প্রেমার পরিবারের আর কেউ বেঁচে রইল না

মা-বাবা হারানো আরাধ্যা হাসপাতালে কয়েকটি দুর্ঘটনা, অনেক কান্না

মোহাম্মদ মারুফ, লোহাগাড়া | শনিবার , ৫ এপ্রিল, ২০২৫ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ

লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়ায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার চার দিনের মাথায় মৃত্যুর কাছে হার মারলেন কলেজ শিক্ষার্থী তাসনিয়া ইসলাম প্রেমা (১৮)। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে একই দুর্ঘটনায় প্রেমার মাবাবা ও দুই বোন নিহত হন। প্রেমার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পরিবারটির আর কেউ বেঁচে রইল না।

নিহতের স্বজনেরা জানান, ঈদের ছুটিতে রফিকুললুৎফুন দম্পতি তাদের তিন সন্তান, আত্মীয় ও রফিকুলের সহকর্মী ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দিলীপ বিশ্বাসের পরিবারের সদস্যরা কক্সবাজারে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে গত বুধবার তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের সাথে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

প্রেমার স্বজন নাদিরা আক্তার বললেন, দুর্ঘটনার পর পরিবারটির অন্য সদস্যদের মরদেহ ফিরোজপুরের কদমতলায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন প্রেমার মরদেহও সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। এক পরিবারের সবার কবর একসাথে হবে। একটি পরিবার চিরতরে এক সঙ্গে চলে গেছে।

মাবাবার স্নেহ হারাল ছোট্ট আরাধ্যা : চিরতরে মাবাবার স্নেহ হারাল ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া ছোট্ট আরাধ্যা বিশ্বাস। ঈদের ছুটিতে মাবাবার সাথে বেড়াতে যাচ্ছিল কক্সবাজার। হয়তো তার স্বপ্ন ছিল সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে খেলবে, মজা করবে। কিন্তু তার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। আনন্দের যাত্রা মুহূর্তেই পরিণত হলো কান্নায়।

আরাধ্যা এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আইসিইউতে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। নিষ্পাপ চোখে এখনো হয়তো লেগে আছে সমুদ্রের ঢেউ। অথচ সে জানে না, যাদের হাত ধরে সে সৈকতে দৌড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল, তারা আজ নিথর। আরাধ্যা হয়তো মনে করেছে, বাবামা কাছে কোথাও আছে। একটু পর এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই স্পর্শ আর কোনোদিন পাবে না সে।

লোহাগাড়ার এই দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, আরাধ্যার ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে। যে বয়সে তার হেসে খেলে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে তাকে লড়তে হচ্ছে মৃত্যুর সঙ্গে। আর যখন সে চোখ মেলবে, তখন জানতে পারবে তার মাথার ওপর থেকে চিরতরে সরে গেছে বাবামায়ের স্নেহময় ছায়া। এই নির্মম সত্য তার ছোট্ট মনে কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করবে কে জানে? এই মুহূর্তে সবার একটাই প্রার্থনা, ছোট্ট আরাধ্যা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। তার দাদু যেন তাকে ভালোবাসার উষ্ণতা দিতে পারেন। এমন বিষাদগাথা যেন আর কোনো শিশুর জীবনে না আসে।

বৃহস্পতিবার সকালে ঝিনাইদহের মাটিতে দিলীপ ও সাধনার নিথর দেহ পাশাপাশি শায়িত, তখন তাদের কলিজার টুকরা আরাধ্যা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে হাসপাতালের বিছানায়। দিলীপের বাল্যবন্ধু শোভন কুমার কাজল জানান, পরিবারে এখন আর কেউ নেই যে এই ছোট্ট মেয়েটির দায়িত্ব নেবে। দিলীপের বৃদ্ধ বাবা দুলাল বিশ্বাস, যার একমাত্র অবলম্বন ছিলেন তার ছেলে, আজ ভেঙে পড়েছেন। তিন বিধবা মেয়ের মধ্যে দুজন থাকেন পশ্চিমবঙ্গে। অন্যজনের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়।

বৃদ্ধ দুলাল বিশ্বাস জানান, তিনি নিজে চলৎশক্তিহীন। যেভাবেই হোক আরাধ্যাকে আগলে রাখবেন। তার বাবারমায়ের অভাব পূরণ করার চেষ্টা করবেন।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে ছুটে এসেছেন আরাধ্যার কাকা অসিত কুমার বাড়ই। তিনি জানান, এমন একটা দুর্ঘটনা ঘটবে কখনও ভাবিনি। বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে আরাধ্যাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। আরাধ্যার চিকিৎসা আপাতত চট্টগ্রামে চলবে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তাসলিম উদ্দীন জানান, শিশু আরাধ্যার দুই পা ভেঙে গেছে। মাথায়ও বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। আহত আরাধ্যাকে শুক্রবার ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। সেখানে তাকে আরও উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হবে।

