অন্যান্য দিনের চেয়ে আমার সবচেয়ে ভাল লাগে ফাগুনের দিন। পুরো বসন্তকালই ভাল লাগে। সব ঋতুই ভাল লাগে, একেকটা ঋতুর একেকটা বৈশিষ্ট্য আছে। কিন্তু ফাগুন এলেই মন অন্যরকম হয়ে যায়। যেন বাতাসেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত ডাক, এক কোমল আহ্বান। সুন্দর স্নিগ্ধ হাওয়া মাঘের মধ্য হতেই শীতের উপর দিয়ে বয়ে চলছিল। সেই হাওয়ায় ছিল ঋতু বদলের আভাস। শীতের কাঠিন্য নরম হয়ে আসে, রোদে একটু আলস্য মেশে, বিকেলে আলোটা হয় কোমল। তারপর একদিন হঠাৎ টের পাই, ফাগুন এসে গেছে। ফাগুন হাওয়ায় মন উদাস হয়। আনমনাও লাগে। চারিদিক থেকে ধুলোবালি উড়িয়ে ধুধু হাওয়া কখনো একটু দুষ্টুমি করে, কখনো অকারণ মন খারাপ করায়। কিন্তু তবুও এই হাওয়াকে ভাল না বেসে থাকা যায় না।
ইট–পাথরের শহরে যতটা না ফাগুন সুন্দর, তার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দর গাঁও–গেরামে। শহরের কংক্রিটের দেয়াল ফাগুনকে আটকে রাখতে চায়, কিন্তু গ্রামের খোলা মাঠ, সবুজ গাছপালা তাকে দু’হাত ভরে স্বাগত জানায়। গাছে গাছে আমের মুকুল ফোটে। কী অপূর্ব সেই মউ মউ ঘ্রাণ। দূর থেকেই বোঝা যায়, বসন্ত এসে গেছে। সেই সুবাসের সাথে মিশে থাকে মৌমাছিদের গুঞ্জন। যেন প্রকৃতি নিজেই এক অদৃশ্য সংগীতানুষ্ঠান সাজিয়েছে।
গ্রামে শিমুল গাছের তো অভাবই নেই। বসন্ত এলেই লাল শিমুলে ছেয়ে যায় আকাশের কিনারা। গাছের তলায় পড়ে থাকে রঙিন পাপড়ির স্তূপ। মনে হয়, লাল মখমলের কার্পেট বিছানো হয়েছে। ছোটবেলায় শিমুল ফুলের পাপড়ি হাতে নিয়ে আকাশে ছুঁড়ে মারতাম। কী সুন্দর ঘুরে ঘুরে এসে মাটিতে পড়ত। সেই দৃশ্যের মধ্যে ছিল এক নির্ভেজাল আনন্দ, এক নিষ্পাপ উচ্ছ্বাস।
তখন টেপ রেকর্ডার ছিল। অন করলেই বাজত প্রিয় গান। একবার দুইবার নয়, বারবার শুনতাম। সাথে গুনগুন করে গাইতাম– আহা আজি এ বসন্তে / এত ফুল ফুটে/ এত বাঁশি বাজে/ এত পাখি গায়–আহা আজি এ বসন্তে।
গানের সাথে মিশে যেত বিকেলের আলো, শিমুলের রং, আর আমাদের হাসি। তখন অবশ্য হলুদ বাসন্তি শাড়ি পরা হতো না। ঘরেই থাকতাম। তবুও ছিল শান্তি। যেদিকে যেতাম সেদিকেই যেন এক নিশ্চিন্ত সুখ। সারাদিন গাছের ছায়ায় আমরা ভাইবোনেরা গল্প করতাম, খেলতাম। জ্যেঠিমা, কাকিরা চা বানিয়ে ডাকতেন। চায়ের কাপে ভাসত গ্রামবাংলার আন্তরিকতা। সাথে নানান জাতের পিঠা। সেই পিঠার স্বাদে ছিল ভালোবাসা, ছিল পরিবারের উষ্ণতা।
এখন বুঝি, বসন্ত শুধু ঋতু নয়। বসন্ত মানে স্মৃতি। বসন্ত মানে ফিরে পাওয়া দিনগুলোর গন্ধ। বড্ড মিস করি সেই সময়গুলো। তখন জীবন এত জটিল ছিল না। আনন্দ পেতে আলাদা করে আয়োজনের দরকার হতো না। প্রকৃতিই ছিল আমাদের উৎসব।
