আগামীকাল বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারী দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন সুষ্ঠু সুন্দর অবাধ নিরপেক্ষ হওয়া জাতির জন্য অতীব কল্যাণকর। আশা করব, বিএনপি, জামায়েত, এনসিপিসহ সকল রাজনৈতিক দল দেশের বৃহত্তরস্বার্থে সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনকে গুরুত্ব দিবে। দলের চেয়ে দেশ বহুগুণ বড়। সুষ্ঠু নির্বাচন জনগণের অধিকার, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোক। বেশি আসন যে দল পায় সেই দলই সরকার গঠন করবে। ভোটে যাতে কোন অবস্থাতেই কারচুপি না হয়। সুষ্ঠু সুন্দর অবাধ নির্বাচন দেশের জন্য কল্যাণকর, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি বজায় থাকবে।
সুষ্ঠু নির্বাচন জাতির মেরুদন্ড বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। যেহেতু দেশের প্রেক্ষাপট এত খারাপের দিকে চলে গেছে, যা ধারণাতীত। দেশ দুর্নীতি সন্ত্রাস চাঁদাবাজে ভরে গেছে। তা ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা সদর জেলা সদর হয়ে রাজধানী পর্যন্ত ব্যাপকতা লাভ করে। দেশ যেন দুর্নীতিতে মহামারী আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের বুকে দেশের ভাবমূর্তি বলুণ্ঠিত বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচন হয়ে সরকার গঠন করলে বিশ্বের দরবারে দেশের ভাবমূর্তি বাড়বে। বাড়বে জনগণের মান সম্মান।
সুষ্ঠু নির্বাচন হয়ে সরকার গঠন করলে তাদেরও আত্মতৃপ্তি থাকবে জনগণের প্রতিনিধি হয়ে। অপরদিকে দেশবাসীরও সরকারের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে ভোট দিক বা না দিক। দেশের সুষ্ঠু ভোটের প্রক্রিয়া চালু হয়ে গেলে দুর্নীতি দ্রুত কমে যাবে। রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দেয়া লোপ পেতে থাকবে। যেহেতু ভোট ত জনগণের হাতে। জনগণের ভোটে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়ে সরকার গঠিত হবে। দুর্নীতিবাজ সন্ত্রাসীরাও ভয় পাবে। বিরোধী দলেরও উচিত সরকারকে সহযোগিতা করা। যেহেতু তারা বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠন করবে। সরকারেরও কাজ হবে বিরোধী দলকে মূল্যায়ন করা। একনায়কতন্ত্র দেশে আর না আসুক সেই কামনাই থাকবে। একনায়কতন্ত্র দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।
আমাদের দেশে ক্ষমতায় যাওয়ার পর সবকিছু একক নিয়ন্ত্রণে হয়ে যায়। অপরদিকে আমাদের দেশে সবকিছু রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক। এতে বিভাগগুলোকে প্রদেশ করার দাবী আসতেছে। তার মূলে ঢাকা কেন্দ্রীক ক্ষমতাকে হাতের মুঠোয় রাখা যা কোন মতেই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।
চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার দাবী বহুদিনের। তা হবে না, হবার নয়, যতদিন না সরকার ঢাকা কেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে না দেয়।
জীবনে প্রথম সুষ্ঠু ভোট অনুভব ও উপভোগ করি ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। ঐদিন কনকনে শীত পড়তেছিল। সেই সময় ভোট কেন্দ্রে অনিয়ম তো নয়ই ভোট কেন্দ্রে জাল তথা একজনের ভোট আরেকজনে দিতে ভয় পেত। তেমনিভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ পরপর এ তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনেকটা সুষ্ঠু অবাধ বলা যাবে। ৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কয়েক মাসের জন্য ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সময় প্রশাসনকে এভাবে সাজায়, যাতে আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। তা দেশের জন্য, জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। একালে মানুষ সচেতন। ভাল–মন্দ ন্যায়–অন্যায় বুঝে। নিজের ভোট নিজে দিক, স্বাধীন মতামত প্রকাশ করুক। আগামীতে আর কোন স্বৈরশাসক আসুক তা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশের বিরোধী মতকে সম্মান দেখানো হোক। বিরোধী মতও দেশের কল্যাণে হতে হবে।
বলছিলাম ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কথা। এই নির্বাচনে অকল্পনীয় অসাধারণ ফলাফল। যা মনে হয় না এই পূর্ব–পাকিস্তানের মানুষ ফলাফলের আগেও অনুমান করতে পেরেছে। সমস্ত পাকিস্তান মিলে ৩০০ আসন। তৎমধ্যে জনসংখ্যা অনুপাতে পূর্ব–পাকিস্তানে ১৬২ আসন। এর মধ্যে ১৬০ আসন একাই আওয়ামী লীগ পায়। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এই তিন পার্বত্য জেলা মিলে এই আসনটি পায় রাজা ত্রিদীপ রায়। আরেকটি আসন পায় পিডিপির নুরুল আমিন। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৪৮ আসনের মধ্যে ভুট্টুর পিপলস পার্টি একাই পায় ৮১ আসন। এরই রকম অবিশ্বাস্য ফলাফল ঘোষণার আগেও এ অঞ্চলের জনগণ অনুমান করতে পারেনি যে, আওয়ামী লীগ এককভাবে ১৬০ আসন পাবে। পশ্চিম পাকিস্তানে চারটি প্রদেশ। ১৪৮ আসনের মধ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টো একাই পায় ৮১ আসন। ভুট্টো যদি উদার গণতন্ত্রমনা হত তাহলে ইতিহাস অন্যভাবে প্রবাহিত হত।
