গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৩ আসন। যথা–চট্টগ্রামে ১৬ টি, কক্সবাজারে ৪টি, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩টি। তৎমধ্যে দু’টি আসন বাদে বাকী সমস্ত আসনে চট্টগ্রামবাসী ভোট দিয়ে বিএনপিকে জয়যুক্ত করে। এমনিতেই চট্টগ্রাম অঞ্চল বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে প্রসিদ্ধ। বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২১৩ টি আসন পেয়ে দুই তৃতীয়াংশের অধিক লাভ করে। গত ১৭ ফেব্রুয়াডির শপথের পর মন্ত্রীসভা গঠন করল। মন্ত্রী সভায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনাব আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ এর নিকট চট্টগ্রাম অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবী সমাধানে প্রত্যাশা রাখলাম।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে কিছুটা হলেও হতাশা ভাব পরিলক্ষিত হয়। হয়তো এই অঞ্চলের যথাযথ উন্নয়ন অবহেলিত বলে।
চট্টগ্রাম অঞ্চল বিশ্বের মধ্যে অতীব সমৃদ্ধ এরিয়ার মধ্যে অন্যতম একটি বলা যাবে। পূর্বে পাহাড়–পর্বত প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, সমতল উর্বর ভূমি। মধ্যখানে কর্ণফুলী, শঙ্খ, মাতামুহুরী নদী প্রবাহিত। কর্ণফুলীর রয়েছে যেমনি প্রশস্ততা তেমনি গভীরতা। চট্টগ্রামের ইতিহাস কত শত হাজার বছর আগের গবেষণার বিষয়। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রাণ। মংলা বন্দর পায়রা বন্দর সমৃদ্ধ করতে, সচল রাখতে বাৎসরিক হাজার হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। যেহেতু ঐদিকে বঙ্গোপসাগরে গভীরতা নেই। আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গিতে চট্টগ্রাম বন্দরকে পাশ কাটিয়ে মংলা, পায়রা বন্দর সমৃদ্ধ করতে জনগণের করের টাকা ঢালা হচ্ছে। নেয়া হচ্ছে বিদেশী হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ। কিন্তু দক্ষিণ চট্টগ্রাম কক্সবাজার এরিয়ায় সাগরে রয়েছে যথাযথ গভীরতা। ফলে আজ মাতারবাড়ী–মহেশখালীকে বেছে নিয়ে গভীর সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে বহুমুখী শিল্প কারখানা গড়ে তুলা হচ্ছে। তার মূলে সাগরে যথাযথ গভীরতা।
অর্থাৎ চট্টগ্রাম অঞ্চল মহান আল্লাহপাকের প্রদত্ত অতীব সমৃদ্ধ। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের রাজস্বখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এই অঞ্চলে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ তহবিলের অভাবে দেশের অতীব গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রকল্প থমকে আছে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার দাবি দীর্ঘদিনের। বিগত সরকারগুলো সবকিছু ঢাকা কেন্দ্রীক মানসিকতায় বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন থেমে আছে। সাথে সাথে দেশের কল্যাণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রকল্পসমূহ অর্থ বরাদ্দের অভাবে বন্ধ রয়েছে। ইহা আমরা চট্টগ্রামবাসীর খুবই হতাশার বিষয়।
১৯৬০ এর দশকে আমরা এই অঞ্চলের জনগণের মাঝে হতাশা ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেতে থাকে। আর তা হল আমরা আমাদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে দেশের অর্থনীতিতে যোগান দেয়া হয়। তার আয় উন্নয়নে ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। দেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম অর্থ যোগান দিচ্ছে। এই অঞ্চলে ৫৪ বছর যাবৎ যথাযথ উন্নয়ন হয়েছে বলে আমরা স্বীকার করতে পারি না। যা নিম্নে কয়েকটি উন্নয়নের দাবির কথা উল্লেখ করা গেল–
১. চট্টগ্রাম–কক্সবাজার আরাকান মহাসড়ক:-
