল দিচ্ছে, সেগুলোতে প্রতিদিনই এমন দীর্ঘ লাইন থাকছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ফুয়েল পাস’ নিবন্ধনে ভোগান্তি। চালকদের অভিযোগ, সার্ভারে পাস মিলছে না। খবর বিডিনিউজের।
এই পাম্পে চালকদের ছিল দুটি লাইন। একটি ফুয়েল পাসধারীদের চালকদের জন্য। লাইন ছোট হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে তেল পেয়ে যাচ্ছেন চালকরা। দ্রুত তেল পাওয়ার চিত্র দেখে অন্য চালকরাও অ্যাপে নিবন্ধনে সক্রিয় হয়ে উঠেন। ওয়েবসাইট কিংবা কিউআর কোডের মাধ্যেমে পাস সংগ্রহে চেষ্টা করেও সফল হচ্ছিলেন না চালকরা। চালকদের অভিযোগ, অ্যাপটির সার্ভারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না।
সোহেল নামের একজন চালক বলেন, কাল রাতে অ্যাপটি ডাউনলোড করেছি। গাড়ির চেসিস নম্বরসহ যা চেয়েছে দিয়েছি। কিন্তু সার্ভার ডাউন। মোটরসাইকেল চালক মো. সাহেদুল হকও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আজকে সকাল থেকে চেষ্টা করেছি। সার্ভার ডাউন। তবে এই কার্ড সম্পর্কে আজকেই জেনেছি। কার্ডটা কার্যকর হলে সবাই করবে।
সর্বশেষ সন্ধ্যায় সাড়ে ৭টায় ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করে দেখা গেছে, ‘সাইটটি সাময়িক বন্ধ আছে’ বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে। জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ চালু করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন ও আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে বৃহস্পতিবার থেকে এই সেবা চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উদ্যোগে তৈরি এই ব্যবস্থায় ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করে নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি নিতে হবে। তবে অনেক চালক নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগতও নন।
সোনার বাংলা পাম্পের ভিতরেই ‘ফুয়েল পাস’ সম্পর্কে হ্যান্ড মাইকে ব্রিফিং করছিলেন আল্টেরিয়র ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ। তিনি বলেন, আগামীকাল সকাল ৬টা থেকে এই পাম্পে পাস ছাড়া তেল সরবরাহ করা হবে না। সেজন্য চালকদের সচেতন করা হচ্ছে।
ফুয়েল পাস নিবন্ধন যেভাবে : ডিজিটাল ‘ফুয়েল পাস’ পেতে হলে ব্যবহারকারীকে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। এজন্য জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের নির্ধারিত ওয়েবসাইট ভঁবষঢ়ধংং.মড়া.নফ বা অ্যাপ ভঁবষঢ়ধংং–এ প্রবেশ করতে হবে। প্রথমে নিজের যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে তথ্য যাচাই করতে হবে। এর সঙ্গে প্রয়োজন হবে চ্যাসিস নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর এবং যানবাহনের উৎপাদনের বছর।
সব তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করে ‘যানবাহন যাচাই করুন’ অপশনে ক্লিক করতে হবে। তথ্য মিললে পরবর্তী ধাপে মোবাইল নম্বর দিতে হবে। এরপর ওটিপি (এককালীন পাসওয়ার্ড) যাচাই করে একটি পাসওয়ার্ড সেট করে নিবন্ধন সম্পন্ন করা যাবে। এরপর তৈরি হবে কিউআর কোড। স্মার্টফোন না থাকলেও নাগরিকরা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পারবেন এবং কিউআর কোড ডাউনলোড করে প্রিন্ট আকারে ব্যবহার করতে পারবেন।
বিপিসি এমন এক সময়ে এই ডিজিটাল সেবা চালু করল, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন সারা দেশের বিভিন্ন পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে জ্বালানি সংগ্রহে গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পেয়ে ও দীর্ঘ সময় লাইন ধরে থাকা নিয়ে কোন কোন পাম্পে ঘটেছে মারামারি, বিশৃঙ্খলা। নড়াইলে গত ২৮ মার্চ তেল না পেয়ে বাগবিতণ্ডার জেরে পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও পাম্পে অকটেন–পেট্রোল না থাকার নোটিশ এবং কৃত্রিম সংকটের অভিযোগও সামনে এসেছে।
