প্রবাহ

জুমায়-আকদে-জানাযায় বিব্রতকর পরিবেশ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ৪ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ

দেশে মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে গিয়ে, কোন মসজিদে আকদে যোগদান করতে গিয়ে, কোন মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়তে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যা মনে হয় না গত ৩০/৪০ বছর আগে ছিল। দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেক কিছুতে পরিবর্তন এসে গেছে। তেমনি ধর্মীয় এই তিন বিষয়ে পরিবর্তনে বিব্রতকর বিরক্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যথা

. জুমার নামাজ: সপ্তাহে একদিন জুমার নামাজ। যা যোহর নামাজের স্থলে জুমা। এতে সম্মানিত খতিব সাহেব জুমার আগে নসীহত করার রেওয়াজ শুরু হয়ে গেছে মনে হয় বিগত ৩০/৪০ বছর থেকে। তার আগে এই রেওয়াজ তেমন ছিল মনে হয় না। মানুষ আজানের আগে পরে মসজিদে আসা শুরু করে। নানান নফল সুন্নাত এবাদতে সময় কাটান। বিশেষ করে দোয়াদরূদ পড়া, নফল নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা ইত্যাদি। ঐ সময় জনসংখ্যা কম ছিল। মসজিদ ছিল ছোট। মাইক সিস্টেমও ছিল অনেকটা দুর্বল। এখন হালালহারাম পার্থক্য না করে যেন তেন টাকা দিয়ে মসজিদ পুনঃ নির্মাণ করা হচ্ছে। উন্নত মানের মাইক তথা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। খতিব সাহেবেরও মন চাচ্ছে কিছু নসিহত করতে। এতে নামাজীদের অন্যান্য এবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। নসিহত যে পুণ্যের বিষয় এতে ইতস্ততা নেই।

আওলাদে রসূল হযরত সৈয়দ আবদুল করিম মাদানী ১৯৫০ সালে চট্টগ্রাম আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৬৮ সালের ১৬ জানুয়ারী ১৫ শাওয়াল ইন্তেকাল করলে তাঁর লাশ পাকিস্তান সরকারের সহায়তায় পবিত্র মদিনায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। তথায় জান্নাতুল বাকীতে তাঁর দাফন হয়। অতঃপর খতিবের দায়িত্বে হযরত সৈয়দ আবদুল আহাদ আল মাদানী (রহ.)। আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের সভাপতি থাকতেন পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক। কমিটির সেক্রেটারী ছিলেন শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ এ.এ রেজাউল করিম চৌধুরী। সম্মানিত খতিবের খোতবা বাংলা অনুবাদ ছাপিয়ে নামাজীগণের মধ্যে বিতরণ করা হত। অধ্যক্ষ এ.এ রেজাউল করিম চৌধুরী খোতবা শুরুর আগে ৫/৭ মিনিট সর্বোচ্চ ৮/১০ মিনিট সময় নিয়ে খোতবার এই অনুবাদ মাইকে নামাজীগণের মধ্যে পড়ে শুনাতেন। এই সিস্টেম বাংলাদেশে প্রায় মসজিদে চালু হোক তথা প্রত্যাশা রাখি। হযরত সৈয়দ আবদুল আহাদ আল মাদানী ১৯৯৫ সালে ইন্তেকাল করেন। মনে হয় না এর আগে খতিব সাহেবের দেশের মসজিদগুলোতে নসিহত করার ব্যাপক প্রচলন ছিল।

খোতবা আরবীতে, তাঁর বাংলা অনুবাদ নামাজীরা জানা দরকার। এতে সময় দরকার সর্বোচ্চ ৭/৮ অথবা ১০ মিনিট। এন্ড্রয়েড তথা স্মার্টফোন বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় ২০০৮ সালে। বাংলাদেশে ব্যাপক প্রচলন হতে থাকে ২০১৪ সাল থেকে। দেশের ভাগাভাগা আলেমদের নসিহত এখানে শুনতে পাওয়া যায়। তা যে কোন মতাদর্শের আলেমদের নসিহত শুনতে আর কোন অসুবিধা হচ্ছে না। ইচ্ছা করলে আরবির পাশাপাশি ইংরেজি, উর্দু ভাষায়ও নসিহত শুনতে পারা যাচ্ছে। নসিহত মানবের কল্যাণ তাতে ইতস্ততা নেই। মানুষ শুক্রবার মসজিদে যায় জুমা পড়তে। মসজিদ কোন মাদ্রাসা বা ওয়াজ মাহফিল নয়। জুমার আগে আরবি খোতবার সারসংক্ষেপ জানিয়ে দেয়া আবশ্যক। সময়টা কম নেয়া উত্তম মনে করি। যেহেতু মানুষের ব্যস্ত জীবন, সাথে সাথে অসুস্থতাও রয়েছে। আল্লাহর ঘরে গিয়ে নীরবে নিভৃত্বে কোরআন তেলাওয়াত, নফল এবাদত করবে। নফল এবাদত ঘরে পড়া উত্তম। কিন্তু মানুষের ব্যস্ত জীবন, ঘরে পরিবেশ নেই। এমন খতিবের সংখ্যাও কম নয় যারা মূল খোতবার সময় মানতে চায় না। ঐ খতিবের পক্ষেও যৌক্তিকতার অভাব নেই।

