প্রবাহ

তিন আমল দুনিয়া ও আখিরাতে অপরিহার্য

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ

মানবজাতি বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য তিনটি আমল অবশ্য অবশ্যই পালনীয়। যার এই তিনটি আমল নেই তার দুনিয়া ও আখিরাত বৃথা বলা যাবে। তা পবিত্র কোরআন মতে ও হাদীস শরীফ মতে।

এই তিন আমলের মধ্যে প্রথমটি হল সরাসরি আল্লাহর হক। দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি হলমানবের হক। ঈমানের পর দুনিয়াতে মহান আল্লাহপাকের যত হক আছে তৎমধ্যে অন্যতম হক হল নামাজ। যার নামাজ নেই তার কিছুই নেই। নামাজের ব্যাপারে পবিত্র কোরআন মাজীদে ৮২ বার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর রসূল (.)ও নামাজের বিষয়ে বারে বারে তাগাদা দিয়ে গেছেন। এমনকি আল্লাহর রসূল ওফাতের সময়ও নামাজের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে গেছেন।

নামাজের পর অপর তিন ফরজ রয়েছে। যথারোজা, হজ, যাকাত। এই তিন ফরজ সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়। যেমনরোজা, যার শারীরিক সক্ষমতা নেই; সেই হারে বিজ্ঞ ডাক্তারের অনুমতি থাকলে রোজা না রাখা চলে। হয়ত এর কাফফরা স্বরূপ ফিদিয়া দিতে হবে।

অতঃপর হজ। হজ ফরজ হতে তিন শর্ত রয়েছে। যথাযাতায়াত অনুকূল তথা সুবিধা থাকা, আর্থিক সঙ্গতি থাকা, শারীরিক সক্ষমতা। যাকাত, যার অর্থ সম্পদ নেই তার যাকাত নেই।

কিন্তু নামাজ কোন অবস্থাতেই মাফত নয়ই কাজা করা যাবে না। নারী জাতির বড় বিপদ হল প্রসবকালীন। প্রসব বেদনাকালীনও নামাজের টাইম হলে পড়ে নিতে হবে। পুরুষ মৃত্যুপথের যাত্রী, উত্তরদক্ষিণ শুয়ায়ে রাখা হয়েছে। সন্তানেরা একটু একটু জমজমের পানি দিচ্ছে। ঐ অবস্থায়ও হুঁশ থাকলে নামাজ কাজা করা যাবে না।

মনে হয় আমাদের দেশে শতকরা ২৫/৩০ জন ৫ ওয়াক্ত নামাজী। কিন্তু যখন সফরে বের হয় তখন নামাজের খবর থাকে না। বাস্তবতার নিরিখে সফরকালীন নামাজ ঠিক রাখা অনেকটা কঠিন। শুধুমাত্র দেশের ভিতর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাকক্সবাজার যেতে বিকেল বেলা ভ্রমণ করলে আছর বা মাগরিবের নামাজ বা উভয় নামাজ কাজা হয়ে যায়। ট্রেনে, বাসে, নামাজ পড়া কষ্টসাধ্য, তারপরও না পড়ার সুযোগ নেই।

যারা ব্যবসাবাণিজ্য নানান প্রয়োজনে বিদেশে গমনাগমন করে থাকেন তাদের ক্ষেত্রেও নামাজ ঠিক রাখা কষ্টসাধ্য। নামাজীদের বিমানে টয়লেট ব্যবহার পরিহার করা চাই। মুখ সংযত রাখলে অনায়াসে বিমানে টয়লেট পরিহার করা যায়। বিমানের যাত্রা বলতে ২/৩ ঘণ্টা সর্বোচ্চ ৫/৭ ঘণ্টা হয়ত ১০/১২ ঘণ্টা। ডাক্তারের নিষেধ না থাকলে এই সময় পানি ও খাবার পরিমাণ মত খেলে অনায়াসে বিমানের টয়লেট পরিহার করা যাবে। তা অনেকটা নিজের ইচ্ছাশক্তির উপর নির্ভর করে।