নতুন সেবা চালু করার বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ বলছে, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জ্বালানি বিক্রির কারণে কোথাও কোথাও দীর্ঘ লাইন, যানজট, একই ব্যক্তি বা যানবাহনের একাধিকবার জ্বালানি নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ‘ফুয়েল পাস’ চালু হলে পুরো বিতরণ প্রক্রিয়া ডিজিটাল রেকর্ডে আসবে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে তাৎক্ষণিক নজরদারি করা যাবে।
এই ব্যবস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে যানবাহনভিত্তিক তথ্য যাচাই সহজ হবে এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ২৯ মার্চ ফিলিং স্টেশনগুলোতে নজরদারির জন্য ট্যাগ কর্মকর্তা নিয়োগের কথা জানায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। পরদিন সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই। বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনার প্রবণতাই লাইনের চাপ বাড়িয়েছে।
পাম্পের দীর্ঘ লাইনের ভোগান্তি কমছে না : সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে তেলের লাইনে বিহারি ক্যাম্পের মুখে অপেক্ষায় থাকা চালক মো. আল–আমিন বলছিলেন, গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিলাম। রাতে বাসায় চলে গিয়েছি। আজ সকাল ৮টায় আসার পর দেখি সিরিয়াল অনেক দুরে।
চৈত্র মাসের বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়ে গরম, তাতে ভোগান্তিও বাড়ে চালকদের। আসাদগেটে তিন রাস্তার মুখে ফুটপাত ঘেঁষে ছাতা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন রাকিবুল হাসান। তিনি বলেন, সকাল বেলায় লাইনে আসি। কয়েকদিন রিজার্ভে চালিয়ে আজ সকাল ৭টা বাজে দাঁড়ালাম। সকালে ঠাণ্ডা ছিল। কিন্তু এরপর গরম।
তেল নেওয়ার জন্য ছয় ঘণ্টা অপেক্ষায় ছিলেন মোটরসাইকেল চালক সাহেদুল হক। আর একটি গাড়ির পরেই তিনি তেল পাবেন। তিনি বলেছিলেন, ৫০০ টাকার তেলের জন্য ছয় ঘণ্টা অপেক্ষা। তেল দিচ্ছে মাত্র কয়েকটা পাম্পে। ঢাকার বেশিরভাগ পাম্প বন্ধ। হাতেঘোনা কয়েকটাতে দিচ্ছে। সরবরাহটা ঠিক মতো দিত; মনে হয় না সমস্যাটা থাকতো। আমার মনে হয়, এই সংকট কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে।
বেলা ২টায় পাম্পের কর্মকর্তা মো. সোহরাব বললেন, যতক্ষণ তেল থাকে ততক্ষণ দিচ্ছি। কাল থেকে কার্ড ছাড়া তেল দেওয়া বারণ আছে।
সে সময় সোনার বাংলার উল্টো দিকের তালুকদার পাম্পের গাড়ির লাইন লেক রোডে জিয়া উদ্যানের পাশ ধরে বিজয় সরণির মেট্রোরেল স্টেশনের কাছাকাছি পর্যন্ত গড়ায়। বেলা ৩টার দিকে দেখা যায় গুলশান সার্ভিস স্টেশনের লাইনটিও আধা কিলোমিটার দীর্ঘ। মূল রাস্তায় যানজটের কারণে ফুটপাতের ওপরে মোটরসাইকেলের লাইন। পাম্পটির ভেতরে কর্মীদের সঙ্গে কয়েকজন চালকের কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি চলে।
এই পাম্পের মুখে কথা হয় স্কুটি চালক রাগিব মাহামুদের সঙ্গে। চেহারায় বিরক্ত নিয়ে বললেন, যখন লাইনে খাড়াইলাম তখন সকাল ৯টা ১৫। দুপুর ৩টায় পাম্পের মুখে। সামনে দেখেন ছয়টা গাড়ি আছে। সোনার অঙ্গ কালা করি তেল নেতাছি।
তার পিছনেই ছিলেন পাঠাও চালক সাদিকুর রহমান। বললেন, দিনটাই গেল লাইনে। একটাও খেপ মারতে পারেনি। এখন বাজে ৩টা। সকাল থেকে চা–সিগারেট খেতে খেতেই চলে গেল দেড়শ টাকা। তেল নিইয়া খেপে নামব। রাইতে আবার কোনো একটা পাম্পের লাইনে দাঁড়াব।














