মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআন মজীদে হজ ও ওমরাহ গুরুত্বের কথা বলে গেছেন। আল্লাহর রসূল (স.) ও হজ এবং ওমরাহ এর কথা বলেন যা হাদীস শরীফে উল্লেখ করা আছে। তবে হজ তিন শর্তে ফরজ, ওমরাহ সুন্নত। এই তিন শর্ত হল পবিত্র মক্কা পৌঁছতে পারা নিয়ে। যদি কেউ একালে হজ না করে শুধু ওমরাহ করতে পবিত্র মক্কায় পৌঁছে যায়, তখন তাঁর উপর হজ ফরজ হয়ে যাবে।
হজ ফরজ হতে তিন শর্ত বলতে পবিত্র মক্কায় পৌঁছতে পারা। যথা–১. শারীরিক সক্ষমতা ২. আর্থিক সক্ষমতা ৩. পবিত্র মক্কা পৌঁছতে যাতায়াত অনুকূল থাকা। অতএব হজ না করে ওমরাহ নিয়তে পবিত্র মক্কা পৌঁছে গেলে তাঁর উপর হজ ফরজ হিসেবে বর্তায়। হজ ও ওমরাহ এর সফর এবাদতের সফর ধর্মীয় সফর। এই দুই সফরের পবিত্রতা রক্ষা করা চায়।
হজ না করে ওমরাহ করতে যাওয়া নিয়ে একালে ধর্মীয় জগতে মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পবিত্র কোরআন মজীদ ও হাদীস শরীফে ওমরাহ এর গুরুত্বের কথা উল্লেখ থাকলেও আজ থেকে মাত্র ৫০/৬০ বছর আগেও ওমরাহ করার প্রবণতা ছিল না। অর্থাৎ ইসলামের প্রারম্ভ থেকে ১৩৬০–৭০ বছর ওমরাহ করার প্রবণতা ছিল না বললেই চলে। এর মূলে যোগাযোগ প্রতিকূলতা। যোগাযোগ প্রতিকূলতায় মুসলমানেরা শুধুমাত্র হজ করাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছিলেন।
এ দীর্ঘ সময় মাত্র ১ লাখ বা কম বেশি মানুষ হজ করতেন বলা চলে। পবিত্র মক্কা থেকে পবিত্র মদিনার দূরত্ব ৪২৫ কি.মি। মুলকে শাম এবং তুরস্ক, ইউরোপ, আফ্রিকা মহাদেশ থেকে সড়কপথে পবিত্র মদিনা আসবেন অতঃপর পবিত্র মক্কা যাবেন। অপরদিকে ভারতবর্ষ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এ সকল দেশ থেকে পবিত্র মক্কা হয়ে পবিত্র মদিনা গমন। উম্মতে মুহাম্মদী হজ ও ওমরাহ এর সফরে পবিত্র মদিনা গমনকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। পবিত্র মদিনা গমন রওজাপাকে সালাম পেশ করা বিষয়ে রয়েছে একাধিক হাদীস শরীফ। যদিওবা আহলে হাদীস তথা সালাফী মতাদর্শ এই সব হাদীস শরীফকে গ্রহণ করতে চায় না।
হজ একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ সংকল্প করা, নিয়ত করা, গমন করা, দর্শন করা, ইচ্ছা করা, প্রতিজ্ঞা করাসহ কোন মহৎ কাজের ইচ্ছা করা।
তবে শরীয়তের পরিভাষায় নির্দিষ্ট দিনে নিয়তসহ এহরামরত অবস্থায় আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা অতঃপর খানায়ে কাবা তাওয়াফ করা।
হজের উপর আরও একাধিক মত রয়েছে। তৎমধ্যে অন্যতম একটি হল জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ এহরাম অবস্থায় আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হওয়া, অবস্থান করা। অতঃপর খানায়ে কাবা তাওয়াফ করা।
নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে স্থানসমূহ যেয়ারত করাই হল হজ।
বর্ণনায় এও রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের লক্ষে নির্ধারিত সময়ে মক্কা মোকাররমায় গমন করে, নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কাজ করাকে হজ বলে।
ঈমানের পর হজ ইসলামের অন্যতম রোকন এবং ৪র্থ স্তম্ভ ইহা একটি ফরজ ইবাদত। হজের গুরুত্ব যেমনি অপরিসীম তেমনি ফজিলতও সীমাহীন। বিশ্বের বুকে যত নেক আমল রয়েছে তৎমধ্যে হজ অন্যতম। যেহেতু দূর–দূরান্ত থেকে কষ্টসাধ্য সফর করে নির্দিষ্ট সময়ে মক্কা মোকাররমা পৌঁছাতে হবে এবং ৫/৬ দিনব্যাপী মক্কা মোকাররমা কেন্দ্রিক ১৬ বর্গ কি.মি এর মধ্যে ৩ স্থানে গমন করতে হবে। অবস্থান করতে হবে, প্রত্যাবর্তন করতে হবে যা কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। ফলে মহান আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির লক্ষ্যে হজ পালনকারীকে নিষ্পাপ নবজাতকের ন্যায় উল্লেখ করা হয়েছে। কবুল হজের পুরস্কার পরকালে নাজাত বেহেস্ত। হজ্ব পালনকারীর জন্য রয়েছে পৃথক ফজিলত ও মর্তবা।
হজ এমন একটি ইবাদত, যার মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম একত্রিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে।
হজের মধ্যে শারীরিক ইবাদত বেশী, যা কষ্টসাধ্য। ফলে হজের বিভিন্ন আহকামে বলা হয় “ফায়াচ্ছির হু লি” অর্থাৎ আল্লাহ আমাকে সহজ করে দাও, যা অন্য ইবাদতে উল্লেখ নেই।
