প্রবাহ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ৮ এপ্রিল, ২০২৬ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৬ মে হজ। প্রায় ৮০ হাজার নরনারী বাংলাদেশ থেকে হজ করতে যাবেন। এই সফর কম বেশি ৪০ দিনব্যাপী হবে। সমস্ত হজযাত্রী দেশে ফেরার আগেই ওমরায় গমন শুরু হয়ে যায়। ওমরাহ এর প্যাকেজ কম বেশি ১৫ দিনব্যাপী। সর্বনিম্ন খরচ হয়ত সোয়া লাখ টাকা। সারা বছরব্যাপী ওমরায় গমন চলমান থাকবে ২০২৭ সালের হজযাত্রী গমন না হওয়া পর্যন্ত। বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ওমরাহ করতে যাবেন। হজের সফর ফরজ এবাদতের সফর। ওমরাহ এর সফর সুন্নত এবাদতের সফর। উভয়ই সফর ধর্মীয়। ঘর থেকে রওনা হয়ে ঘরে না ফেরা পর্যন্ত এবাদতের মধ্যে গণ্য।

আমরা যে রকম ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদে যাই, মসজিদ থেকে আবার ঘরে না ফেরা পর্যন্ত পুরো ১ ঘণ্টা বা কম বেশি সময় এবাদতের মধ্যে গণ্য হবে।

বিগত মাত্র ৪০/৫০ বছরের ব্যবধানে হজ ও ওমরাহ এর ক্ষেত্রে পরিবেশ অবস্থান ভিন্নরূপ ধারণ করেছে। হয়ত ঘর থেকে বের হয়ে আধুনিক সুযোগসুবিধার বিমান বন্দর, বিমানের আরামদায়ক সিটে বসে মাত্র ৬ ঘণ্টা বা কম বেশি সময়ে জেদ্দা বা পবিত্র মদিনা বিমান বন্দরে গমন। আকাশে বিমানের ভিতর দু’বার করে উন্নত মানের খাবার এইসব কিছু আগে ছিল না। জেদ্দা বা পবিত্র মদিনা বিমান বন্দর পৌঁছে বাসে হোটেলে পৌঁছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অবস্থান, কাফেলা কর্তৃক সরবরাহকৃত তিনবেলা খাবার হোটেলে পৌঁছে দেয়া এইসব কিছু মাত্র ৩০/৪০ বছরে ব্যবধানে চলমান। হজপালন ৪০ দিনের সফর। কিন্তু মূল হজপালন হবে ৫ দিনব্যাপী। বাকী ৩৫ দিন বা কম বেশি সময় এবাদত করার জন্য।

তেমনি ওমরাহ এর সফর ১৫ দিন বা কম বেশি। কিন্তু পবিত্র মক্কায় পৌঁছে ওমরাহ পালন করতে সময় লাগবে মাত্র ৩ ঘণ্টা বা কম বেশি। বাকী ১৪ দিন ২১ ঘণ্টা বা কম বেশি সময় এবাদতে কাটানোর জন্য। অর্থ ব্যয় করে হজ বা ওমরায় যাওয়া হয়। পরকালে নাজাত পেতে মহান আল্লাহপাককে খুশি করতে। কিন্তু হজ ও ওমরাহ এর ক্ষেত্রে একালে বাস্তবতা কি এসে দাঁড়ায়:

. হালাল টাকা:- হজ বা ওমরাহ এর সফরের খরচ হালাল টাকা হতে হবে। একালে হাজারে কয়জনের টাকা হালাল ভাবতে হবে। আমার শরীরে যে কাপড় আছে তা হালাল টাকায় কিনা। আমি যে দৈনিক খাবার খাচ্ছি এই খাবার হালাল টাকায় ক্রয় কিনা। আমি যে নিকটাত্মীয় বন্ধুবান্ধবের অনুষ্ঠানে গিয়ে খাবার খাচ্ছি ঐ ব্যক্তির খাবার হালাল টাকায় কিনা, আমি কি একবারও চিন্তা করি। যদি হালাল না হয় তাহলে আমি দাওয়াতে উপস্থিত থাকব কিন্তু খাব না।

যদি আমার হজ ও ওমরাহ এর টাকা শত ভাগ হালাল না হয় তাহলে এই হজ ও ওমরাহ এর সফর বৃথা।

. হজ বা ওমরাহ ধর্মীয় সফর:- ৪০ দিন বা ১৫ দিনের এই সফরে আমরা ধর্মীয় নিয়ম নীতি তথা দু’হারমের সম্মান কতটুকু রক্ষা করতেছি। সহযাত্রীর সাথে ঝগড়া, হাসি টাট্টা এসব কিছু অতি সাধারণ ব্যাপার। আমাদের মধ্যে কি এসব নিয়ে ভাবাবেক কাজ করতেছে!

