প্রাথমিক স্তরে পুনরায় পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তির সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সারাদেশে আলোচনা– সমালোচনা দেখা দিয়েছে। অবশ্য বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে বৈকি! প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষা জীবনের শুরুতেই বাচ্চাদের ভর্তি পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করানো কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আমাদের দেশে শিশুদের সাধারণত ৪ থেকে ৬ বছর বয়সে প্রাথমিক স্তরের সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। এই বয়সের শিশুরা মূলত কথা বলা শেখে, কিছু সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণ করা রপ্ত করে এবং সমবয়সীদের সাথে মিশতে ও খেলতে পছন্দ করে। চারপাশের প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে তাদের পরিচিতি ঘটে। আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে কিছু শিশুকে দৃশ্যত অগ্রসরমান মনে হলেও তাদের মধ্যে মেধার তারতম্য তেমন একটা থাকে না। অনেকের মতে, শিক্ষা জীবনের শুরুতেই ভর্তি পরীক্ষার মত একটি জটিল বিষয়কে চাপিয়ে দেয়া শিশুদের প্রতি একপ্রকার মানসিক উৎপীড়ন। কোমলমতি শিশুদের মেধা বা পূর্বজ্ঞান কোনটাই যাচাইয়ের পর্যায়ে থাকে না। তাই সংক্ষিপ্ত সময়ের একটি পরীক্ষা বা কিছু প্রশ্নোত্তর কখনো একটি শিশুর মেধা নির্ণয়ের মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। ভর্তি পরীক্ষায় বাদ পড়া শিশুদের পরোক্ষভাবে মেধাহীন হিসেবে গণ্য করা হয় যা শিশুর মনোজগতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভর্তিতে অনির্বাচিত শিশুরা অনেক সময় আপনজন কর্তৃক তিরস্কারের শিকার হয় যা তাদের আত্মবিশ্বাসে ভয়ানক চিড় ধরায়। তাছাড়া প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আমাদের দেশে অতীত অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। ভর্তি পরীক্ষা একটি নির্দিষ্ট দিনে ও সংক্ষিপ্ত সময়ে সম্পন্ন হলেও এই যুদ্ধে সামিল হতে ভর্তিচ্ছু প্রতিটি পরিবারের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় বছরখানেক আগে থেকেই। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে কোচিং বাণিজ্য রমরমা হয়ে ওঠে। সন্তানের ভর্তির প্রস্তুতির জন্য অধিকাংশ অভিভাবক নিজেদের উপর ভরসা করতে পারেন না, তাই সম্ভাব্য সেরা প্রস্তুতির লক্ষ্যে শিশু সন্তানকে নিয়ে ছুটেন প্রাইভেট কিংবা কোচিং সেন্টারে, যা শিশু ও তার পরিবারে প্রচণ্ড মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। ভর্তি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন শতভাগ স্বচ্ছ হয় একথা বলার সুযোগ নেই। ডোনেশনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, আর্থিক লেনদেনের মত অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ ব্যাপার। সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি অযাচিত চাপের সৃষ্টি হয়। অনেকের মতে, পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হলে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিশুরা নানাবিধ কারণে প্রত্যাশিত স্কুলে ভর্তির সুযোগ থেকে পিছিয়ে থাকে। ফলে সমতার নীতি বিঘ্নিত হয় এবং বৈষম্যের সূত্রপাত ঘটে।
প্রকৃতপক্ষে শিশুদের মেধা ও চিন্তার জগত কিভাবে বিকশিত হবে তা নির্ভর করে সমাজ ও রাষ্ট্র শিশুদের কি যোগান দিচ্ছে তার উপর। তাই শিশু মেধাবী বা অমেধাবী এটা যাচাই করা বা প্রশ্ন তোলা অবান্তর। যার শিক্ষাজীবনই শুরু হয়নি তার ভর্তি পরীক্ষা একেবারেই অযৌক্তিক। অধিকন্তু বাছাই করা ও অপেক্ষাকৃত অগ্রসরমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের আরো ভালো করার তাড়না বা চ্যালেঞ্জ তুলনামূলক কম থাকে। ভালো মানের স্কুলের অপ্রতুলতা, আর্থসামাজিক বাস্তবতা, কোচিং বাণিজ্য, অর্থের প্রভাব, আর্থিক ও মানসিক চাপসহ সবকিছু বিবেচনায় অন্তত প্রাথমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষার তুলনায় লটারী পদ্ধতি অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। তবে লটারীর মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হলেও এটি একেবারে নিখুঁত পদ্ধতি একথা বলার সুযোগ নেই। লটারী পদ্ধতির দুর্বলতা হলো এটা পুরোটাই ভাগ্যনির্ভর এবং এতে প্রচেষ্টা ও প্রস্তুতির কোন মূল্যায়ন হয় না। লটারীর মাধ্যমে ভর্তি মানসিক সন্তুষ্টি আনে না।
