ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ এ চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) আসনে প্রথমে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীরের প্রার্থীতা বাতিলের পর নির্বাচনী প্রচারণা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। পরে গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্টে প্রার্থীতা ফিরে পাওয়ার পরপরই আবারো জমে উঠে ফটিকছড়ি সংসদীয় এলাকার নির্বাচনী প্রচার–প্রচারণা এবং ভোটের আমেজ। তবে দুশ্চিন্তা কাটেনি বিএনপি প্রার্থীর। কারণ বিজয়ী হলেও গেজেট প্রকাশে রয়েছে আইনি বাধা। এরপরও আশাহীন নন প্রার্থী এবং দলের নেতাকর্মীরা।
এবার বিএনপি–জামায়াতসহ মোট ৮ জন প্রার্থী ভোটের মাঠে লড়াই করছেন এ আসনটিতে। তারা হচ্ছেন– বিএনপির সরওয়ার আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সুন্নী জোটের সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভাণ্ডারী, গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান, জনতার দলের মোহাম্মদ গোলাম নওশের আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জুলফিকার আলী মান্নান, স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আকতার ও আহমদ কবির।
এদিকে, চট্টগ্রাম–২ (ফটিকছড়ি) আসনের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৪০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৯৮টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র ও মাঠপর্যায়ের তথ্যে উঠে এসেছে এসব কেন্দ্রের তথ্য। জানা যায়, এবার উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৫ জন। তদ্মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ১৯৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ২৬৭ জন ও হিজড়া ভোটার ১ জন। এবারের নির্বাচনে এ আসনে মোট ১৮টি ইউনিয়ন এবং ২টি পৌরসভার ১৪০টি ভোটকেন্দ্রে মোট বুথ থাকবে ৯০০টি যার মধ্যে ৮২২টি স্থায়ী এবং ৭৮টি অস্থায়ী। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ১০৫টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন ইতিমধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ভোট গ্রহণের জন্য ১৪০ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ৯০০ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও ১৮০০ জন পোলিং অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ঝুঁকির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো এলাকায় বিএনপি বা জামায়াতের আধিপত্য, কোথাও আবার ব্যক্তির প্রভাব উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি সন্ত্রাস প্রবণতা, দুর্গম ও সরু যোগাযোগ ব্যবস্থা, বেহাল সড়ক পরিস্থিতি, কেন্দ্রের নিকটবর্তী বাজার বা প্রভাবশালী নেতার বসবাসের তথ্যও উঠে এসেছে। এছাড়াও বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের মধ্যে সীমানা প্রাচীরজনিত সমস্যা রয়েছে যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত উপস্থিতি ব্যাহত হতে পারে। এসব কারণে নির্বাচনকালীন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম–২ ফটিকছড়ি আসন চট্টগ্রামের সর্ববৃহৎ একটি উপজেলা। এ জনপদে মানুষের জীবিকা মূলত কৃষি এবং প্রবাসী আয়। তবে সম্ভাবনাময় ফটিকছড়ি চা বাগান, রাবার বাগান এবং খাল, নদী ও পাহাড় বেষ্টিত।
এদিকে নির্বাচনের মাঠে জামায়াত–বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে উঠেছে। সরওয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে ইসিতে আপিল দায়ের করেছিলেন জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। এ অভিযোগে বিএনপির প্রার্থীতাও বাতিল হয়ে যায়। পরে মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে তার প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট বিভাগ। আর এতেই পাকাপোক্ত হয় দুই দলের ভোটার এবং কর্মী সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। দিন যতই যাচ্ছে নির্বাচনী উত্তাপ বাড়তে শুরু করেছে। যেহেতু আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে নেই তাই তাদের ভোটগুলো নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টাও করছেন অনেক প্রার্থী।
অতীতে দেখা গেছে, ফটিকছড়িতে বিএনপির একটি নিজস্ব ভোট ব্যাংক থাকায় তাদের প্রার্থীরা প্রায়শই ভালো ফল করেছেন। তবে এখানে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তিও বেশ ভালো। তাই এই আসনে দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ জমে উঠেছে।
ভোটাররা জানান, নির্বাচনে মূল আলোচনায় রয়েছে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিন। ভোটের মূল লড়াইটাও চলবে এ দুজনের মধ্যে। তবে একতারা প্রতীকের সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারীও এখানে একটা ফ্যাক্টর হতে পারেন। কারণ ফটিকছড়িতে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাইজভান্ডারী ভক্ত ভোটার।
এছাড়াও প্রার্থীদের মধ্যে প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান তানজিমকে। তার দাবি, এবারের নির্বাচনে সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী তিনি। প্রতিদিন তিনি বিভিন্নস্থানে তার নির্বাচনী প্রচারণা করছেন। প্রথমদিকে আলোচনার বাইরে থাকলেও এখন তিনিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্যদিকে প্রচারণার মাঠে শুরুর দিকে কিছুটা চোখে পড়লেও এখন তেমন দেখা যাচ্ছে না জনতার দলের গোলাম নওশের আলীকে। এ আসনে ভোটের মাঠে থাকা অন্য প্রার্থীরা হলেন– ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জুলফিকার আলি মান্নান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এডভোকেট আহমদ কবির করিম ও জিন্নাত আকতার।
বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর দৈনিক আজাদীকে বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে ফটিকছড়ির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। ফটিকছড়ির গ্যাস ফটিকছড়ির মানুষ পায় না। ফটিকছড়িতে সব সুযোগ থাকা স্বত্ত্বেও একটি ইকোনমিক জোন কিংবা কোনো ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেনি। আমাদের বিপুল পরিমাণ সম্পদ আছে। আগামীতে তিনি নির্বাচিত হলে সমস্যা–সম্ভাবনার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবেন বলে জানান।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিনের প্রত্যাশা, নির্বাচিত হলে তিনি সন্ত্রাস–চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি হ্রাস করবেন। সরকারি–বেসরকারি সকল ব্যবস্থাপনা, রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দূরীকরণসহ বঞ্চিত জায়গাগুলোর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করবেন।
বিএসপির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ মাইজভান্ডারী বলেন, সমাজ সংস্কারে প্রয়োজন শিক্ষিত ব্যক্তির নেতৃত্বে আসা।
গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী রবিউল হাসান তানজিম বলেন, ফটিকছড়িকে একটি সমৃদ্ধশালী জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। আমাদের ভাই–বোনেরা আর বেকার থাকবে না। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান একসাথেই গড়ব। তিনি বলেন, কিছু নেওয়ার জন্য নয়, ফটিকছড়িবাসীর সেবা করার জন্যই আমি রাজনীতিতে এসেছি।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে বেশিরভাগ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। একজন যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ এবং দুইজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচনী আচরণবিধিসহ সকল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। এছাড়াও নিয়মিত সেনা টহল চলমান রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ যেসব কেন্দ্র করা হয়েছে সেসব কেন্দ্রে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে তার জন্য প্রশাসন সর্বাত্মক কাজ করবে এবং প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।