দুঃখের বিষয়, হজ বা ওমরাহ করতে গেলে এই পবিত্র সফরেও অধিকাংশ যাত্রী নামাজ কাজা করে। বছরে ১ বার হজ। ৭০ বছরে ৭০ বার হজ করলেও এক ওয়াক্ত নামাজের সমান হবে না। কিন্তু আফসোসের বিষয়, হজ বা ওমরাহ ধর্মীয় সফর, এবাদতের সফর, পুণ্যের সফর করতে গিয়ে নামাজ কাজা করে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দেশে ফিরছে।

আমাদের হানাফী মাজহাব মতে, নামাজ কাজা করলে আল্লাহপাকের কাছে বড় ধরনের অপরাধী ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু আহলে হাদীস ও অন্য মাজহাব মতে নামাজ না পড়লে সাথে সাথে ঈমান চলে যায়। নামাজের এতই গুরুত্ব।

অতএব মহান আল্লাহপাকের অন্যতম প্রধান হক নামাজ যাতে জীবনে কোন অবস্থাতেই কাজা না হয়।

হারাম উপার্জন পরিহার করা: আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে অবস্থান করতেছি, আমাদের মধ্যে যে হারাম রোজগার দুনিয়াআখিরাতে বড় ধরনের ক্ষতিকারক তার অনুভূতি লোপ পেয়ে যাচ্ছে। হারাম উপার্জনকে অতীব সাধারণ ব্যাপার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গ্রামগঞ্জে থেকে উপজেলা জেলা সদর পেরিয়ে রাজধানী পর্যন্ত ঘুষ, দুর্নীতিতে দেশ চেয়ে গেছে। টাকা রোজগার করতে পারলেই হল। এ রোজগার কিভাবে হচ্ছে এই ভয়ভীতি অনুভূতি দিল থেকে এক প্রকার উঠে গেছে বলা যাবে। সাথে সাথে সুদ তো আছেই। ব্যবসাবাণিজ্যে যে কোন কাজ কর্মে সুদ নেয়া, সুদ দেয়া, সুদ খাওয়া একালে অতীব সাধারণ ব্যাপার। ইহা গুনাহ বলে মনেও করা হচ্ছে না। কিন্তু সুদ দাতা, সুদের গ্রহীতা ও সুদের সাক্ষী হওয়া মহাপাপ। তা আমাদের অনুভূতিতে কাজ করতেছে না।

ফেসুবক/ইউটিউবে দেশের একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে প্রশ্ন করা হয়, এলাকার মসজিদের ইমাম ছাহেব যে কারও ঘরে গিয়ে খাবার খায় অর্থাৎ বাড়িওয়ালার হালালহারাম চিন্তা করে না। ঐ ব্যক্তির পেছনে নামাজ পড়া জায়েজ হবে কিনা। উত্তর বললেনজায়েজ হবে না। শুধু তাই নয়, যে কোন মসজিদ মাদ্রাসা এতিমখানা হেফজখানায় যে কারও টাকা নিচ্ছে। টাকা পেলেই হল। এখানে হালালহারাম বাছ বিচার একালে এক প্রকার উঠে গেছে বলা যাবে। এখন ঘুষখোর, সুদখোরের টাকায় নির্মিত মসজিদে আমরা নামাজ পড়তেছি। হালালহারাম বাছ বিচার না করা ইমামের পেছনে আমরা ইক্তেদা করতেছি। এমন কলুষিত পরিবেশ মাত্র ৪০/৫০ বছর আগেও ছিল না।

