ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর পর দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্ক নিয়ে আসা হচ্ছে। তারা নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে রওনা হওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর উভচর আক্রমণকারী জাহাজ ইউএসএস ইও জিমাতে আছেন। সেই জাহাজে অবস্থানরত বন্দি প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রথম ছবিও প্রকাশ্যে আনেন ট্রাম্প। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তার চোখ কালো রঙের আবরণে ঢাকা, কানেও শব্দনিরোধক আবরণ। ট্রাম্প জানিয়েছেন, গত চার দিন ধরে এই অভিযানের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। সঠিক সময় এবং আবহাওয়ার উন্নতির অপেক্ষা করছিলেন। মাদুরোকে একটি ‘অত্যন্ত সুরক্ষিত দুর্গ’ থেকে ধরা হয়।
এদিকে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে নিউ ইয়র্কের সাউথ ডিস্ট্রিক্টে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘মাদক–সন্ত্রাসবাদ, কোকেন আমদানি, মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ডিভাইস রাখার ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ আনা হয়েছে। বন্ডি আরও বলেন, ‘তারা শিগগিরই আমেরিকার মাটিতে, আমেরিকান আদালতে, আমেরিকান ন্যায়বিচারের মুখোমুখি হবেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না বলে ধারণা করছেন তিনি।
রয়টার্স লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে পানামায় আক্রমণ করার পর থেকে লাতিন আমেরিকায় এ ধরনের সরাসরি হস্তক্ষেপ আর করেনি। ৩৬ বছর আগের ওই ঘটনায় মার্কিন বাহিনী পানামায় অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে পদচ্যুত করে ও তারপর আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়েছিল।
এদিকে আমেরিকার এই সামরিক পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলা’ বলে অভিহিত করেছে ভেনেজুয়েলা। ভেনেজুয়েলা সরকারের দাবি, সে দেশের খনিজ তেল এবং সম্পদ হাতানোর জন্যই এই কাজ করেছে আমেরিকা। ট্রাম্প প্রশাসনের এই চেষ্টা সফল হবে না বলে জানিয়েছে তারা। আমেরিকার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বসতি এলাকাতেও হামলা চালানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। এটা ঠিক যে, বিশ্বের বৃহত্তম তেল উত্তোলক দেশগুলির মধ্যে অগ্রগণ্য ভেনেজুয়েলা। এই মুহূর্তে বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেলের ভান্ডার রয়েছে সেদেশে। তারা প্রতি দিন প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। ভেনেজুয়েলার দাবি, তাদের সেই খনিজ সম্পদ লুট করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরে থাকা এই ‘সমাজতান্ত্রিক’ দেশ বরাবরই আমেরিকার শিরঃপীড়ার কারণ। ভূরাজনৈতিক এই বাধ্যবাধকতা থেকেই আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার চেষ্টা করছিলেন মাদুরো। এমনকি সামরিক অভিযানের আগেই চীনের কয়েক জন প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হানার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়া, ইরান, কিউবার মতো দেশ।
গত কয়েক মাসে ভেনেজুয়েলাকে ঘিরতে ক্যারিবিয়ান সাগরে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং পরমাণু–ডুবোজাহাজ নামিয়েছিল আমেরিকা। সর্বক্ষণ দেশটিকে একপ্রকার ঘিরে রেখেছিল মার্কিন বাহিনি। শুক্রবার মধ্যরাত (স্থানীয় সময় অনুসারে রাত ২টো) থেকেই ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অন্তত সাত বার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছিল। হামলার খবর পাওয়া যায় সে দেশের মিরান্ডা, আরাগুয়ার মতো প্রদেশেও।
এই হামলার নেপথ্যে কে বা কারা, প্রথমে তা স্পষ্ট ছিল না। সম্ভাব্য মার্কিন হানা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, সেই সময়েই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি লেখেন, ‘ভেনেজুয়েলা এবং তার নেতা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে বড় মাত্রার অভিযান চালিয়েছে আমেরিকা। মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে বন্দি করা হয়েছে। তাদের আকাশ পথে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
এরপর সিএনএন–এর সাংবাদিকরা জানান, বিস্ফোরণের প্রভাবে শহরের ভবনগুলো কেঁপে ওঠে এবং বড় একটি অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এরপর মার্কিন কর্মকর্তারা, মার্কিন সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে আটক করেছে। ডেল্টা ফোর্স মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট।
এই অভিযানে মার্কিন সেনার কেউ হতাহত হননি বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘কয়েক জন আঘাত পেলেও পরে তারা ফিরে এসেছিলেন। এখন তারা সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন।’ পাশাপাশি, ট্রাম্প জানিয়েছেন, মাদুরোর ছেড়ে যাওয়া পদ কাউকে দখল করতে দেবে না আমেরিকা। বিরোধী দলনেত্রী শাসনভার পাবেন কি না, তা–ও ঠিক করবে আমেরিকাই। ট্রাম্প বলেন, ‘গোটা অভিযানটি দেখেছি। ঠিক যেন কোনও টিভির অনুষ্ঠান দেখছি!’












