পড়াশোনা হোক মনের আনন্দে

অনামিকা বড়ুয়া | বুধবার , ৪ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের আকাশে ভেসে আসত এক অদ্ভুত সুরপড়ার সুর। প্রতিটি বাড়ি থেকে শোনা যেত বইয়ের পাতার শব্দ, শিশুদের একসাথে উচ্চারণ করে পড়া, আর মৃদু কেরোসিন বাতির আলোয় মনোযোগী মুখগুলো। তখন পড়াশোনা ছিল দায়িত্বের চেয়ে অভ্যাস, চাপের চেয়ে আনন্দ।

সেই সময় মায়েদের চোখে ছিল বিশ্বাস, উৎকণ্ঠা নয়। সন্তানের পাশে বসে সারাদিন পড়া ধরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। ‘পড়তে বসো’এই কথাটিও খুব কমই বলতে হতো। শিশুরা নিজের তাগিদেই বই খুলত। পরীক্ষা কেমন হলো, কে কত নম্বর পেলএসব নিয়ে এত হিসাবনিকাশ ছিল না। পড়াশোনা ছিল মানুষ হওয়ার পথ, প্রতিযোগিতার দৌড় নয়। ছোটবেলায় গৃহশিক্ষকের প্রচলন ছিল না বললেই চলে। নবম শ্রেণীতে ওঠার পর হয়তো কেউ কেউ শিক্ষক পেত। তার আগে পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের মতো করে পড়াশোনা করত। তবুও কি তারা পিছিয়ে ছিল? আমাদের কাকা, মামা, ভাইবোনেরা কি অশিক্ষিত রয়ে গেছেন? না, বরং গ্রামের সেই সাধারণ পরিবেশ থেকেই কেউ হয়েছেন ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক। সীমিত সুযোগের মধ্যেও ছিল অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর আত্মনির্ভরতা।

আজ চিত্রটি ভিন্ন। অভিভাবকেরা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন যে অনেক সময় নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন ভুলে যান। সন্তান পড়া শেখার আগেই অভিভাবকরা যেন নতুন করে পড়া শিখতে শুরু করেন। স্কুল, কোচিং, প্রাইভেটসবকিছুর মাঝে শিশুরা কখন যেন হারিয়ে ফেলছে নিজের মতো করে শেখার আনন্দ।

আমরা কি পারি না আবার একটু ফিরে তাকাতে? সেই দিনগুলোর সরলতা, বিশ্বাস আর স্বাধীনতার দিকে? আসুন, আমরা অভিভাবকেরা সন্তানের মনের উপর কিছুটা ভরসা রাখি। তাদের ভাবতে দিই, ভুল করতে দিই, নিজে থেকে শিখতে দিই। পরীক্ষা কেমন দিলতা জানবো, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জানবো সে কী শিখল, কী ভাবল, কী হতে চায়।

শিক্ষা শুধু নম্বরের খাতা নয়; শিক্ষা হলো মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া। হয়তো পুরোপুরি আগের দিনে ফেরা সম্ভব নয়, কিন্তু সেই সময়ের বিশ্বাস, আত্মনির্ভরতা আর মানসিক স্বস্তিটুকু আমরা আজও ফিরিয়ে আনতে পারি। তবেই আমাদের সন্তানরা কেবল সফল নয়, সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠবেএটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ২ নং বাস পুনরায় চালু করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধবিজয় বসন্ত