নিরাপত্তার জন্য দেয়া বইমেলার প্রবেশমুখের ‘আর্চওয়ে গেট’–এর কাছাকাছি আসতেই ভিড়ের জন্য হাঁটার গতি কমিয়ে দিতে হয়। অবশ্য শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোডের সাথে লাগানো চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামের গেট থেকে বইমেলার প্রবেশমুখ পর্যন্ত পুরোটায় মানুষের জন্য হাঁটা যাচ্ছিল না। প্রবেশ পথে মানুষের জটলা দেখেই আন্দাজ করা যায়, জমে উঠেছে বইমেলা। যা স্বীকার করেছেন প্রকাশকরাও।
নগরের কাজীর দেউড়ির চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেশিয়াম মাঠে চলছে ১৯দিন ব্যাপি স্বাধীনতা বইমেলা। গতকাল শুক্রবার ছিল মেলার চতুর্থ দিন। প্রথম তিনদিন পাঠক–দর্শনার্থীর উপস্থিতি ছিল একেবারে কম। বেচাকেনা নিয়েও হতাশ ছিলেন প্রকাশকরা। কিন্তু গতকালকের চিত্র ছিল একেবারে ভিন্ন। কর্মব্যস্ততাহীন এ বন্ধের দিনে বইপ্রেমীরা ছুটে আসেন মেলায়। কিনেছেনও তারা। ফলে চতুর্থ দিনে এসে প্রাণ ফিরে বইমেলায়।
চট্টগ্রামে এ বছর বইমেলা হবে কিনা সেটা নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা ছিল। শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ের দুই মাস পর মেলা শুরু হলেও তা জমবে কিনা সেটা নিয়ে ছিল সংশয়। কিন্তু চতুর্থ দিনে এসে বইমেলা তার স্বরূপে ফিরেছে। পাঠক, লেখক ও দর্শনার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রকাশকের ঠোঁটের কোণে এনেছে হাসি।
গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে শিশু প্রকাশ–এর স্টলে উপস্থিত হয়ে ভিড় দেখা গেছে। শিশু–কিশোরদের উপজীব্য বিভিন্ন গ্রন্থ সাজিয়ে রাখা হয়েছে এ স্টলে। এখানে কথা হয় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইমদাদের সাথে। তিনি বলেন, প্রতিবছর বইমেলায় আসি। এ বছর আজকেই প্রথম আসলাম। দেরিতে হলেও বইমেলা শুরু হয়েছে, ভালো লাগছে। তিনি তার ছয় বছরের মেয়ের জন্য দুটি ছড়ার বই কিনেছেন বলেও জানান।
শিশুপ্রকাশের স্বত্তাধিকারী আরিফ রায়হান আজাদীকে বলেন, প্রথম দুইদিন লোকজনের উপস্থিতি তেমন ছিল না। সে তুলনায় আজ (গতকাল শুক্রবার) উপস্থিতি বেশি। বেচাকেনাও টুকটাক হচ্ছে। তিনি জানান, শিশুপ্রকাশ থেকে ১২টি বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে– সুজন বড়ুয়ার অনুবাদগ্রন্থ সিংহ হৃদয় ভাতৃদ্বয়, সুকুমার বড়ুয়ার নির্বাচিত শিশুসাহিত্য ও সোহেল মল্লিকের নির্বাচিত ছড়া সাহিত্য।
পটিয়া থেকে গতকাল মেলায় আসেন মনসুর–শারমীন দম্পতি। সঙ্গে ছিলেন তাদের একমাত্র মেয়ে ইউশরা। মনসুর আজাদীকে জানান, তিনি স্কুল শিক্ষক। তার স্ত্রীও শিক্ষকতা করেন। দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় এতদিন বইমেলায় আসার সুযোগ পাননি। তাই বন্ধের দিনে এসেছেন। কিনেছেন বইও।
এবারের মেলার পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, গত কয়েক বছর জিমনেশিয়াম মাঠে অনুষ্ঠিত সবকটি মেলায় এসেছেন তিনি। এবার মেলার সামগ্রিক পরিবেশ ভালো। তবে স্টলের সারির মাঝখানে যে পথ রাখা হয়েছে সেখানে পর্যাপ্ত আলো নেই। অনেকগুলো স্টলেও আলোর স্বল্পতা রয়েছে। এ বিষয়ে মেলার আয়োজকদের নজর দেয়া উচিত।
