ফুল মানে বসন্ত। বসন্ত মানে ফুল। ফুল না ফুটুক বসন্ত কখনও হয় না। প্রতিদিন ফুল তুলি। ছোটবেলায় দেখা– ফুলের সাজি হাতে প্রভাতী ফুলতোলা ছিলো, অনেকের নিত্যকর্ম। দিদিমা, অতিসুন্দরী মামাতো বোন রাণুদি ও অন্যান্য গুরুজনদের। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা যা–ই হোক্ না কেন। বেশিরভাগ ফুলগাছের ডাল হাতের নাগালে থাকে, যেমন–জবা, মরিচ্যা ফুল,ও আদি বাল্যশিক্ষা বইয়ে উল্লেখিত ছন্দোবদ্ধ নামের ফুলগুলো্ যথা – ‘কামিনী মালতী যুঁথি শেফালী মল্লিকা’ ইত্যাদি। তবে বকের ঠোঁটের মতো বকুল ফুল– এসব ফুল আহরণে লাগেএকপ্রান্ত্রে বাঁকানো হুকযুক্ত লম্বা লাঠি আঁকশি। এবঙ নানা কসরত।
‘তুমি যে গিয়াছো বকুল বিছানো পথে–’ এরকম একটা লাইন। কার লেখা মনে পড়ছে না। স্বরচিত না বিরচিত–দন্ধে আছি। ‘সন্ন্যাসীগোডা ফুল’ দিদিমাদের দেওয়া স্থানিক নাম। ভালো নামটা জানলাম সেদিনমাত্র-‘অলকানন্দা’। বাংলা ভাষায় ফুলের এতো সুন্দর সুন্দর গীতিময় নামকরণ হয়েছে। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল–কৃত বাহারি নামগুলো। চোখে ভাসে মামা–বাড়ি থেকে সারোয়াতলীর নিজ বাড়িতে যেতে বিশালকায় এক গাছের নিচতলা ভরে থাকতো ছোট ছোট মিষ্টি সুগন্ধী তারা ফুলে। দুই করতলে তা কুড়িয়ে শুঁকতে শুঁকতে পথ চলতাম ফুল্ল মেজাজে। অপূর্ব সৌরভের সে ‘বোল ফুল’।
প্রতিদিন সকালে স্নান শেষে পরিশুদ্ধ প্রশান্ত চিত্তে ছাদে যাই। হাতে কাঁসরের ছোট বাটি। বাবা যখন ছিলেন, ফুল তুলে বাসায় সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতেন। এখন তুলি কেবল নিজ ঘরের জন্য। ছাদ–বাগানে সারি সারি ফুলের টব। মনোহর দেশি–বিদেশী ফুল। পাপড়িতে অপরুপ রঙের কারুকাজ। গাছের পাতার আকার অবয়বও খুব টানে। খুঁটিয়ে দেখি। যেমন–কাঁটাযুক্ত গোলাপের শাখা পাতা। তার শিল্পশৈলীও কাব্যিক। আম জাম আনারস কাঁঠাল, এমনকী বরই গাছের ডালপাতাও। শৈশবে এক ঢিলের নিশানায় টুনুদা’র বাড়ির আঙিনাতে টকটকে লাল–হলুদ পাকা বরই পাড়ার কথা–মনে পড়ে। ভুলতে পারিনি সুদূর মেলবোর্নে পুরনো গির্জার টিলাভূমিতে হঠাৎ দেখতে পাওয়া একই রকমের ছোট বরই গাছ্। অমনি জেগে উঠেছিল শৈশবকালিন মায়াস্মৃতিবিদুরতা।
মাথায় হঠাৎ প্রশ্ন জাগে– ফুলের সাথে মিলিয়ে গাছের ডালপাতার বৈশিষ্ট্যও কি নিখুঁত সাজানো! বিজ্ঞান মানে প্রমাণিত সত্য। বিশ্বাস মানে–যা প্রমাণিত হয়নি তাকে সত্য বলে গ্রহণ করা। আর বিজ্ঞান হলো ‘যেন নহে এই সেই’। অগত্যা সুযোগ এলো।
গবেষণার উদ্দেশ্য: ফুলের সাথে মিলিয়ে গাছের ডালপাতার বৈশিষ্ট্য কি সঠিকভাবে সাজানো!
পরীক্ষা পদ্ধতি: বর্ণনামূলক ও বিশ্লেষণমুলক, ্উভয় উপাদান–সহ একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা।
প্রথমে চারপাশ দেখে নিতে হবে–পাছে লোকে জাতীয় কেউ আছে কিনা। তারপর কতক জবা ফুল নিয়ে রাখলাম গোলাপ শাখায়। কাঁটার খোঁচা একটু লাগলো বটে। যাক্গে। মহৎ আবিষ্কারের প্রচেষ্টায় ওরকম এক–আধটুকু কষ্ট পোহাতে হয়। পরর্তীতে কিছু গোলাপ ফুল স্থাপন করি জবা গাছের ডালে। কাছে গিয়ে, দূরে সরে, বিভিন্ন কোণ থেকে অবলোকন করে দেখি– কোনটা কেমন মানায় কেমন দেখায় !
পর্যবেক্ষণ: জগদীশচন্দ্র নাকি সারারাত জেগে গাছ পরীক্ষণ করতেন। এভাবে পেরেছিলেন জগদ্বিখ্যাত আবিষ্কার-‘বৃক্ষের প্রাণ আছে’। এ পর্যন্ত আমার মহৎ কোনো আবিষ্কার ছিলো না। শুধু কবিতায় লিখেছিলাম-‘বিষ্ময় শুধু নয়, তারাভরা আলো শূন্য আঁধার ঘিরে, অনন্ত আকাশে/ আমি অস্তিত্বের পাশে সুক্ষ্ণ অলৌকিক ফেরে/ আশ্চর্য সুন্দর ফুল ফোটে গাছে, কেমন অবাক ফল ধরে আছে’।
ফলাফল: নির্দিষ্ট বৃক্ষের জন্য নির্দিষ্ট পাতার সমাহারই শ্রেষ্ঠ। নিখুঁত সাজানো। অন্যথায় সৃষ্টির মান যেতো নেমে, যেমনটা–রবীন্দ্রসংগীতে নিদির্ষ্ট শব্দ বা বাণী ঘিরে শ্রেষ্ট সুরের সমণ্বয় আবিষ্টতা। তবে কারো দ্বিধা থাকলে অধুনা এ.আই সমাধান চাওয়া যেতে পারে, যেমন– কাঁঠাল গাছে ডাব ধরলে কেমন লাগতো!
উপসংহার: ফুলের বনে সৃষ্টির অতুল ঐশ্বর্য দেখে দোলে হৃদয়। স্রষ্টা যেন সমস্ত আনন্দ–রস–নির্যাসের রুপমুর্তি সাজিয়েছেন এখানে। আমাদের খুব কাছে এসে দেখিয়েছেন সৌন্দর্যগুণের বিস্তৃতি। পূণ্যো গন্ধা:। স্বগতোক্তিতে নিজেকে নিজে শোনালাম– ফুলের দেশে বিধাতার বসতি।
লেখক: প্রফেসর ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।