এন্ট্রি লেবেলে বা প্রাথমিক স্তরে লটারী নাকি ভর্তি পরীক্ষা– এ বিষয়টিকে আবেগ বা প্রতিক্রিয়ার জায়গা থেকে না দেখে সমস্যার গভীরে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা বাস্তবতা হলো বৈষম্য। বাংলাদেশের মত এত বহুধা ধারায় বিভক্ত শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষক পৃথিবীতে বিরল। সরকারি– বেসরকারি, গ্রাম–শহর, বাংলা মাধ্যম– ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা শিক্ষা এসবের মধ্যে শিক্ষার মান ও ধরনে রয়েছে ব্যাপক তফাৎ। শিক্ষক ও রয়েছেন সরকারি–বেসরকারি,
এমপিওভুক্ত– ননএমপিওভুক্ত সহ কয়েক প্রকারের এবং তাঁদের বেতন–ভাতা, মর্যাদা ও সুযোগ–সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্যের চিত্র সুস্পষ্ট। মূলত শিক্ষাক্ষেত্রে যুগ যুগ ধরে জিইয়ে রাখা বৈষম্য, শিক্ষায় বাজেট স্বল্পতা, মেধাবী ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, যুগোপযোগী শিক্ষাক্রমের ঘাটতি, কোচিং নির্ভরতা, শিক্ষা বাণিজ্য, তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে দেশে ভালো মানের পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না। ফলে হাতেগোনা যে কয়েকটি মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে তাতে সন্তানকে ভর্তির জন্য অভিভাবকরা মুখিয়ে থাকেন এবং ভর্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
সকল শিশুর জন্য সমান শিক্ষা লাভের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এমতাবস্থায় সবচেয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বিবেচিত হতে পারে যদি প্রাথমিক স্তরে সবার জন্য সমমানের শিক্ষা প্রচলন করা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সকল বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে ভালো মানের শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান ও সুযোগসুবিধা সমমানের কিংবা কাছাকাছি রাখা গেলে ভালো ও মানহীন প্রতিষ্ঠান বলে কোন বিভাজন থাকত না। ফলে ভর্তি পরীক্ষা কিংবা লটারী কোনটির দরকার হত না। প্রতিটি শিশুই বয়স অনুযায়ী নিজ নিজ এলাকার স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেত। এতে শ্রম, সময়, অর্থের অপচয় রোধ করা যেত। শিশু ও অভিভাবকদের উপর অহেতুক মানসিক চাপ তৈরি হত না। চলাচলে ভোগান্তি বা যানজট কম হত। পরীক্ষা কিংবা লটারীকেন্দ্রিক সকল প্রকার অনিয়ম, অসন্তুষ্টি ও বৈষম্যের অবসান ঘটত। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে প্রাথমিক স্তরে ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা এলাকাভিত্তিক ভর্তি অর্থাৎ যে এলাকার শিশু সে এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে অগ্রাধিকার এ নীতি অনুসরণ করা হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ নীতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন মনে হলেও বাস্তবায়ন অসম্ভব কিছু নয়। প্রয়োজন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সদিচ্ছার। বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে ভর্তির ক্ষেত্রে এ ধরনের নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কিছুটা সময়সাপেক্ষ বিধায় সার্বিক বিচারে আপাতত প্রাথমিক স্তরে অর্থাৎ প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লটারী পদ্ধতি চালু রাখা অধিক যুক্তিযুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়।
লেখক: প্রভাষক, নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম।