এদিকে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, এবারের বইমেলায় প্রচুর নতুন বই এসেছে। গতকাল নতুন আসা বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কথাসাহিত্যিক জাহেদ মোতালেব–এর ‘মানুষখানা’। প্রিন্টপুকুর থেকে প্রকাশিত উপন্যাসটি পাওয়া যাচ্ছে দ্বিমত ও চন্দ্রবিন্দুর স্টলে। এছাড়া স্বাধীন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে চারটি বই। শৈলী প্রকাশন থেকে বেরিয়েছে গল্প, কবিতাসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির ২৯টি বই। আবির প্রকাশন–এ নতুন বইয়ের পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে তাদের প্রকাশিত পুরনো বই। এর মধ্যে আড়াই দশক আগে প্রকাশিত প্রেমের কবিতা সংকলন নিয়ে আগ্রহ দেখা গেছে পাঠকদের মাঝে।
গতকাল মেলায় বেশিরভাগ প্রকাশক বিক্রি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা বললেও অনেকে বেচাকেনা প্রত্যাশা অনুয়ায়ী না হওয়ার কথাও বলেছেন। আপন আলো প্রকাশনার স্বত্ত্বাধিকারী ড. শামসুদ্দীন শিশির আজাদীকে বলেন, মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে আজকেই প্রথম পাঠক, লেখক ও দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। বন্ধের দিন হওয়ায় লোকজন মেলায় আসছেন। বিগত বছরগুলোতেও সাপ্তাহিক ছুটির বা অন্যান্য বন্ধের দিন মেলায় লোকজনের উপস্থিতি বেশি ছিল। অবশ্য লোকজন বাড়লেও বেচাকেনা আশানুরূপ হচ্ছে না। এরপরও আমরা আশাবাদী, যেহেতু মেলা শেষ হতে আরো দুই সপ্তাহ আছে। আসলে ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলার আবেদন বেশি থাকে, এ বছর মার্চে হওয়ায় পাঠকরা হয়তো ওভাবে ফিলটা পাচ্ছে না। তবে যারা প্রকৃত পাঠক তাদের কাছে মেলা কোন সময়ে হচ্ছে সেটা ফ্যাক্টর না। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের দুই মাস পর মেলা শুরু হলেও আয়োজক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আন্তরিকতার কমতি নেই। ফেব্রুয়ারিতে যেভাবে তারা সবধরনের সার্পোট দিত এবারও তেমনটি দিচ্ছে।
ঢাকা থেকে আসা কথাপ্রকাশ এর বিক্রয়কর্মী রাজু বলেন, মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে আজকেই সর্বোচ্চ উপস্থিতি। তবে যারা আসছেন তাদের ১০ ভাগও পাঠক না, ক্রেতা তো অনেক দূরে। বেচাবিক্রি খুব কম। তিনি বলেন, ঢাকায় মেলা হয়েছে রমজান মাসে, মানুষ ঈদের কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল, এরপরও দৈনিক যে পরিমাণে বেচাকেনা হয়েছে সে তুলনায় চট্টগ্রামে খুব কম হচ্ছে। অবশ্য এর একটা কারণ হতে পারে এবছর চট্টগ্রামে বইমেলা হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। ২০১৯ সাল থেকে চট্টগ্রামের প্রতিটি বইমেলায় অংশ নিয়েছি। ওই হিসেবে আমাদের কিছু নির্দিষ্ট পাঠক আছেন। এর মধ্যে যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তারা বলেছেন, চট্টগ্রামে বইমেলা হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় তারা বিভিন্ন মাধ্যমে বই সংগ্রহ করে ফেলেছেন।
উল্লেখ্য, মেলা শেষ হবে ১৮ এপ্রিল। এবারের বইমেলায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার ৯৬টি প্রকাশনা সংস্থার ১৩১টি স্টল রয়েছে। মেলা প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা ও ছুটির দিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ বইমেলার আয়োজক চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। তবে চট্টগ্রামের সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ, নাগরিক সমাজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য শিল্প–সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরাই সম্মিলিতভাবে এ মেলা বাস্তবায়ন করছেন।













