ফারহানা ইসলাম রুহীর উপন্যাস ‘ধুলো পড়া ডায়েরিতে’ অপার জীবনবোধ

বিপুল বড়ুয়া | মঙ্গলবার , ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ

ফেলে আসা অতীত মানুষকে নিয়ে যায় স্মৃতির অতলান্ত দিগন্তে, সে স্মৃতি কখনো বা পাওয়ার আনন্দে উদ্বেল আবার কখনও কখনও হারানোর বিষণ্ন বেদনার হাহাকারে বিমূর্ত। এতসব যখন ডায়েরির পাতায় স্থান করে নেয় তা এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বুকের ভেতর চিরঞ্জীব হয়ে বেঁচে থাকে। কোনো একাকী মুহূর্তেসময়কালে যে সব স্মৃতিস্মৃতিকথা বার বার ফিরে আসে যাপিত জীবনেজীবন ভাবনার নানা অনুষঙ্গে।

ধুলো পড়া ডায়েরি’ ু জীবনের সে এক স্মৃতিময় আলেখ্য। ডায়েরির পাতায় পাতায় বেঁচে রয়ে যায় অতীত দিনের স্মৃতিময় কতো কথাজীবন কাহিনিটুকরো টুকরো কতো জলছবি। অবসরে একাকী মুহূর্তে যদি পিছন ফিরে যায় মানুষ ফিরে যায় ডায়েরির পাতায় তখন এক অপরূপ নস্টালজিয়া তাকে স্মৃতিকাতর করে তোলে। তাকে জানান দেয়এ পয়মন্ত জীবন মুহূর্তও তার জীবনে এসেছিলতাকে হাসিয়েছে হয়তোবা কখনো কখনো চুপি চুপি চোখের জল ফেলিয়েছেঅব্যক্ত বেদনায়।

জীবন ঘনিষ্ঠ গভীর অনুধ্যানের লেখক ফারহানা ইসলাম রুহীর চমৎকার ডায়েরি আমেজের সুখপাঠ্য উপন্যাস ‘ধুলো পড়া ডায়েরিতে’ তেমন চমৎকারভাবে বিবৃত হয়েছে একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রামী তথা নিরাপস মানবীর জীবনবোধের উল্লেখ্য কথা কাহিনি। আটপৌরে জীবনযাপনের মার্জিত চলা ফেরার সুমনাএক দীর্ঘসময় পরে চিকিৎসক হিসেবে বরিত হলেন পেশাগত জীবনে। সুমনার ছিল মাবাবা পরিবৃত্ত মধ্যবিত্ত পরিবার, চৌকস জৌলুশ অর্থসম্পদে বলীয়ান না হয়েও মনন বীক্ষণেসামাজিক সৌরভে সুরভিত একটি পরিবারের উজ্জ্বল সদস্য। জীবনকে দেখেছে সে খুব কাছে থেকে। সোজাসাপটা ওদের পরিবারের দর্শনভালো হওভালো থেকোএবং সব্বার প্রতি সারল্যতা প্রদর্শন করে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাও। মেডিক্যালের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী সুমনার চার পাশ আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধাদায়িত্ব কর্তব্যের নিবিড় বন্ধনে।

মা আলেয়া বেগমের ক্যান্সারে মৃত্যুশোকবিহ্বল বাবা আজিজ সাহেব মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় বেঁচে আছেনচার ভাইবোনের মানুষ করে তোলার গুরুদায়িত্বের পাশাপাশি আর্থিক অসচ্ছলতার ভেতর দিয়ে সুমনাকে ডাক্তারী পড়ার মতো ব্যয়বহুল খরচ মেটাতে হচ্ছে। তার পরও এত সব বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হতোদ্যম হয়নি সুমনাবলা যায় স্রোতের বিপরীতে দাঁড় বেয়েলড়াই করে বেঁচে চলেছেসংগ্রামী জীবন হারজিতের খেলায় শেষপর্যন্ত বিজয়ীর আখ্যা পেয়েছে এবং খুব ভালোভাবেই আত্মসম্মানবোধ বজায় রেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সুমনা।

পরিবারের নানা দায়িত্ব কর্তব্যবোধের ঘেরাটোপে বন্দি ডা. সুমনা একসময় নিজের অজান্তে জড়িয়ে যায় সহপাঠী আকাশের সঙ্গে এক মধুর সম্পর্কে। আকাশের বাবা শহরের বিজনেস টাইকুন আরমান চৌধুরী, মা ভার্সিটি অধ্যাপক রিমা চৌধুরী, বিলাসবহুলঅভিজাত জীবনযাত্রা তাদের পরিবারের। পরিবারের আভিজাত্য নিয়ে তাদের নাক উঁচু চলাফেরা স্বভাব কালচার। তাদের পরিবারে রয়েছে হাই প্রোফাইল সোসাইটির চলনবলনের আদুরে মেয়ে বুবুন। বাবামাবোনের আভিজাত্য ও বিলাসী জীবনযাপনের পাশাপাশি আকাশ এক সংবেদনশীলঅহংবোধহীন নিস্পৃহ চলমানতার এক অনন্য প্রতিভূ। সারল্য সরব কথাবার্তায়বিবেচনাবোধে আবিষ্ট আকাশ পিয়ানোতে মধুর সুর তোলতে অভ্যস্ত। কোনো ধরনের আর্থিক সামাজিক আভিজাত্য প্রকাশের সঙ্গে যায় না তার মন মানসিকতার প্রকাশভঙ্গি।

