প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ও শিক্ষকের অধিকার : বিদ্যমান সংকট ও উত্তরণের পথ

শমসের নেওয়াজ মুক্তা | মঙ্গলবার , ১৭ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি হলো প্রাথমিক শিক্ষা। কিন্তু এই শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন, অপরিকল্পিত কারিকুলাম এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা শিক্ষার গুণগত মানকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রাথমিক শিক্ষার মৌলিক সংস্কার এবং একটি আধুনিক ও মানবিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে নিচের বিষয়গুলোতে জরুরি নজর দেওয়া প্রয়োজন:

. শিক্ষকদের মর্যাদা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা : ​শিক্ষকরা রাষ্ট্র গঠনের কারিগর হলেও বর্তমানে তারা আর্থিক ও সামাজিকভাবে অবমূল্যায়িত।

*​স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো: অন্যান্য ক্যাডার বা স্তরের তুলনায় শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন বন্ধ করতে হবে। তাদের সামাজিক ভূমিকা ও দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি স্বতন্ত্র, সম্মানজনক ও যুগোপযোগী সম্মানী কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে।

* পদোন্নতির সুযোগ: সহকারী শিক্ষক পদকে এন্ট্রি পয়েন্ট ধরে উচ্চতর পদে স্বচ্ছ, দ্রুত ও সময়বদ্ধ পদোন্নতি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

*​নাগরিক সুবিধা: গণপরিবহন (রেল, বাস, এয়ার) এবং চিকিৎসা সেবায় শিক্ষকদের জন্য সংরক্ষিত বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

*তদারকিতে সম্মান: মনিটরিং হতে হবে সহায়ক ও উন্নয়নমুখী। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের প্রতি যেকোনো ধরনের অসম্মানজনক আচরণ বন্ধ করতে হবে।

. অকার্যকর সময়সূচি ও প্রশাসনিক সংস্কার: ​বর্তমান দীর্ঘ সময়সূচী শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের উৎপাদনশীলতা ও সৃজনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। *​সময়সূচী পরিবর্তন: বিদ্যালয়ের সময়সূচী সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা উচিত, যাতে শিশুরা বিকেলে খেলার পর্যাপ্ত সময় পায় এবং শিক্ষকরাও ক্লান্ত না হন।

*​পরিকল্পিত পরিপত্র ও ক্যালেন্ডার: হুটহাট পরিপত্র জারি না করে শিক্ষকদের মতামত নিতে হবে। প্রতি বছর একটি বাধ্যতামূলক শিক্ষা ক্যালেন্ডার প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। *​দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন: শিক্ষক নিয়োগ ও বদলি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।

. পাঠদান বহির্ভূত কাজের বোঝা এবং জনবল সংকট : ​“শিক্ষকের মূল কাজ পাঠদান”এই নীতিটি বর্তমানে কেবল কাগজেকলমেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষকরা বর্তমানে পাঠদান বাদেও প্রায় ৪৫টি রেজিস্টার রক্ষণাবেক্ষণ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কৃমি নাশক ও ভিটামিন ক্যাপসুল খাওয়ানো, টিকা নিবন্ধন, শিশু জরিপ, উপবৃত্তি ও প্রোফাইল তৈরি এবং বিদ্যালয়ের পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা ও ঝাড়ু দেওয়ার মতো কাজ করেন।

করণীয়: শিক্ষকদের এসব কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন অফিস সহকারী/কম্পিউটার অপারেটর ও একজন দপ্তরী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে।

*বার্ষিক স্কুল পরিসংখ্যানের জটিলতা কমিয়ে একে সহজ ও সংক্ষিপ্ত করা প্রয়োজন।

. কারিকুলাম ও মূল্যায়ন কাঠামো সংস্কার: ​পাঠ্যবইয়ের তথ্যের ভার এবং ইতিহাসের বিকৃতি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে।

*​বিকৃতিমুক্ত ইতিহাস: পাঠ্যবই থেকে ভুল ও বিকৃতি অপসারণ করে প্রমাণভিত্তিক ও সঠিক ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

*​শিখনফল ও যোগ্যতার ভার কমানো: শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার আধিক্য এবং শিখনফলের সংখ্যা ও জটিলতা কমিয়ে পাঠ্যক্রমকে সহজবোধ্য ও আনন্দময় করতে হবে।

*​বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ: জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে অথবা দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট বিষয়ে স্কিলড টিচারতৈরি করতে হবে। এতে রুটিনে বা বছরের মাঝামাঝি শিক্ষক পরিবর্তন হওয়ার ফলে দুর্বল শিক্ষার্থীর দায়িত্ব কেউ না নেওয়ার যে প্রবণতা, তা দূর হবে।

. মূল্যায়ন পদ্ধতি ও অভিভাবক সম্পৃক্ততা: ​পরীক্ষা মানেই আতঙ্ক নয়, মূল্যায়ন হতে হবে শেখার সহায়ক।

*​ধারাবাহিক মূল্যায়ন: নম্বরের পরিবর্তে শ্রেণিকাজ ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে ধারাবাহিক মূল্যায়ন চালু করতে হবে। এটি হবে ভয়ভীতিহীন ও বহুমাত্রিক (লিখিত, মৌখিক ও আচরণভিত্তিক)

*​অভিভাবকের সাথে সেতুবন্ধন: কোনো উন্নয়নই অভিভাবকের সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। সারা বছর অভিভাবকদের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত করতে নিয়মিত সমাবেশ ও মিটিং নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার: প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন সম্ভব কেবল তখনই, যখন শিক্ষক সম্মান, কার্যকর প্রশাসন, বাস্তবমুখী কারিকুলাম ও মানবিক মূল্যায়নএই চারটি স্তম্ভ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। সময়োপযোগী সংস্কার এবং শিক্ষকদের পাঠদানে মনোযোগ দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই একটি টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, ফ্লা.লে.কাইমুল হুদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঈদের আনন্দের পথে কত স্বপ্ন যে রাস্তায় থেমে যায়
পরবর্তী নিবন্ধঈদের ছুটিতে গ্রামে শিশুদের সুরক্ষা প্রসঙ্গে