লোহাগাড়ার ৪ জনের পরিবারে শোক : ঈদের দিন সকাল ৭টায় চট্টগ্রামকক্সবাজার মহাসড়কে উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের জাঙ্গালিয়া এলাকায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৫ জনের মধ্যে ৪ জনের বাড়ি লোহাগাড়ায়। ঈদের আনন্দের দিতে তাদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।

সেই তরমুজটি আর খাওয়া হলো না : কক্সবাজারের উখিয়ার কোটবাজারে কসমেটিকস দোকানের বিক্রয়কর্মী ছিলেন আরফাত হোসেন। ঈদের দিন সকালে বাড়ি ফেরার পথে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। আরফাতের পিতা কৃষক আবদুল মোতালেব প্রকাশ সোনা মিয়া বলেন, ঈদের পরে তার ছেলের বিয়ের কথা ছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ছেলেকে বিয়ে করানো হলো না। তিনি জানান, ঈদের আগে কয়েকদিন বেচাবিক্রির ব্যস্ততায় একদম ঘুমাতে পারেনি আরফাত। সেজন্য ভোরে গাড়িতে উঠে মাকে ফোন করে বলেছিল, মা বিছানা রেডি রেখো। বাড়িতে এসে ঈদের নামাজ আদায় করে ঘুমাব। কথামতো মা বিছানা রেডি করে রেখেছিলেন। কিন্তু আরফাতকে মায়ের যত্ন করে গুছিয়ে দেওয়া বিছানায় নয়, শোয়ানো হলো মাটির বিছানায়। এছাড়া আরফাত তরমুজ খেতে পছন্দ করত। তাই পিতার ক্ষেতের বড় তরমুজটি ছিঁড়ে ছেলের জন্য বাড়িতে এনে রেখেছিলেন। সেই তরমুজও খাওয়া হলো না আরফাতের।

এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ হলো না : স্থানীয় আধারমানিক পিডিসি উচ্চ বিদ্যালয়ের এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল রিফাত হোসেন। রিফাতের পিতা বদিউল আলম গরুর ব্যবসা করেন। ৪ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রিফাত। পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল।

রিফাতের বড় বোন জোবাইদা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, রমজানে স্কুল ছুটি থাকায় এক মাসের জন্য চাচাতো ভাইয়ের কাপড়ের দোকানে কাজ করতে গিয়েছিল রিফাত। পরিবারের সব সদস্যের জন্য কাপড় কিনে বাড়ি ফিরছিল সে। দুর্ঘটনার ১৫ মিনিট আগেও বোনের সাথে মোবাইলে কথা হয়। বলেছিল, আপু আর বেশি দূরে নয়, একটু পরই দেখা হবে। দেখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জীবিত না, মৃত।

দ্বিতীয় সন্তানকে দেখে যেতে পারেননি নাজিম: কক্সবাজারের উখিয়া কোটবাজারে একটি কাপড়ের দোকানে চাকরি করতেন নাজিম উদ্দিন। কর্মস্থল থেকে স্ত্রীসন্তানের জন্য নতুন জামাকাপড় নিয়ে ঈদ করতে বাড়ি আসছিলেন। কিন্তু চুনতির জাঙ্গালিয়ায় থেমে গেল তার জীবন প্রদীপ। তারা ৩ ভাই ১ বোন। নাজিম উদ্দিন ও রাজিয়া সোলতানা দম্পতির আবদুল্লাহ আল আলিফ নামে ২ বছরের এক ছেলে রয়েছে। স্ত্রী রাজিয়া বেগম বর্তমানে ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

নাজিমের বড় ভাই জমির উদ্দিন জানান, ভাইকে হারিয়ে তার স্ত্রীস্বজনরা শোকাহত। অভাবের সংসারে স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে স্ত্রী রাজিয়া সোলতানা। কয়েক মাস পরে সন্তান পৃথিবীতে আসবে। পৃথিবীতে আসার আগেই অনাগত সন্তান হারিয়ে ফেলেছে তার বাবাকে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, কোনোদিন পাবে না বাবার আদর। বাবা হারা সন্তানদের জীবন কিভাবে অতিবাহিত করবে সেই চিন্তায় স্বজনরা।

এক সপ্তাহের জন্য চাকরিতে গিয়ে লাশ হলেন : লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের সুখছড়ি খলিফার পাড়ার প্রবাসী আমির হোসেনের পুত্র জিসান হোসেন। তারা ২ ভাই ২ বোন। নিহতের চাচাতো ভাই আমজাদ হোসেন জানান, জিসান বান্দরবান সরকারি কলেজের অনার্সের ছাত্র। ঘটনার এক সপ্তাহ আগে তার পিতা প্রবাস থেকে দেশে ফিরেন। বিমানবন্দর থেকে তার পিতাকে বাড়িতে নিয়ে এসে কয়েকদিনের জন্য উখিয়ার কোটবাজারে চাকরিতে যান জিসান। ঈদের দিন বাড়িতে ফেরার পথে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে তার মৃত্যু হয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধফিল্মি স্টাইলে দুজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ২
পরবর্তী নিবন্ধএকই স্থানে দুদিনে তিন দুর্ঘটনা, নারী-শিশুসহ ১৬ মৃত্যু