দিনযাপনের দোলাচলে ভারি কাছাকাছি এসে যায় এক সময় অভিজাত পরিবারের আকাশ আর সহজ সরল ঘর সংসারের বৈষয়িক মেয়ে সুমনা। কখনো সখনো দেখাদেখি কাছেদূরে ঘুরে বেড়ানো। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডাবৈঠকখাওয়া দাওয়ার অনুষ্ঠানে আলাপচারিতায় আকাশসুমনা দুজনের মনে একটি মধুর স্বপ্নের বুনন সৃষ্টি হয়। কিন্তু এতসবেও সুমনা ফিরে যেতে চায় এই অক্ষয়বৃত্ত থেকে আকাশদের আভিজাত্য ও মাবাবার অহংবোধের আধিপত্য দেখে। আকাশ কিন্তু সেই বরাবরের মতো আঁকড়ে ধরে ঘর বাঁধতে স্বপ্ন দেখতে বিনম্র সুমনাকে বহুমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠতে দেখা যায়।

আকাশসুমনার সম্পর্কের অগ্রগামিতায় সুমনার বাবা আজিজ আহমদের দুঃখিনীপরিশ্রমী মেয়ের ঘরবাঁধার বিষয় আশয়কে সকুন্ঠ সমর্থন জানালেও আকাশের বাবা আরমান চৌধুরীর সরোষ অগ্রাহ্যতাতাদের দুজনের মধুর সম্পর্ক সৃষ্টির আবহকে বিষাদিত করে। আকাশের মা রিমা চৌধুরীর সুউদ্যোগও মাথা কুটে মরে আরমান চৌধুরীর ধনীনির্ধনের দম্ভোক্তিতে। অত সবের পরেও আত্মীয়মুরুব্বিদের স্বচেষ্টায় ঘর বাঁধে আকাশ ও সুমনা। নানা টানাপড়েনের ভেতর থেকে ফুটে দুজনের মুখে হাসিস্বস্তি, দুজনে দুজনকে কাছে পেয়ে যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে যায়। কিন্তুদুর্ভাগ্য তাদের পিছু ছাড়ে না। বিয়েতে অমত করা আকাশের বাবা আকাশকে ব্যবসা দেখার কথা বলে সেই দূর সিঙ্গাপুর পাঠিয়ে দিয়ে সুমনাকে এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষায় ফেলে দেয়।

আকাশের বাবার অসম কূটচালের শিকার হয়ে আকাশের দীর্ঘ সময় বিদেশ অবস্থানের ঘটনাপ্রবাহআকাশের বাড়ির সুমনার প্রতি অনেকটা বিমাতাসুলভ আচরণে অনেকটা হতবাকবিস্মিত হয়ে সুমনা নিজের ঘরে ফিরে আসেসঙ্গে কন্যা অহনা।

ইতোমধ্যে আকাশ ঐসব কূটচালের বিষয় আঁচ করতে পেরে দেশে ফিরে এসেযখন সুমনা ও মেয়ে আহনাকে তাদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে যায় ু তখন স্বভাবতই সুমনাভারি বেঁকে বসে। অহনাকে নিয়ে সুমনা ফিরে আসেআকাশ তখন বিপর্যস্তউদভ্রান্তস্তম্ভিত। হারজিতের দোলাচলে পাঠককে এনে এক অন্যধরনের ভাবনায় রেখে যায় লেখক। সমাপ্তি টানে উপন্যাসেরহয়তোবা আর এক ক্রান্তিলগ্নে ফেলে দেয় দুটি জীবনেকে।

কুশলী লেখক ফারহানা ইসলাম রুহী এমন ধরনের বিচিত্র টানাপড়েনের মাধ্যমেই দুটি জীবনের নানা দিকচিত্র তুলে ধরেছেন এই তিনশো বায়ান্ন পৃষ্ঠার এই বিশাল উপন্যাসে। এখানে লেখক চট্টগ্রামের তার চেনা জানা অনেক স্থানিক জনপদ স্থাপনাতাদের উপযোগিতার বিষয় আশয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন সুচারুভাবেযা দারুণভাবে উপভোগ্য হয়ে ওঠেছে। যাতে পাঠকমাত্রই নস্টালজিয়ার আবর্তে পড়ে মোহিত হয়েছে বলা যায়, উপন্যাসের কোনো কোনো অংশে গীতল আবহ পাঠককে ডেকে নিয়ে যায় মাধুরিমার নিভৃতদিগন্তে। উপন্যাসে ছোট ছোট বাক্যে অসংখ্য ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক সুতোয় বেঁধে উপন্যাসকে টেনে নিয়ে যাওয়া এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে লেখক ফারহানা ইসলাম রুহীর মুনশিয়ানা বেশ চোখে পড়ে। আজাদীর আজমিশালীআনন্দনসহ দেশের পত্র পত্রিকা লিটলম্যাগে প্রচুর ছোটগল্পকবিতা লিখে আসছেন লেখক দীর্ঘ সময়। পাঠকপ্রিয়তাও সবিশেষ পেয়েছেনএ কথা সহজে উল্লেখ করা যায়।

শৈলী থেকে প্রকাশিত ফারহানা ইসলাম রুহীর ভিন্ন স্বাদের উপন্যাস ‘ধুলো পড়া ডায়েরিতে’ এর নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী উত্তম সেন। এর মূল্য সাতশত টাকা। যাপিত জীবনের টানাপড়েনের উপজীব্য এ উপন্যাস পাঠে পাঠক সমাজসামাজিকতা ও এর সংস্কারের বিষয় প্রসঙ্গ নিয়ে নিঃসন্দেহে ভাবিত হবেন এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

লেখক : গল্পকার, সাংবাদিক

পূর্ববর্তী নিবন্ধমা ছাড়া জীবনের সব স্বাদ অপূর্ণ
পরবর্তী নিবন্ধতিস্তার সংকট সমাধানে দেশীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিশন গঠন করা প্রয়োজন