. স্মার্টফোন/এন্ড্রয়েড ফোন:- বর্তমানে হজ বা ওমরাহ যাত্রীর শতে ৯০ জনের সাথে এই ফোনটা থাকবে। যোগাযোগের জন্য, জরুরী খবরাখবরের জন্য ফোন দরকার। কিন্তু আমরা এই ফোন কিভাবে ব্যবহার করতেছি। পবিত্র নগরীর হোটেল কক্ষে বসে এই ফোন ঘাটাঘাটি করতেছি। স্ত্রী পরিজন, বন্ধুবান্ধবের সাথে ফোনে আলাপ করে সফর উপভোগ করতেছি। ধর্মীয় আমল পালন তাওয়াফ, সায়ী, পবিত্র রওজাপাকে সালাম পেশ করতে ভিডিও করে করে দেশে পাঠাচ্ছি। মোবাইলের ভিতর স্ত্রী, বোন বা অন্য মহিলার ছবি পেছনে এবাদতকারীরা দেখতেছেন। তা মনে হয় আমাদের খবর নেই বেমালুম।

. দু’হারমে নামাজ:- আমাদের হজ বা ওমরাহ সফরের অবস্থান হবে দু’হারমের একদম নিকটে। পায়ে হেঁটে উভয় হেরমে যাওয়া যাবে। অনেকে দৈনিক তিন বার অনেকে দৈনিক চার বার যায়। তিন বার বলতে আসর মাগরিব এশা এক সাথে পরপর পড়া। চার বার বলতে মাগরিব এশা একই গমনে পড়া। বাস্তবতায় আমরা দুই হারমে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার ব্যাপারে কতটুকু সচেতন।

. সহাবস্থান:- আমরা হজ বা ওমরায় যাই কাফেলা এজেন্সীর মাধ্যমে। সরকারীভাবে হজযাত্রী খুবই কম ৫/৬ হাজার মত। আমরা বিমান বন্দরে, বিমানে উঠতে, বিমান থেকে নামতে, বিমান বন্দরে বাসে উঠতে বা বাস থেকে নামতে, আমরা কি সহযাত্রীর সাথে কটুকথা বলতেছি। আমরা কি কাফেলা এজেন্সী বা তাদের স্টাফদের সাথে বিভিন্ন অজুহাতে তর্কে জড়াচ্ছি। ৫ দিন ব্যাপী হজ পালনে মিনা গমনকালে, মিনায় অবস্থানকালে, মিনা থেকে আরাফাতে গমনকালে, আরাফাতে অবস্থানকালে, আরাফাত থেকে মুজদালেফায় গমনকালে পুনঃ মিনায় অবস্থানকালে আমরা কি সহযাত্রীর সাথে বা অন্য হজযাত্রীর সাথে অথবা কাফেলা এজেন্সীর লোকজনের সাথে রুঢ় ব্যবহার করতেছি, তর্কে জড়াচ্ছি। এসব নিয়ে ভাবতে হবে।

. পবিত্র সফরে ফরজ নামাজ কাজা করা:- আগেই উল্লেখ করেছি ওমরাহ এর সফর সুন্নত, হজ ফরজ এবাদতের সফর। বছরে মাত্র একবারই হজ। একজন মানুষ যদি ৮৫ বছর বয়স পায় এবং প্রতি বছর হজ পালন করে হয়ত সর্বোচ্চ ৭০ বছরে ৭০ বার হজ পালন করতে পারে (বালক অবস্থায়)। ৭০ বছরের ৭০ হজ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে এক ওয়াক্ত নামাজের সমান হবে না। কিন্তু হজ বা ওমরাহ এর সফরে ৫ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা হচ্ছে না এ রকম হজযাত্রীর সংখ্যা খুবই কম। হয়ত ঘর থেকে বিমান বন্দরে যেতে নামাজের খবর নেই। অথবা বিমান বন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে, অথবা বিমানের ভিতর ওযু না থাকা, জেদ্দা বা পবিত্র মদিনা বন্দরে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে অথবা মোয়াল্লেম বাসে হোটেলে পৌঁছতে অথবা পবিত্র মক্কা থেকে পবিত্র মদিনা বা পবিত্র মদিনা থেকে পবিত্র মক্কা বা জেদ্দা আসতে মোয়াল্লেম বাসে অথবা সফরের পর দেশে ফিরতে। কোন না কোন স্থানে বা কোন না কোনভাবে হজ বা ওমরাহ যাত্রীদের নামাজ ওয়াক্ত মত পড়া হয় না। নামাজ কাজা না হতে প্রবল ইচ্ছা শক্তির উপর নির্ভর করে। সেই জন্য থাকতে হবে অতীব সাবধানতায়। তেমনিভাবে টয়লেটে না যেতে বা ওযু রাখতে মুখকে তথা খাবার খেতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তবেই নামাজ কাজা হবে না আশা করি।