এই সড়ক দিয়ে বিভিন্ন বাস ট্রাক যেহারে চলাচল করে সে তুলনায় ঢাকা থেকে বরিশাল–খুলনা বা ঢাকা থেকে রাজশাহী–রংপুর তুলনামূলক যানবাহন পরিলক্ষিত হবে না। এই সমস্ত মহাসড়কগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন করা হয়ে হয়েছে। কিন্তু পর্যটন নগরী কক্সবাজার সমৃদ্ধ নগরী চট্টগ্রাম। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর। হাজার হাজার কোটি টাকার শিল্প গড়ে উঠছে। মগনামায় প্রায় ৭ শত একর জমি নিয়ে নৌবাহিনীর ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। দীর্ঘ দিন থেকে আলোচনা আবেদন নিবেদন করেও বিগত সরকারগুলোর নিকট দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়নি চট্টগ্রাম–কক্সবাজার আরাকান মহাসড়কে ৬ লাইনে উন্নতি করা।
২. আনোয়ারা–বাঁশখালী–পেকুয়া–চকরিয়া দ্বিতীয় আঞ্চলিক মহাসড়ক:-
দেশের ভয়াবহ যানজটে স্থবির থেকে যানবাহন চলাচলের আঞ্চলিক মহাসড়ক হল এটি। এই আঞ্চলিক মহাসড়কে দ্রুততার সাথে গাড়ি চলাচল বেড়ে যায় লাখ লাখ জনগণের চাহিদায়। আগে এই মহাসড়কটি ছিল বাঁশখালী–আনোয়ারা–পশ্চিম পটিয়া নিয়ে। নামও ছিল পিএবি তথা পটিয়া–আনোয়ারা–বাঁশখালী মহাসড়ক। এই সড়ক দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারিত হয়ে পেকুয়া–চকরিয়া যোগ হয়। তার মূলে চকরিয়ার কৃতী সন্তান জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ এই অঞ্চলের উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখে গেছেন বিগত বিএনপি সরকারের আমলে। ফলে পেকুয়া–চকরিয়ার পশ্চিমাঞ্চল এই পিএবি সড়কের সাথে সংযুক্ত হয়। এই আঞ্চলিক মহাসড়ক ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছে কুতুবদিয়া–মহেশখালীর লাখও জনগণও।
আনোয়ারা–বাঁশখালী–পেকুয়া–চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়কটি চার লাইনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ। এই আঞ্চলিক মহাসড়কে গুনাগরী চৌমুহনী ভয়াবহ যানজটের কেন্দ্রস্থল। এই চৌমুহনীতে পশ্চিম বাঁশখালীর যানবাহন এবং পূর্ব দিকে পশ্চিম সাতকানিয়ার যানবাহনে সারা দিন যানজট লেগেই থাকে। এখানে প্রয়োজন একটি ফ্লাইওভার। তৈলারদ্বীপ ব্রীজ থেকে আঁকাবাঁকা চাঁনপুর চৌমুহনীকে পাশ কেটে পশ্চিম দিকে প্রায় ১ কি.মি মত বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা অপরিহার্য বলা যাবে।
৩. লাকসাম–নারায়ণগঞ্জ রেলের কটলাইন নির্মাণ:-
সেই ব্রিটিশ আমল থেকে চট্টগ্রাম–ঢাকা রেল যোগাযোগ অনেকটা ৬০/৭০ কি.মি ঘুরপথে লাকসাম থেকে কুমিল্লা–আখাউড়া–ব্রাহ্মণবাড়িয়া–নরসিংদী হয়ে। ব্রিটিশ আমল পেরিয়ে ২৩ বছরের পাকিস্তান আমল পার হয়। অতঃপর ৫৪ বছরের বাংলাদেশ আমল পার হল। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই চট্টগ্রাম–ঢাকা কম দূরত্বের রেল যোগাযোগ আলোর মুখ দেখছে না। এ যোগাযোগকে দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন বলা হয়। দেশের কল্যাণে এত গুরুত্বপূর্ণ।
চট্টগ্রাম–ঢাকা ২৫০ কি.মি মাত্র দূরত্ব। রাজধানী ঢাকা বন্দর নগরী চট্টগ্রাম দেশের প্রধান নগরের সহজ যোগাযোগ দেশের অর্থনীতিতে জনগণের কল্যাণে কতই না গুরুত্বপূর্ণ। নন স্টফ ট্রেনে হয়ত সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার দূরত্ব। ১ ঘণ্টা পরপর চট্টগ্রাম–ঢাকা রেল যোগাযোগ হতে পারে। একটি নন স্টফ আরেকটি ফেনী–লাকসাম–নারায়ণগঞ্জ থেমে। সাথে সাথে রেলের মাধ্যমে বন্দরের হাজার হাজার কন্টেইনার পরিবহন ত আছেই। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমদানিকৃত জ্বালানি তেল বাঁচবে। লাখ লাখ জনগণ আরাম পাবে। চট্টগ্রাম–ঢাকা মহাসড়কে যানবাহন চলাচল অনেকাংশে কমে যাবে।
৪. চট্টগ্রাম–ঢাকা মহাসড়ক ৮ বা ১০ লাইনে উন্নীত করা:-
যে ব্যাপক হারে চট্টগ্রাম–ঢাকা মহাসড়কে লরি করে কন্টেইনার, বাস, ট্রাক, কার সহ বিভিন্ন যানবাহন এত যাতায়াত করে তা দেশের যে কোন সচেতন নাগরিককে ভাবিয়ে তুলবে। ইহা ৮ লাইন বা ১০ লাইনে উন্নীত হওয়া অতীব আবশ্যক। শুধু তাই নয় ২৪০/২৫০ কি.মি দূরত্বের ফ্লাইওভার নির্মাণ করা একালে আহামরী কিছু নয়। কয়েক বছর থেকে শুনে আসছি হবে হচ্ছে বাস্তবে জিরো।
৫. মিরসরাই থেকে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক বাস্তবায়ন:-