হজ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক বলেন,“নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম গৃহ যা মানবমন্ডলীর জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তা ঐ ঘর যা মক্কায় অবস্থিত। এটি বরকতময় ও বিশ্ববাসীর জন্য পথপ্রদর্শক। তার মধ্যে প্রকাশ্যে নির্দশনসমূহ বিদ্যমান, মকামে ইব্রাহীম উক্ত নির্দশনসমূহের অন্যতম। আর যে ব্যক্তি এর মধ্যে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা লাভ করে। আর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এই গৃহের হজ করা সেসব মানুষের অবশ্য কর্তব্য যারা শারীরিক ও আর্থিকভাবে ঐ পথ অতিক্রমে সামর্থ্যবান। আর যদি কেউ অস্বীকার করে তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র বিশ্ববাসী হতে মুখাপেক্ষীহীন।” (সূরা আল–ইমরান, আয়াত ৯৬–৯৭)
মহান আল্লাহ পাক আরও বলেন,“আর স্মরণ কর, যখন আমি ইব্রাহীমের (আ.) জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম কাবাগৃহের স্থান। তখন বলেছিলাম আমার সাথে কোন শরীক স্থির করবে না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রেখ তাদের জন্য যারা তাওয়াফ করে, যারা দাঁড়ায়, রুকু করে এবং সিজদা করে।” (সূরা আল হজ্ব, আয়াত ২৬)
মহান রাব্বুল আলামীন অন্যত্র বলেন,“ আর মানুষের নিকট হজের ঘোষণা দাও। তারা তোমার নিকট আসবে পদব্রেজে ও সকল প্রকার ক্ষীণকায় উষ্ট্রসমূহের পিঠে, তারা আসবে দূর–দূরান্তর পথ অতিক্রম করে। যাতে তাঁরা তাদের কল্যাণের জন্য উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিযক হিসাবে দান করেছেন তার কারণে নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা হতে ভক্ষণ কর এবং দুস্থ অভাবগ্রস্তদেরকে আহার করাও। অতঃপর তারা যেন তাদের পরিচ্ছন্নতা দূর করে তাদের মানত পূরণ করে এবং তাওয়াফ করে প্রাচীন গৃহের (কাবার)। এটাই বিধান, আর যে ব্যক্তি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত পবিত্র অনুষ্ঠানগুলির সম্মান করল তার জন্য সেটি তার প্রতিপালকের নিকট উত্তম।” (সূরা আল হজ, আয়াত:২৭–৩০)
আল্লাহ পাক আরও বলেন,“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নির্দশনসমূহের অন্তর্গত। অতএব যে ব্যক্তি এই গৃহের হজ এবং উমরাহ করে তার জন্য এতদুভয়ের (সাফা–মারওয়া) প্রদক্ষিণ করা দোষনীয় নয়। কোন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সৎকর্ম করলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ গুণগ্রাহী, সর্বজ্ঞানী। ( সূরা আল–বাকারাহ, আয়াত ১৫৮)
রহজের গুরুত্ব দিয়ে হাদীসে হযরত আবু উমামাহ (র.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (স.) ইরশাদ করেন, কোন ব্যক্তি যাকে বাহ্যিক কোন প্রয়োজন কিংবা অত্যাচারী শাসক অথবা দুরারোগ্য ব্যাধি হজ পালনে বাধা দেয়নি, অতঃপর সে মৃত্যুবরণ করল অথচ হজ সম্পাদন করেনি, তার মৃত্যু ইয়াহুদি অথবা নাছারা অবস্থায় হউক। (সুনানু দারেমী)
রহযরত আবু হুরায়রা (র.) হতে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রসূল (স.) আরও এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব সম্পাদন করল এবং এ সময়ে কোন অশ্লীল কথা কিংবা গুনাহের কাজে লিপ্ত হল না, সে সদ্যজাত সন্তানের ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে প্রত্যাবর্তন করল। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
রহযরত আবু হুরায়রা (র.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসূল (স.) হতে বর্ণনা করেন, হজ ও ওমরাহ পালনকারী আল্লাহর প্রতিনিধি। তাঁরা আল্লাহর নিকট দোয়া করলে তা কবুল হয় এবং তাঁরা আল্লাহর নিকট মাগফিরাত কামনা করলে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। (সুনানু ইবনে মাজাহ)
রআল্লাহর রসূল (স.) আরও ইরশাদ করেন, ‘যে আমার কবর যেয়ারত করবে তাঁর জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হবে।’
রআল্লাহর রসূল (স.) আরও বলেন,‘আমার তিরোধানের পর যে হজ করতঃ আমার কবর যেয়ারতে আসবে, সে যেন জীবিত অবস্থায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করল।’
রআল্লাহর রসূল (স.) আরও ইরশাদ করেন, যে হজ করল অথচ আমার যেয়ারত করল না সে আমার সঙ্গে বেয়াদবী করল এবং অবাধ্য রইল। আল্লাহর রসূল (স.) আরও বলেন,‘যে আমার যেয়ারত করবে সে কেয়ামতের দিন আমার পড়শী হয়ে থাকবে।’
রআল্লাহর রসূল (স.) আরও ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমার মসজিদে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ ধারাবাহিকভাবে (মাঝখানে কোন ওয়াক্ত বাদ না দিয়ে) পড়বে তাকে আখেরাতে জাহান্নামের আজাব হতে এবং দুনিয়াতে মুনাফেকী নামক ব্যাধি হতে মুক্তি দেয়া হবে।’
উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে প্রত্যেক মুসলমান নর–নারী হজ ও যেয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করতে উদগ্রীব থাকেন। জীবনে মাত্র একবার হজ করা ফরজ হলেও মুসলমানগণ একাধিকবার যেতে আগ্রহী থাকেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।