যন্ত্রের শহরে ফাগুন আসলেও শিমুল–পলাশ খুব কমই চোখে পড়ে। তবুও ভাল লাগে, যখন দূর থেকে দেখি কৃষ্ণচূড়া গাছে গাছে আগুন রঙা ফুল ফুটে আছে। রোদের আলোয় সেই ফুলগুলো আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কৃষ্ণচূড়ার নিচে গেলে আরও ভাল লাগে। পাপড়ি ঝরে পড়ে, যেন রাস্তা ফুলের বিছানা হয়ে গেছে। মানুষ তার উপর দিয়ে হেঁটে যায়। আমি ফাঁকা জায়গা দেখে পা ফেলি। কখনো ঝরে পড়া পাপড়ি হাতে তুলে নিই। মনে হয়, এই রঙটুকু হাতে নিয়ে কিছুটা বসন্তকে নিজের করে রাখি।
বসন্ত–ফাগুন কাউকে বলে দিতে হয় না। বাইরে দৃষ্টি রাখলেই বোঝা যায়। রঙের পরিবর্তনেই ঋতুর আগমন ধরা পড়ে। চারদিকে হলুদ, বাসন্তি, কমলা, লাল রঙের ছোঁয়া। মেয়েরা শাড়ি কিংবা থ্রি–পিসে সেই রঙের উৎসব ধারণ করে। বাইরে বেরোলে দেখা যায় সাজে–গোজে হাসিমুখ। সময় বদলেছে। এখন বসন্ত মানেই ছবি তোলা, ঘুরতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা। এই প্রজন্মের নিজস্ব উচ্ছ্বাস আছে। কিন্তু আমার কাছে বসন্ত মানে শুধু সাজ নয়। বসন্ত মানে অন্তরের আলো জ্বলে ওঠা। এক অদৃশ্য আনন্দের ঢেউ বয়ে যাওয়া। কখনো তা স্মৃতির, কখনো তা বর্তমানের। বসন্ত মানে নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে। ফাগুন এলেই মনে হয়, জীবন যতই ব্যস্ত হোক, তার ভেতরে কোথাও এক টুকরো গ্রাম লুকিয়ে আছে। সেই গ্রামের মাঠে এখনো শিমুল ফোটে। আমের মুকুলে মৌমাছি আসে। গাছের ছায়ায় বসে শিশুরা গল্প করে। সেই শিশুর ভেতরে আমিও আছি। বসন্ত আমাকে মনে করিয়ে দেয়, জীবনের ক্লান্তি যতই থাকুক, তার মাঝেও রঙ আছে। দুঃখের মাঝেও ফুল ফোটে। হারিয়ে যাওয়া দিনের মাঝেও স্মৃতি বেঁচে থাকে। আর সেই স্মৃতিই আমাদের শক্তি।
বসন্ত এলে আমি জানালাটা একটু বেশি খুলে দিই। বাতাসকে ভেতরে ঢুকতে দিই। পুরোনো মনখারাপগুলোকে উড়িয়ে দিতে দিই। নতুন দিনের আশায় মন ভরি। মনে মনে বলি, আহা আজি এ বসন্তে। হয়তো আবার কোনো একদিন গ্রামের পথে হাঁটব। শিমুলের পাপড়ি পায়ে লেগে থাকবে। মৌমাছির গুঞ্জন কানে আসবে। আর আমি আবার সেই ছোট্ট মেয়েটির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসব।
কারণ বসন্ত কখনো শেষ হয়ে যায় না। সে থেকে যায় মনে, স্মৃতিতে, অনুভবে। বছর ঘুরে সে আবার আসে। আর প্রতিবারই সে নতুন করে শেখায়, সুন্দরকে ভালোবাসতে হয়, জীবনকে উপভোগ করতে হয়, আর সময় থাকতে স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরতে হয়। ফাগুন মানেই রঙ। ফাগুন মানেই গান। ফাগুন মানেই হৃদয়ের দরজা খুলে দেওয়া। আর আমার কাছে বসন্ত মানেই ফিরে পাওয়া এক টুকরো নিজেকে।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক।











