ফিল্মি স্টাইলে দুজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ২

বাকলিয়া এক্সেস রোড । সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্না হুকুমের আসামি

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ৫ এপ্রিল, ২০২৫ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

নগরীর বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় ফিল্মি স্টাইলে গুলি করে দুইজনকে হত্যার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজ দেখে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, গত রোববার (৩০ মার্চ) গভীর রাতে ওই দুইজনসহ সংঘবদ্ধ একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ একটি প্রাইভেট কারের পেছনে ও গাড়ির দুই পাশে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে দুইজনকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পর গেলো মঙ্গলবার রুজু করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, চট্টগ্রামের দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ এবং সারোয়ার হোসেনের মধ্যকার বিরোধের জের ধরে ফিল্মি স্টাইলে ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। রুজুকৃত মামলায় সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদ এবং তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। নিহত মোহাম্মদ বখতিয়ার হোসেন মানিকের মা ফিরোজা বেগম মামলাটি দায়ের করেছেন। মামলার আসামি করা হয়েছে পাঁচজনকে, যারা সরাসরি খুনের ঘটনায় অংশ নিয়েছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার হুকুমের আসামি সাজ্জাদ গত ১৫ মার্চ গ্রেপ্তার হয়ে দুটি খুনের মামলায় রিমান্ডে রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ জানায়, গত ৩০ মার্চ (শনিবার) মধ্যরাতে কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু থেকে বাকলিয়া এক্সেস রোডে যাওয়ার সময় একটি রুপালি রঙের প্রাইভেট কারে সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ছয়জন আরোহীসহ গাড়িটি নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে বহদ্দারহাটের পথে কিছুদূর আসার পরই মোটর সাইকেল আরোহী সন্ত্রাসীরা গাড়ি লক্ষ্য করে পেছন এবং দুইপাশ থেকে বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকে। গুলিতে গাড়িটি ঝাঁঝরা হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই নিহত হন গাড়িচালক মোহাম্মদ মানিক ও আরোহী আবদুল্লাহ রিফাত। গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হন রবিউল। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও গুলিতে আহত হওয়া রবিউল ইসলাম জানান, তারা চান্দগাঁও এলাকার সারোয়ার হোসেনের আহ্বানে অক্সিজেন এলাকা থেকে নতুন ব্রিজ বালুর টাল এলাকায় গিয়েছিলেন। ফেরার পথে বাকলিয়া এক্সেস রোডে তাদের প্রাইভেট কারটিকে ধাওয়া করে মোটর সাইকেল আরোহীরা বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়ে। ৩/৪টি মোটর সাইকেলে হেলমেট পরিহিত ৭/৮জন সন্ত্রাসী ছিল বলেও তিনি জানান। হামলাকারীদের চিনতে না পারলেও পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুইজন সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেনের লোক বলে উল্লেখ করে পুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাজ্জাদের সঙ্গে সারোয়ারের দ্বন্দ্ব বেশ স্পষ্ট। সাজ্জাদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই দ্বন্দ্ব আরো প্রকট হয়ে ওঠে। তাই সাজ্জাদের লোকজন সারোয়ারকে খুন করতে হামলা চালাতে পারে বলে পুলিশ মন্তব্য করেছে।

সাজ্জাদ এবং সারোয়ার দুইজনই পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী উল্লেখ করে পুলিশ জানায়, সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হয় ১৫ মার্চ, অপরদিকে সারোয়ার দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ৫ আগস্টের পরে জেল থেকে ছাড়া পায়। সারোয়ারের বিরুদ্ধে ১৬টি হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে।

ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আহত রবিউল সাংবাদিকদের জানান, তার বাসা নগরীর অক্সিজেন এলাকায়। গেলো রোববার রাত ৯টার দিকে আবদুল্লাহ (গুলিতে নিহত) তাকে ফোন করে ঈদের কেনাকাটা করতে শপিংয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। আবদুল্লাহ একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করে রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ তাকে অক্সিজেন এলাকার বাসা থেকে তুলে নেন। ওই সময় গাড়িতে আবদুল্লাহ ছাড়াও মোহাম্মদ মানিক ও ইমন নামের আরো দুজন বন্ধু ছিলেন।