আগে জুমার নামাজের পরপর খতিব ছাহেব কয়েক সেকেন্ড নিয়ে মোনাজাত করতেন। সুন্নতের পর লম্বা মোনাজাত করতেন। বিগত ৩০/৪০ বছরের ব্যব্যধানে এই রেওয়াজও পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন ঐ মোনাজাত করা হচ্ছে জুমার সালাতের পরপর। যেহেতু সুন্নতের পর মানুষ থাকে না। অর্থাৎ নামাজীদের এত ব্যস্ততা যে খতিব সাহেবের মোনাজাতের জন্য অপেক্ষা করতে চাচ্ছেন না। এতে কি প্রতীয়মান হয় সহজেই অনুমেয়।

খতিব ছাহেব জুমায় মূল খোতবার আগে নসিহত। অতঃপর মূল খোতবা শুরুর আগে প্রায় ৫ মিনিট সময় দেয়া হয় সুন্নত পড়তে। এতে নামাজীরা হয়ত বারান্দায় সুন্নত পড়তেন অথবা মসজিদের ভিতর বসে নসীহত শুনতেন। নসিহত সমাপ্ত হলে মূল খোতবার আগে সুন্নত পড়তেন। কিন্তু সম্প্রতি ঢাকাচট্টগ্রাম সাধারণ মসজিদে ইমাম সাহেব বাংলা নসিহত করার সময় নামাজীরা এসে সুন্নত পড়ছেন। এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

এটা বাস্তব সত্য যে, জুমার নামাজের মাত্র ৮/১০ মিনিটের ব্যবধানে অধিকাংশ নামাজী মসজিদ থেকে চলে যায়। অর্থাৎ একালে মানুষের ব্যস্ততার শেষ নেই। হয়ত ঘরে এসে বিশ্রাম নিবে অথবা নিজে বা পরিবারপরিজন নিয়ে বিয়ে ওয়ালিমা অথবা মেজবানে যাবে, অথবা ঘরে এসে ভাত খেয়ে সফরে যাবে। কাজেই খতিব সাহেবের ভাবতে হবে নামাজীরা মুখে না বললেও মনের গভীরে অসন্তুষ্টি আছে কিনা লম্বা নসিহত ও মোনাজাত নিয়ে।

. আকদ অনুষ্ঠান: ৩০/৪০ বছর বা তার আগে বিয়ে অনুষ্ঠানে বরের এস্টেজে আকদ হত। ঐ সময় আকদের সুন্দর ধর্মীয় পরিবেশ ছিল মনে হয় না। একালে মসজিদে আকদ হচ্ছে তা ইসলাম ধর্ম মতে যথাযথ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয় আসরের নামাজের পর। তা সুন্দর সময় গ্রহণযোগ্য। অবশ্য জুমার পর, মাগরিব এশার পরও আকদ হচ্ছে। একালে আরেক রেওয়াজ শুরু হয়ে গেছে বর ও কনে পক্ষ আত্মীয়স্বজনকে আকদ অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিচ্ছে। এখন বর কনে পক্ষের কথা রক্ষার্থে অনেকে আকদ অনুষ্ঠানে গিয়ে হাজির হচ্ছেন। আকদ ও খোতবা মিলে হয়ত ১০/১২ মিনিট সময়ের ব্যাপার। এখানেও ইমাম সাহেবের নসিহত শেষ হতে চায় না। কিন্তু মানুষের ব্যস্ত জীবন তা ইমাম সাহেবের বুঝা উচিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমাম সাহেব আকদ অনুষ্ঠানে লম্বা সময় নেন। যা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য আকদ অনুষ্ঠানে বর কনে পক্ষ বাহুল্যতা না বাড়িয়ে মসজিদে ঘরোয়াভাবে করাকে উত্তম মনে করি। যেহেতু মানুষের ব্যস্ত জীবন, অনেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও যাচ্ছেন বরকনে পক্ষকে খুশি করতে।

