ভারতে উত্তর প্রদেশের আজমগড় জিলার হযরত আলহাজ্ব শাহ মাওলানা হাফেজ হামেদ হাসান আলভী (রহ.)। প্রকাশ আজমগড়ী হযরত। তিনি ১৯৫৯ সালে ইন্তেকালের সময় ৪৪ জন খলিফা রেখে যান। তৎমধ্যে অন্যতম চট্টগ্রামের হালিশহরে শায়িত হযরত আলহাজ্ব শাহ হাফেজ মুনির উদ্দিন (রহ.)। তাঁরই তরিকত জগতের অন্যতম মহান ব্যক্তিত্ব হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক আল–কুতুবী (রহ.)।
আজমগড়ী হযরত বৎসরে ন্যূনতম একবার চট্টগ্রামে তরিকতের সফর করতেন। এতে হালিশহর, চন্দনপুরা, চুনতী অবস্থান করতেন। তাঁর ৪৪ জন মহান খলিফাগণের সাথে সাথে শাহ মাওলানা আবদুল মালেক আল–কুতুবীও আজমগড়ী হযরতের সান্নিধ্য লাভ করতেন। হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক (রহ.) তাসাউফ জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর রয়েছে হাজার হাজার কারামত। তৎমধ্যে আজমগড়ী হযরত কেন্দ্রীক একাধিক কারামত রয়েছে। একটি কারামত হল চট্টগ্রাম ট্রেন স্টেশনে। ঐ সময় এই স্টেশনকে বটতলী স্টেশন বলা হত। হয়ত এ স্টেশন সংলগ্ন একটি বৃহৎ আকৃতির বট গাছ ছিল। আরেকটি কারামত হল বাঁশখালী ছনুয়া মনুমিয়াজী বাড়িতে। ছনুয়া মনুমিয়াজী বাড়ির সাথে হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক (রহ.)’র আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে।
আজমগড়ী হযরত ১৯০১ সাল থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এক নাগাড়ে দীর্ঘ ৩৮ বছর চট্টগ্রাম অঞ্চলে তরিকতের সফর করে গেছেন। অতঃপর চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারত–পাকিস্তান তথা উপমহাদেশ বিভাগ এই জাতীয় একাধিক প্রতিকূলতায় দীর্ঘ ১৫ বছর আজমগড়ী হযরতের চট্টগ্রাম সফর হয়নি।
হালিশহর হযরত হাফেজ মুনির উদ্দিন (রহ.) ১৯৫৪ সালের ৩ নভেম্বর তথা ৬ রবিউল আউয়াল ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জন্ম ১৮৮১ সালে বলে জানা যায়। হালিশহর হাফেজ ছাহেব হুজুরের ইন্তেকালের কয়েক মাস পর ১৯৫৫ সালে আজমগড়ী হযরত চট্টগ্রাম সফর করেন। তিনি ঢাকা হয়ে ট্রেনে চট্টগ্রাম আসেন। হালিশহর হযরত হাফেজ ছাহেব (রহ.)’র বাড়ীতে মতান্তরে তিন রাত তশরীফ রাখেন। এখান থেকে লঞ্চে কর্ণফুলী নদী হয়ে কাপ্তাই যান। নির্মাণাধীন কাপ্তাই বাঁধ ঠিকতেছে না বিধায় ঠিকাদার আজমগড়ী হযরতের দোয়া প্রাপ্তি হন। কাপ্তাই এক রাত তশরীফ রাখেন। পরদিন লঞ্চে চাক্তাই ফিরে আসেন। চন্দনপুরা বিখ্যাত জমিদার এয়ার আলী খানের (পেচু মিয়া) বাড়িতে তশরীফ রাখেন। এখানে কয়েকজনকে খেলাফত দানে ভূষিত করেন। তৎমধ্যে গারাংগিয়া হযরত ছোট হুজুর কেবলা অন্যতম। এখান থেকে বিমানে ঢাকা হয়ে ভারত চলে যান।