মানুষ ঘুষ, দুর্নীতি, সুদ নিয়ে জঘন্য অপরাধ করলে মনের ভিতর অপরাধবোধ কাজ করে। একালে তাও উঠে গেছে। সুদখোর, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চাঁদাবাজ থেকে মুক্ত ভাবতে হবে। এমন কলুষিত পরিবেশে আমরা বসবাস করতেছি। একালে কেউ যদি হালালের উপর থাকতে চায়, এর জন্য তাকে অতীব কঠিন পরিবেশ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। নিজের সন্তানভাই বোন আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব, সমাজ ঠিকও রাখতে হবে, আবার তাদের খাবার আতিথেয়তা যাবতীয় কিছু থেকে নিজেকে বেচে রাখতে হবে। যা একালে খুবই কঠিন।

সত্যবাদিতা: ন্যায়পরায়ণ সত্যবাদিতা ইনসাফ বুঝে কাজ করা ইহা আমাদের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমাদেরকে অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। কারও পক্ষে অথবা বিপক্ষে অবস্থান নেয়া যাবে না। ভালকে ভাল বলতে হবে, খারাপকে খারাপ বলতে হবে। ন্যায়কে ন্যায় বলতে হবে, অন্যায়কে অন্যায় বলতে হবে। সক্ষম থাকলে নীরবও থাকা যাবে না। ইসলামে একটা কথা রয়েছে; তুমি অন্যায়কে বাধা দাও। সম্ভব না হলে মুখে বল। তাও না হলে মন থেকে ঘৃণা কর।

আমার সন্তান ভাই পরিবারবর্গ বা অতীব আপন জন কোন অনিয়ম অন্যায় করলে তা স্বীকার করা যাবে না। বরং বাধা দিতে হবে, বলতে হবে। অপরদিকে আমাকে কেউ অপছন্দ করে ঘৃণা করে, তিনিও যদি কোন ভাল করে, ন্যায় কাজ করে তাও স্বীকার করে নিতে হবে, স্বীকৃতি দিতে হবে।

শেষ বয়সে এই রকম কলুষিত পরিবেশ দেখে নিজে নিজে ভাবি। যেহেতু যৌবনকালে ১৯৬০ এর দশকে সুন্দর পরিবেশ দেখেছিলাম। ১৯৭০ এর দশকেও এখনকার মত কলুষিত পরিবেশ ছিল না।

বাস্তবতার নিরিখে এই কালে ন্যায়পরায়ণ মানুষ, হাজারে কয়জন পাওয়া যাবে!

মহান আল্লাহপাক পবিত্র কোরআন মাজীদে কঠোরতার কথা বলেছেন সর্বোচ্চ ৫১০% হতে পারে। গফুরুর রহীম রাহমানুর রহীম অতীব ক্ষমাকারী বান্দার পাপের চেয়ে আল্লাহর ক্ষমা অনেক ঊর্ধ্বে তার মূল্যায়ন হবে ৮০৯০% বা তারও ঊর্ধ্বে। কিন্তু তা হবে শুধু নামাজের ক্ষেত্রে। নামাজ আল্লাহর হক। অপর দু’টি হলবান্দার হক। বান্দার হককে আল্লাহ তাআলা সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান হওয়ার পরও নিজের আয়ত্তে রাখেননি। কাজেই আল্লাহর বান্দাগণের মধ্যে যত মানুষ আপনার হক পাবে এই হক জীবদ্দশায় অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে।

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আজ দিবাগত রাত থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হচ্ছে। আমরা আজ রাত থেকেই প্রতিজ্ঞা করি, যাতে পরবর্তী জীবনে নামাজ কাজা করব না। সুদ, ঘুষ হারামের টাকায় ইফতারসেহেরী খাওয়া থেকে বিরত থাকব। আরও বেঁচে থাকব হারাম রোজগার থেকে। সাথে সত্যবাদী হব, ন্যায়পরায়ণ হব।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরমজান শুধু আত্মশুদ্ধির মাস নয়, ঈমানী শুদ্ধ আত্মার উন্নতির মাস
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় অর্থদণ্ড