. জানাযা: ৩০/৪০ বছর আগে মোবাইল ছিল না, মাইকের ব্যাপকতাও ছিল না। হয়ত টিএন্ডটির ল্যান্ড টেলিফোন ছিল, তাও সীমিত। কেউ মারা গেলে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব পাঠিয়ে ইন্তেকাল ও জানাযার সংবাদ দেয়া হত। বিগত ৩০/৪০ বছরের ব্যবধানে লাশকে সামনে রেখে শুভেচ্ছা বক্তব্যের নামে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক বক্তব্য দেয়ার রেওয়াজ চলমান। মৃত ব্যক্তির পক্ষের লোকদের এই ঘৃণিত সিস্টেমটা কেন গ্রহণযোগ্য হচ্ছে তা বুঝে আসে না। অপরদিকে যারা বক্তব্য দিচ্ছেন তাদেরও ভাবা উচিত হবে। ইহা দেশে খুব অগ্রহণযোগ্য বিষয় বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। এই রেওয়াজটা দেশ থেকে উঠে যাওয়া উচিত। জানাযার আগ মূহূর্তে সন্তান, না থাকলে জামাতা, তাও না থাকলে ভ্রাতা লাশের পক্ষে ক্ষমা চাইতে পারে মৃত ব্যক্তির আচরণে ব্যবহারে কষ্ট পেয়ে থাকলে। মৃত ব্যক্তির সাথে লেনদেন থাকলে তা দিয়ে দিবে বলে পরিশোধের কথাও বলে। দ্বিতীয় কথাটির উপর আমার আস্থা নেই। মনে হয় না শতে ৯৫ জন খোলা মনে দিবে। জানাযায় সময় থাকলে একজন ধর্মীয় আলেম নসিহত করতে পারেন। জানাযার শুরুর আগ মুহূর্তে ইমাম ছাহেব জানাযার নামাজ শিখিয়ে দিয়ে থাকেন। এই নিয়ে ২০/৩০ সেকেন্ড বা এর বেশি সময় নেয়া উচিত বলে মনে হয় না। যেহেতু জানাযার নির্দিষ্ট টাইম হয়ে গেলেই এক মিনিটও বিলম্ব হওয়া জানাযা পড়তে আগত ব্যক্তিদের মধ্যে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সম্মানিত ধর্মীয় জগত; একালে মানুষের ব্যস্ততার শেষ নেই। সাথে রয়েছে নানান পেরেশানী রোগব্যাধি। কাজেই খোতবায়আকদেজানাযায় মানুষ যাতে আপনাদের উপর বিরক্ত না হয়। আপনাদের হয়ত সময় আছে সময় দিতে পারতেছেন। কিন্তু যাদের জন্য করতেছেন তারা বিষয়টাকে কিভাবে দেখতেছেন তা নিয়ে ভাবতে হবে।

সাম্প্রতিককালে মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশরা জানাযা দাফন আটকিয়ে রাখতেছে বিদেশ থেকে এসে অংশগ্রহণ করার জন্য। লাশের মুখ দেখা নিয়ে আলাদা কোন ফজিলত নেই। এই বিষয়ে আমি দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করেছি। আপনার পিতামাতা শেষ বয়সে জীবিত থাকতে দেশে এসে সেবাশুশ্রূষা করেন। অথবা জানাযা দাফনের পর দেশে এসে যেয়ারতও করেন, তাদের কল্যাণে খরচ করেন। কিন্তু জানাযা দাফন আটকিয়ে রাখবেন দেশে এসে জানাযা পড়বেন তা ইসলাম ধর্মমতে গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্বে অতীব ঘনবসতি দেশের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। মাত্র ৫৫ হাজার বর্গ মাইলের মধ্যে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ বসবাস করে। তেমনিভাবে দেশে প্রায় ৩ লাখের অধিক মসজিদ রয়েছে। মসজিদের মাইক ব্যবহার নিয়ে খতিব/ইমাম সাহেবকে ভাবতে হবে। মুতাওয়াল্লী বা কমিটির সাথে পরামর্শ রাখতে হবে। মসজিদের মাইকের শব্দ কত বড় করা যাবে। এই মাইকের শব্দ কতদূর যাওয়া যাবে। মানুষ আজান শুনে উত্তর দিচ্ছে কিনা, উত্তর দেয়ার মত পরিবেশ কি রকম। বিশ্বে অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, মসজিদের পাশে বহুতল ভবনে বহু মানুষ বসবাস করছে। তৎমধ্যে বৃদ্ধ অসুস্থ নরনারী থাকবে, সাথে শিশুরা ত আছেই।

এই প্রসঙ্গে দুই শিশুর পিতা দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আমাকে বলেন ৩ ও ৫ বছরের শিশু মসজিদের মাইকের বিকট আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে চিল্লায়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠে। আফসোসের বিষয় সওয়াবের নিয়তে মসজিদের বিকট শব্দে মাইক ব্যবহার করে অনেক বয়স্ক রোগীর ও শিশুদের কি রকম যে প্রতিকূলতা হচ্ছে এই অনুভবটুকু আমাদের হচ্ছে না। আজানের সময় কম হলেও প্রায় ৩ মিনিট বা কম বেশি। এই সময় ব্যবসায়ী ব্যবসা বন্ধ রাখবে কিনা, অফিসে, ঘরে মিটিং আলোচনা বন্ধ রাখছে কিনা। বিষয়টি স্পর্শকাতর, মসজিদের কমিটি/মুতাওয়াল্লী/খতিব/ ইমামকে ভাবতে হবে।

আরও ভাবতে হবে মাইকের আওয়াজ কোন দিকে কতদূর পর্যন্ত পৌঁছা দরকার। তার বেশি হলে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাকাত বিত্তবান ও বিত্তহীনদের সেতুবন্ধন
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় যুক্তরাজ্য : সারাহ কুক