আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম–১২ পটিয়া আসনে নির্বাচনী প্রচারণা বেশ জমে উঠেছে। ১৭ ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫২ হাজার ৬৯৫ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৫৪ জন ও নারী ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪০ জন। অপরদিকে এ আসনে মোট পোস্টাল ভোটার ৩ হাজার ১৯৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৮৩৮ জন এবং মহিলা ৩৬০ জন।
পটিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানে পটিয়ার ১১৩টি ভোট কেন্দ্র ও ৭০১টি ভোটকক্ষ স্থাপনে নির্বাচন অফিস যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ইতিমধ্যে ভোটগ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতিও সম্পন্নের পথে।
পটিয়ার এ আসনে এবার প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির এনামুল হক এনাম (ধানের শীষ), ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ এয়ার মুহাম্মদ পেয়ারু (মোমবাতি), জামায়াতে ইসলামীর ডা. ফরিদুল আলম (দাঁড়িপাল্লা), ইনসানিয়াত বিপ্লবের মুহাম্মদ আবু তালেব হেলালী (আপেল) জাতীয় পার্টির ফরিদুল আলম (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ড. এসএম বেলাল নুর আজিজি (হাতপাখা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন (ফুটবল)। সংসদ নির্বাচনের ইতিহাস অনুযায়ী, এ আসনে ১৯৭৯ সালে বিএনপির নজরুল ইসলাম নির্বাচিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় এই আসনে বিএনপির আধিপত্য ছিল। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর পরবর্তীতে বিতর্কিত দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। ১৯৭৩ সালে থেকে এ আসনটিতে বিএনপি ৫ বার, আওয়ামী লীগ ৬ বার ও জাতীয় পার্টি ২ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। আওয়ামী লীগ বিহীন এ নির্বাচনে এবার বিএনপি জেতার ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। ফলে বিএনপি প্রার্থী রয়েছে বেশ ফুরফুরে মেজাজে।
অপরদিকে নানামুখী ভোটের সমীকরণে ভোট বঙে চমক দেখা চায় ইসলামী ফ্রন্ট। তারা রাজনৈতিক ও নানামুখী হিসেব কষে বেশ চতুরতার সাথে ১২ তারিখের দিকে এগুচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়। অপরদিকে বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে জামায়াত ইসলামীও। তারা নানামুখী প্রচার–প্রচারণায় বেশ এগিয়ে রয়েছে। এখন পর্যন্ত মাঠের হিসেবে বিএনপির প্রার্থী এনামুল হক এনামের পর জামায়াত ইসলামীর ডা. মো. ফরিদুল আলম ও ইসলামী ফ্রন্টের এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে প্রচার–প্রচারণা ও ভোটারদের কাছে টানতে নানা কৌশলী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
পাশাপাশি ইনসানিয়াত বিপ্লব প্রার্থী মুহাম্মদ আবু তালেব হেলালী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফরিদুল আলম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ড. বেলাল নুর আজিজি, এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন মাঠে প্রচার–প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) আসনে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে এবার দৃশ্যমান এক ধরনের আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিগত দিনে এই আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। দলটির স্থানীয় নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত কর্মীদের সক্রিয় রাখা হয়েছে। নিয়মিত পথসভা, উঠান বৈঠক এবং গণসংযোগ চলছে।
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি এনামুল হক এনাম। তিনি বিভিন্ন সভায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এছাড়া দলটির একাধিক নেতা মনে করছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা রয়েছে, আর সেই প্রত্যাশা বিএনপির পক্ষে কাজ করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়লে ফল আরও অনুকূলে আসবে বলে তারা মনে করেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সাংগঠনিক শক্তি নয়, ভোটের দিন কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনাও বড় ভূমিকা রাখবে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এবার সেই প্রস্তুতিও নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
তরিক্বত ও সুন্নী আকিদ্বায় বিশ্বাসী ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী সৈয়দ এয়ার মুহাম্মদ পেয়ারু। তিনি এর আগে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ উপজেলায় তরিক্বত ও সুন্নী মতাদর্শীদের রয়েছে একটা আলাদা ভোট ব্যাংক। এছাড়াও গত সরকার পতনের পর এ এলাকায় ৫ হাজারের অধিক ব্যাংকার চাকরিচ্যুত হয়েছিল। চাকরিচ্যুত ব্যাংকারদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করায় এয়ার মুহাম্মদ পেয়ারুর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রকাশ্যে বড় সমাবেশ কম হলেও দলটি নীরবে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে স্থানীয়রা জানান। ইসলামী ফ্রন্ট নেতারা বলছেন, অনেক ভোটার প্রকাশ্যে মত দেন না। কিন্তু ভোটের সময় তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবেন। তাই তারা নিরব ভোট বা সাইলেন্ট ভোটারের ওপর ভরসা রাখছেন। এছাড়া মসজিদভিত্তিক যোগাযোগ, সামাজিক কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তারা ভোটের সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। দলের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাচ্ছেন, পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সুশাসনের কথা তুলে ধরছেন।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি জামায়াত প্রার্থী ডা. মো. ফরিদুল আলম। তিনি প্রচারণায় জোর দিচ্ছেন সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় উন্নয়নের ওপর। প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণের বাইরে থেকে মানুষের কথা বলাই তার লক্ষ্য। বিএনপির ভোটে তার প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিন পর মাঠে বাঁধাহীন প্রচারণা ও কাজ করতে পেরে জামায়াত ও শিবির নেতাকর্মীরাও বেশ উজ্জীবিত।
চট্টগ্রাম–১২ (পটিয়া) আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বললে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, তারা এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না, বাস্তব উন্নয়ন দেখতে চান। চট্টগ্রাম শহরের এতো কাছে হওয়াতেও এখনো এই আসনে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্যাস আসেনি, অনেকেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিন্তু কেউ রক্ষা করেননি। এছাড়া নিরাপদ সড়ক, মানসম্মত হাসপাতাল, সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, কৃষকদের সেচের জন্য রাবার ড্রাম্প স্থাপন, বিনোদন কেন্দ্র, পৌর এলাকায় ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন, কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিল্প কারখানা স্থাপন এই আসনের ভোটারদের প্রধান দাবি।
এই আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হলেও দীর্ঘ ১৬ বছর রাজত্ব করেছে আওয়ামী লীগ। তাই এককভাবে কারও জয় নিশ্চিত বলা কঠিন। তবে বিএনপি শক্ত অবস্থানে থাকলেও নিরব ভোট বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম–১২ এখন অপেক্ষা করছে ভোটের দিনের জন্য। কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে, সেই চূড়ান্ত উত্তর মিলবে ব্যালটের বাঙ খুললেই। একদিকে অভিজ্ঞ রাজনীতিক, অন্যদিকে নতুন মুখের প্রত্যাশা, কোথাও নিরব সমর্থন, কোথাও দৃশ্যমান জনসংযোগ। গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার এই চিত্রই প্রমাণ করে, চট্টগ্রাম–১২ শুধু একটি আসন নয়, এটি মানুষের আশা, প্রত্যাশা আর ভবিষ্যতের প্রতীক।