আজমগড়ী হযরতের দুই সংসারে ১ পুত্র ৯ কন্যা। পুত্রের নাম আবু বকর। মুহাম্মদ বকর নামেও পরিচিতি। পশ্চিম বঙ্গের আসানসোলে কর্মরত ছিলেন। ওখানে ইন্তেকাল করলে তথায় শায়িত। তাঁর স্ত্রীও তথায় শায়িত। আজমগড়ী হযরতের ২ স্ত্রী জন্মভূমি আজমগড়ের কোহন্ডায় পারিবারিক কবরস্থানে শায়িত।
তাঁর পিতা হযরত মিয়া করিম বখশ ছিলেন তাসাউফ জগতের অন্যতম শেখ। ছিলেন ব্রিটিশের সরকারী কর্মকর্তা। পারিবারিকভাবে জমিদার। কোহন্ডাতে রয়েছে দ্বিতল দালান। বাড়ীর সামনে এবাদতখানা। ২/৩ শত মিটার দূরত্বে ১০/১২ শতক এরিয়া নিয়ে পারিবারিক কবরস্থান। এই কবরস্থানে মিয়া করিম বখশ ও তাঁর পীর শেখ নেজাবত আলী শায়িত। আজমগড়ী হযরত অতি বৃদ্ধ বয়সে কোহন্ডা পৈতৃক জমিদার বাড়িতে একা হয়ে পড়েন। প্রয়োজন সেবাশুশ্রূষার। কোহন্ডা থেকে প্রায় ১৫০ কি.মি দূরে উত্তর প্রদেশের বিভাগীয় শহর গোন্ডা। এখানে আজমগড়ী হযরতের আপন ভাগিনা প্রফেসর ড. ইলতেফাদ আহমদ বিয়ে করেন আজমগড়ী হযরতের মেয়ে মোছাম্মৎ মছরুরা খাতুনকে। তারা স্বামী–স্ত্রী উভয়ে কোহন্ডা এসে বৃদ্ধ পিতা/শ্বশুর তথা মামাকে গোন্ডা বাড়িতে নিয়ে যান। ১ বছরের ব্যবধানে ১৯৫৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আজমগড়ী হযরত ইন্তেকাল করলে তথায় তাকে শায়িত করা হয়।
আজমগড়ী হযরত ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রাম সফরকালীন হালিশহরে অবস্থান নিলে হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক (রহ.) কয়েকজন সাথী নিয়ে তশরীফ রাখেন কিছুটা দূরত্বে।
হযরত মিয়া করিম বখশ (রহ.) সরকারী কাজে আজমগড় থেকে কলকাতা আসতে হচ্ছিল। আজমগড় থেকে কলকাতা হয়ে সাগরপথে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে আরেক জাহাজে সাগরপথে আরাকান মায়ানমার যাওয়া–আসা করতেন। আজমগড় থেকে কলকাতা আসবার সময় বান্ডেলে হযরত শাহ সৈয়দ আবদুল বারী আল হাসানী ওয়াল হোসাইনীর মোলাকাত হয়। এতে হযরত সৈয়দ ছাহেব হুজুর হযরত মিয়া করিম বখশের নিকট চিশতিয়া তরিকায় মুরিদ হন।
পরবর্তীতে হযরত মিয়া করিম বখশ (রহ.) তাঁর একমাত্র পুত্র আজমগড়ী হযরতকে কম বয়সে বান্ডেল হযরত সৈয়দ হুজুরের নিকট মুরিদ করিয়ে দেন। বান্ডেল থেকে আজমগড়ের কোহন্ডা যেতে হয় ট্রেনে। শাহগঞ্জ ট্রেন স্টেশনে নেমে এখান থেকে ১০/১২ কি.মি দূরত্বে কোহন্ডা হযরত মিয়া করিম বখশ (রহ.)’র জমিদার বাড়ি। হযরত সৈয়দ ছাহেব হুজুর বান্ডেল থেকে একাধিক বার ট্রেনে শাহগঞ্জ হয়ে কোহন্ডা সফর করেন, একদিকে পীর মিয়া করিম বখশ (রহ.), অপরদিকে পীরজাদা ও নিজের মুরিদ আজমগড়ী হযরত এর জমিদার বাড়ী।