তেমনিভাবে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জনগণের অনেকটা শতভাগ ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হল সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থাৎ ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হয় বলা যাবে। তা হয় বিচারপতি সাহাব উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এতে বিএনপি পায় ১৪০ আসন। আওয়ামী লীগ পায় ৮৮ আসন।
৫ বছর পরপর পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ এর নির্বাচনও অবাধ সুষ্ঠুভাবে হয়েছে বলা যাবে। দেশে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস থেকে জানতে হবে ১৯৪৭ সালে ভারত–পাকিস্তান তথা উপমহাদেশ বিভাগের পর দেশে অবাধ সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন হয়নি। ঐ সময় পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনরা সারা দেশের নিয়ন্ত্রক। গ্রামে গ্রামে ওয়ার্ড ভিত্তিক মেম্বার নির্বাচিত হত। তারাই ভোট দিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ তথা এমএনএ এবং পূর্ব–পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ এমপিএ নির্বাচিত করতেন। এমএনএ তথা মেম্বার ন্যাশনাল এসেম্বেলী এমপিএ তথা মেম্বার প্রবিনশিয়াল এসেম্বেলী। ১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। একদিকে আইয়ুব খান যিনি নিজে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় প্রেসিডেন্ট। আরেকজন হল পশ্চিম পাকিস্তানরই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর বোন ফাতেমা জিন্নাহ। প্রেসিডেন্ট পদে অন্য প্রার্থীরা অখ্যাত। পূর্ব–পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সহ ভাগাভাগা রাজনৈতিক দল ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন করে। পূর্ব–পাকিস্তানে আইয়ুব খান ও ফাতেমা জিন্নাহ প্রায় অর্ধেক অর্ধেক ভোট পায়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে আইয়ুব খান ব্যাপক ভোটে এগিয়ে যায়।
১৯৬০ এর দশকে ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে সমগ্র পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন হয়। এই সব নির্বাচনে সরাসরি জনগণের ভোট ছিল না। মেম্বারদের ভোটে এমএনএ ও এমপিএ সহ সমস্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হত। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পাকিস্তানের মুসলিম লীগ। সরকারী দলের ব্যাপক ক্ষমতার আধিপাত্য। মেম্বারদের ভাগে রাখতে টাকা ছড়াছড়ি। অতঃপর নানান আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯৭০ সালে সরাসরি জনগণের ভোটে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, দেশে দীর্ঘদিনের দাবী ছিল বিচার বিভাগ আইন মন্ত্রণালয় থেকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এর অধীনে ন্যস্ত হওয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেহেতু কোন রাজনৈতিক দলের না হয়ে অনেকটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারও বলা যেতে পারে। এতে সুযোগ আসায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এর অধীনে ন্যস্ত করে দেয়। ফলে বিচার বিভাগের জেলা ও উপজেলার নিম্ন আদালতে রাজনৈতিক সরকারের আর হস্তক্ষেপ থাকবে না বলা যায়। এখন প্রশ্ন আসে নির্বাচন কমিশন নিয়ে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে গঠিত নির্বাচন কমিশন। তারা নানা দিক থেকে মতামত নিয়ে যাচাই বাছাই করে নির্বাচন কমিশন গঠন করে। ভবিষ্যত যাতে নির্বাচন কমিশনের উপর সরাসরি সরকারের প্রভাব না আসে তা দেশের কল্যাণে অত্যাবশ্যক। আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন হলে আশা করা যায় নির্বাচন কমিশন দেশে সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন আয়োজন করতে পারবে। তবে নির্বাচন কমিশন গঠন করবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আশা করব কাল বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাশ করবে। যাতে আগামী ৫ বছর পরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুন্দর ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনসহ যে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অপরদিকে কাল নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত এনসিপিসহ সকল দল সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনকে গুরুত্ব দিবে। দলের চেয়ে দেশ বড়। দেশের জনগণের অধিকার অনেক অনেক উপরে। ক্ষমতা দখলের জন্য দল তথা দলীয় কর্মীদের যেনতেন নোংরা কাজে ব্যবহার করা না হয়। রাজনৈতিক দল হয়ে যাতে দেশের কল্যাণের স্থলে দেশকে ক্ষতি ধ্বংসের দিকে টেনে নেয়া না হয়।
অতএব আশা করব বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ছোট–বড় রাজনৈতিক দল আগামী কালকের জাতীয় নির্বাচনে সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনকে গুরুত্ব দিবে। যে দল বেশি সিট পাবে সেই দল সরকার গঠন করবে। অন্যদল বিরোধী দলের আসনে বসে দেশের কল্যাণে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক কলামিস্ট।