. দু’হারমে অবস্থান:- হজ বা ওমরাহকারীরা অবস্থান করেন দুই পবিত্র নগরীতে। ইহাকে হারম বলে। হারম অর্থ পবিত্র। পবিত্র কাবার হারমের সীমানা হযরত জিব্রাইল (.)’র সহযোগিতায় হযরত ইব্রাহীম (.)’র মাধ্যমে নির্ধারিত। পরবর্তীতে আল্লাহর রসূল (.) আরও অনেক দূরত্বে পবিত্র কাবার পাঁচটি মিকাত নির্ধারণ করে দেন। অপরদিকে আল্লাহর রসূল (.) পবিত্র মদিনায় হিযরত করার পর ইয়াসরিব নাম দেন মদিনা। এই পবিত্র মদিনার চারদিকে সীমানা নির্ধারণ করে দেন। হজ বা ওমরাহকারীরা দু’পবিত্র নগরীর হুদুদে হারম বা হারমের সীমানার ভিতর অবস্থান করবে তা অনেকটা নিশ্চিত। আল্লাহর রসূল (.)’র পরবর্তী মহান সাহাবাগণ তাবেয়ীগণ তবে তাবেয়ীগণ ইমাম সুফি দরবেশগণ যেহারে হুদুদে হারমের প্রতি সম্মান দেখিয়ে গেছেন তা ভাববার বিষয়। একালে আমরা হজ বা ওমরাহ করতে পাচ্ছি। আমাদের দ্বারা যাতে দু’হারমের হোটেলে অবস্থান করে যে কোন প্রকারের যাতে ন্যূনতম পবিত্রতা লঙ্গিত না হয়।

চট্টগ্রামে রয়েছে হজ্বযাত্রী কল্যাণ পরিষদ। ইহা কোন কাফেলা এজেন্সী নয়। বিগত প্রায় ২০ বছর যাবৎ হজ ও ওমরাহকারীগণের কল্যাণে সাওয়াবের নিয়তে খেদমত করে আসেছে নিজেদের অর্থ খরচ করে।

প্রতি বছর রমজানের পর হজ ফ্লাইট ছাড়ার আগে হজ ও ওমরাহযাত্রীর প্রশিক্ষণ হয়ে আসছে। সেই মতে আগামী ১১ এপ্রিল শনিবার ঠিক সকাল ৯ টা হতে প্রজেক্টরের মাধ্যমে হজ ও ওমরাহযাত্রীর প্রশিক্ষণের আয়োজন হচ্ছে। তা হবে চট্টগ্রাম মহানগরীর স্টেশন রোডস্থ বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল সৈকতের হল রুমে। বিনা ফিতে সকল নারীপুরুষ হজ ও ওমরাহকারীকে প্রজেক্টরের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রয়োজনে যোগাযোগ: ০১৭১৩১১৫৬০১

পরিশেষে বলতে চাই, মাত্র ৪০/৫০ বছর বা তারও আগে মুসলমানগণ অতীব কষ্ট স্বীকার করে হজ করতে গেছেন, দুই পবিত্র নগরীতে অবস্থান করেছেন। কিন্তু একালে আমরা অতি আরামদায়কভাবে হজ বা ওমরাহ পালন করতে যাচ্ছি। শুধু মাত্র পরকালের কল্যাণের নিয়তে। যাতে আমাদের এই হজ বা ওমরাহ এর সফরের দ্বারা পরকালে কল্যাণ সাধিত হয় সেই বিষয়ে অতীব সজাগ থাকতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমানসিক বাধা জয় করলেই বাইরের সব লড়াই সহজ হয়ে যায়
পরবর্তী নিবন্ধবসবে খুশির মেলা