এই অঞ্চল ঘূর্ণিঝড় প্রবণ এরিয়া। ঘূর্ণিঝড়ের সাথে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হয়। দেশের কল্যাণে অর্থনীতির কল্যাণে মিরসরাই থেকে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক বাস্তবায়ন দেশের কল্যাণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৬. বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়ন:-
দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর। সামুদ্রিক বন্দর বলতে চট্টগ্রামকে বুঝাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতি বছর হাজার হাজার জাহাজ হ্যান্ডেলিং হয়। কোটি টন কার্গো পরিবহন হয় এই বন্দরে। শুধু তাই নয় লাখ লাখ কন্টেইনার উঠানামার মধ্য দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে আমাদের এই চট্টগ্রাম বন্দর।
চট্টগ্রাম–ঢাকা রেলে হোক সড়কে হোক এই যোগাযোগ দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন হিসেবে খ্যাত।
চট্টগ্রামে রয়েছে বিশাল বিশাল এরিয়া নিয়ে শিল্পাঞ্চল। তৎমধ্যে কোরিয়ান ইপিজেড, আনোয়ারা কেইপিজেড অন্যতম। মিরসরাইতে অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা লাভ করতেছে। জ্বালানি তেলের নিয়ন্ত্রকও এই চট্টগ্রাম।
ভারতের রাজধানী দিল্লি–মূল বন্দর মুম্বাই, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ–মূল বন্দর করাচি, তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা মূল বন্দর ইস্তাম্বুল, চীনের রাজধানী বেইজিং–মূল বন্দর সাংহাই, আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন–মূল বন্দর নিউইয়র্ক।
কাজেই চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করা সময়ের দাবী।
৭. চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতা:-
একটি বড় সমস্যা। সে লক্ষে মহাপরিকল্পনা অপরিহার্য। যাতে বর্ষাকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা না হয়।
৮. পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পর্যটন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা:-
সারা দেশের একমাত্র পাহাড়–পর্বত এরিয়া এই চট্টগ্রাম অঞ্চলে। এখানে সেনাবাহিনী সহযোগিতায় আন্তর্জাতিকমানের পর্যটন স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করে বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাতে অপরিহার্য। প্রতি বছর বিনোদনের জন্য ভ্রমণের জন্য লাখ লাখ মানুষ বিদেশে গমন করতেছে। দেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন স্পট নেই বলা যাবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েক হাজার একর এরিয়া নিয়ে সামরিক বাহিনীর সহায়তায় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্পট করা যেতে পারে। এতে জনগণ বিদেশে গমন না করে এই পার্বত্য চট্টগ্রামে আসতে আকৃষ্ট হবে, বাঁচবে বৈদেশিক মুদ্রা।
৯. সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষা:-
সেন্টমার্টিন দ্বীপকে নিয়মতান্ত্রিকে আনা আবশ্যক। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। এই রকম প্রবাল দ্বীপ নাকি বিশ্বে হাতেগোনা। ইহা নৌবাহিনীর সহযোগিতায় নিয়ম নীতিতে আনা যায়। নৌবাহিনীর সহযোগিতায় এখানে পরিবেশ বান্ধব হোটেল মোটেল নির্মিত থাকবে। কক্সবাজার থেকে হেলিকাপ্টার সার্ভিস থাকবে। ট্যাক্স দিয়ে যাওয়া–আসা করতে হবে। এইভাবে ১/২ মাসের জন্য কড়াকড়ি না করে নিয়মতান্ত্রিকের মধ্যে আনলে দ্বীপ বাঁচবে। সেন্টমার্টিনে মাত্র ৭/৮ হাজার মানুষ বসবাস করে। তাদেরকে উখিয়া/টেকনাফ পাহাড়ি অঞ্চলে স্থানান্তর করা যায়। যেখানে ৭/৮ লাখ রোহিঙ্গা এখানে বছরের পর বছর বসবাস করতেছে সেখানে ৭/৮ হাজার মানুষকে উখিয়া/টেকনাফ অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে আবাসনের ব্যবস্থা করা সরকারিভাবে অতীব সহজ।
অতএব বিএনপি সরকারের প্রতি বিশেষ করে জনাব আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদের প্রতি নিবেদন থাকবে তারা যাতে দীর্ঘ দিন অবহেলিত চট্টগ্রাম অঞ্চলের উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।