গাড়ি করে বিপণিবিতানের দিকে যাওয়ার সময় আবদুল্লাহর মোবাইলে সারোয়ার ফোন করে আবদুল্লাহকে নতুন ব্রিজ এলাকায় যেতে বলেন। ফোনটি পাওয়ার পর তারা নিউমার্কেট না গিয়ে রাত ১২টা নাগাদ নতুন ব্রিজের বালুর টাল এলাকায় পৌঁছান। বালুর টালে সারোয়ারের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। সেখানে আরো ১০/১২ জন ছিলেন। ওই সময় সারোয়ারের সঙ্গে আবদুল্লাহ কথাবার্তা বলতে থাকেন। খিদে লাগলে রবিউল ও ইমন মইজ্জ্যারটেক এলাকায় খাওয়া দাওয়া করতে চলে যান। ঘণ্টা দেড়েক পর সেখান থেকে ফিরেও তারা আবদুল্লাহকে সারোয়ারের সাথে গল্প করতে দেখেন। আরো বেশ কিছুক্ষণ পর সারোয়ারসহ মোট ছয়জন গাড়ি নিয়ে বের হন। সারোয়ারের সাথের লোকজন মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যান। তারা ৬জন গাড়ি নিয়ে নতুন ব্রিজ থেকে বহদ্দারহাটের পথ ধরেন। মানিক গাড়ি চালাচ্ছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই তিন মিনিটের মাথায় তারা গুলির শব্দ শুনতে পান। ওই সময় তাদের বহনকারী গাড়িটি ধাওয়া করতে করতে ৩৪টি মোটর সাইকেল আরোহী সন্ত্রাসীরা বৃষ্টির মতো গুলি করতে থাকে এবং গাড়িটি ঘিরে ফেলে। এর মধ্যে গাড়ির পেছন থেকে ছুটে আসা একটি গুলি লাগে আবদুল্লাহর পিঠে। মানিকের বগলের নিচেও একটি গুলি লাগে।

গাড়িতে থাকা সারোয়ারের গায়ে কোনো গুলি লাগেনি উল্লেখ করে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, এক পর্যায়ে তারা গাড়ি থেকে নেমে এলোপাতাড়ি দৌঁড়াতে থাকেন। একেকজন একেকদিকে আশ্রয় নেন। সন্ত্রাসীদের গুলিতে বখতিয়ার হোসেন মানিক ও আবদুল্লাহ রিফাত ঘটনাস্থলেই মারা যান।

পুলিশ গত বুধবার মধ্যরাতে ফটিকছড়ি ও চান্দগাঁও থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ বেলাল ও মোহাম্মদ মানিককে গ্রেপ্তার করে। বেলাল খাজা রোডের বাদামতল এলাকার মোহাম্মদ রফিকের পুত্র এবং মানিক ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকার মৃত আবুল হাশেমের পুত্র।

উল্লেখ্য, গত ৩০ মার্চ (রোববার) রাত পৌনে ৩টার দিকে বাকলিয়া এক্সেস রোডের শেষাংশে গুলজার স্কুলের পাশে একটি প্রাইভেট কার (চট্ট মেট্রো১২৯০৬৮) লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে কিছু দুর্বৃত্ত।

জানা গেছে, সাজ্জাদকে ১৫ মার্চ ঢাকার একটি বিপণিবিতানের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া, সাজ্জাদের স্ত্রী এবং নানি রেহেনা বেগমও একাধিকবার সামাজিক মাধ্যমে হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

অপর একটি সূত্র জানায়, সাজ্জাদকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ায় আকরাম নামের এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রাইভেট কারে গুলি করা হয়। আকরামের ব্যবহৃত গাড়িও এই গাড়ির রংয়ের। সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেওয়ার পর হুমকির ঘটনায় আকরামের স্ত্রী রুমা আক্তার বাদী হয়ে মামলা করেছিলেন। এতে সাজ্জাদের স্ত্রীসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছিল।

পুলিশ সবগুলো বিষয় সামনে রেখে মামলাটি তদন্ত করছে বলেও জানিয়েছে।

আসামি গ্রেপ্তারের পর বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বাকিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকটি শক্তি ক্ষমতায় থাকতে নতুন পন্থা বের করছে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রেমার পরিবারের আর কেউ বেঁচে রইল না