প্রেম, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতি

মনোয়ার হোসেন রতন | শনিবার , ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ

মানুষের জীবন কোনো একক অনুভূতি বা একমাত্র কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে নেই। মানুষের জীবন গড়ে ওঠে চারটি গভীর, পরস্পরসংযুক্ত ও নির্ভরশীল স্তম্ভের উপর প্রেম, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতি। এই চারটি স্তম্ভের যেকোনো একটির ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন যেমন বিপর্যস্ত হয়, তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেও নেমে আসে অস্থিরতা।

প্রেম মানুষের ব্যক্তিগত আবেগের কেন্দ্রবিন্দু, পরিবার সেই আবেগের প্রথম সামাজিক আশ্রয়, সমাজ তার বিস্তৃত প্রকাশভূমি, আর রাজনীতি সেই সমাজ পরিচালনার কাঠামো। এই চারটি মিলেই মানুষের পূর্ণ জীবনচিত্র নির্মিত হয়। তাই প্রেমকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যেমন ভুল, তেমনি রাজনীতিকে মানবিক অনুভূতির ঊর্ধ্বে ভাবাও একটি মারাত্মক বিভ্রান্তি।

এরিস্টটল বলেছিলেন, Man is by nature a social animal . মানুষ স্বভাবতই সমাজবদ্ধ। এই সমাজবদ্ধতার কারণেই মানুষের প্রেম কেবল ব্যক্তিগত গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; তা পরিবারে ছড়িয়ে পড়ে, সমাজকে প্রভাবিত করে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেও প্রতিফলিত হয়। ইতিহাস ও সাহিত্য আমাদের বারবার দেখিয়েছে ব্যক্তিগত প্রেম কখনো সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, আবার রাষ্ট্রীয় রাজনীতির নির্মম সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পরিবার ও ভালোবাসাকে চূর্ণ করে দিয়েছে।

প্রেম মানবজীবনের সবচেয়ে মৌলিক ও শক্তিশালী অনুভূতি। কিন্তু প্রেম বলতে আমরা প্রায়ই কেবল নারীপুরুষের রোমান্টিক সম্পর্ককেই বুঝি। বাস্তবে প্রেম এর চেয়েও অনেক বিস্তৃত। মাবাবার নিঃশর্ত স্নেহ, সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ, ভাইবোনের মমতা, বন্ধুত্বের আস্থা এবং মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা সবই প্রেমের নানা রূপ। পরিবার হলো সেই পরিসর, যেখানে প্রেম প্রথম সামাজিক রূপ লাভ করে এবং দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রেম ও পরিবারকে মানবিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে ব্যক্তিগত প্রেম, পারিবারিক দায়িত্ব ও জাতীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন যেখানে প্রেম সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, সেখানে মানবিকতা বিপন্ন হয়। একইভাবে টলস্টয়ের ‘আন্না’ কিংবা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ সবখানেই আমরা দেখি, প্রেম যখন সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, তখন মানুষের অন্তর্দহনই সাহিত্যের প্রধান ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে।

প্রেম ও রাজনীতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সমাজ। সমাজই নির্ধারণ করে কোন প্রেম গ্রহণযোগ্য, কোন সম্পর্ক নিষিদ্ধ, কোন স্বপ্ন বৈধ এবং কোনটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে সমাজই রাজনীতিকে বৈধতা দেয় অথবা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সমাজের মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার সম্পর্ক রাজনীতির চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ইবনে খালদুন তাঁর ‘মুকাদ্দিমা’তে সমাজকে একটি জীবন্ত কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে মানুষের আবেগ, অর্থনীতি ও ক্ষমতা পরস্পর নির্ভরশীল। সমাজ যখন ন্যায়ভিত্তিক হয়, তখন প্রেম বিকশিত হয়; সমাজ যখন বৈষম্যপূর্ণ ও শোষণমূলক হয়, তখন প্রেমও সংকুচিত ও দমিত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় জাতপাত, শ্রেণি বা বর্ণভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় প্রেমকে প্রায়ই বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হয়েছে এবং ভালোবাসার অপরাধে মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।

রাজনীতি মূলত ক্ষমতা বণ্টন ও সমাজ পরিচালনার প্রক্রিয়া। কিন্তু এই রাজনীতি কখনো মানবিক হয়, আবার কখনো হয়ে ওঠে নিষ্ঠুর ও অমানবিক। রাজনীতি যখন নৈতিকতা ও মানবিকতা হারায়, তখন তা কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার যন্ত্র থাকে না; তা পরিবার ভাঙে, সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে এবং প্রেমকেও সন্দেহের চোখে দেখতে শেখায়।

প্রেম, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতি এই চারটি কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়; বরং একটি আরেকটির পরিপূরক। প্রেম মানবিকতা শেখায়, পরিবার দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে, সমাজ মূল্যবোধ সংরক্ষণ করে, আর রাজনীতি সেই মূল্যবোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এই সমন্বয় ভেঙে গেলে মানব সভ্যতা সংকটে পড়ে।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, “ Power without love is reckless and abusive and love without power is sentimental and anemic” অর্থাৎ প্রেমহীন ক্ষমতা নিষ্ঠুর, আর ক্ষমতাহীন প্রেম দুর্বল। এই কথার মধ্যেই মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা লুকিয়ে আছে।

অতএব, মানবতার জন্য প্রয়োজন প্রেমে উদ্দীপ্ত পরিবার, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং মানবিক রাজনীতি। নদীর বিভিন্ন প্রবাহ যেমন একসঙ্গে মিশে সমুদ্র গড়ে তোলে, তেমনি প্রেম, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতির সমন্বয়ই গড়ে তোলে মানব সভ্যতার মহাকাব্য।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ : চিকিৎসার নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
পরবর্তী নিবন্ধহল্যান্ড থেকে