আজমগড়ী হযরত নিজের পীর এবং পিতার মুরিদ হযরত সৈয়দ ছাহেব হুজুরকে শাহগঞ্জ ট্রেন স্টেশন থেকে ১০/১২ কি.মি পথ কাঁধে বহনযোগ্য বাহনে করে নিয়ে যেতেন। তা হয়ত চেয়ার, অথবা তানজান অথবা পালকি। সাথে সৈয়দ ছাহেব হুজুরের অপর খলিফা কোহন্ডার বাসিন্দা হযরত শাহ মাওলানা আবদুস সমদও থাকতেন।
আজমগড়ী হযরত ও শাহ মাওলানা আবদুস সমদ দুইজন দু’দিকে বাহন কাঁধে নিতেন। আজমগড়ী হযরত বান্ডেলের প্রতি এত বেশি নিবেদিত প্রাণ আশেক ছিলেন যে তা ভাববার বিষয়। ১৯৪০ সালে বাঁশখালী ছনুয়ার জমিদার মুহাম্মদ উল্লাহ মিয়াকে মোতাওয়াল্লী করে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট বান্ডেল খানকাহ মোতাওয়াল্লী কমিটি গঠন করেন। বান্ডেল মসজিদ ও খানকাহ এর প্রতি অতিব সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। এতে আজমগড়ী সিলসিলার লাখ লাখ মুরিদের বান্ডেল গমন ও যেয়ারতের প্রতি অতীব নিবেদিত হয়ে উঠেন।
হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক (রহ.) ১৯১১ সালের ২১ জুলাই তথা ১৩১৭ বাংলার ৩ শ্রাবণ ২৪ রজব শুক্রবার কুতুবদিয়া পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মহান পিতা হযরত হাফেজ সামশুদ্দীন (রহ.)। বড় হাফেজ ছাহেব হুজুর হিসেবে পরিচিত। নিজ বাড়ীতে প্রতিষ্ঠা করেন হেফজখানা। এতে আরাকান মায়ানমারসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্ররা আসত পবিত্র কুরআন মজীদের শিক্ষা গ্রহণ করতে। হযরত আবদুল মালেক শাহ (রহ.)’র মাতা বেগম বদিউজ্জমাল ছিলেন তাপসী মহিলা। তাঁর পিতা তথা হযরত আবদুল মালেক শাহ (রহ.)’র নানা কুতুবদিয়া বড়ঘোপ নিবাসি হযরত মাওলানা মঈনউদ্দিন (রহ.)। তিনি ছিলেন অতি উচ্চমানের আলেম। হযরত বেগম বদিউজ্জমালের পবিত্র কুরআনের আয়াত অধিকাংশ মুখস্থ ছিল। শুধু তাই নয় কোরআন মজীদের ব্যাখ্যায় তিনি ছিলেন পারদর্শী।
এই মহিমান্বিত দম্পতির মেধাবী সন্তান শাহ মাওলানা আবদুল মালেক আল–কুতুবী (রহ.)।
নিজে বর্ণনা দেন,“আমি চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসায় আলিম জামাতের ছাত্র, ছুটিতে বাড়িতে আসি। শেষ রাতে যথারীতি তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে মোনাজাত করতে আমার কান্না এসে যায়।” আব্বাজান কান্না শুনে আম্মাজানকে ডেকে বলতেন,“ দেখ! তোমার ছেলে অল্প বয়সে কান্না করছে।” মা জবাব দিলেন,“যেমন বাপের তেমন ছেলে, তাতে অবাক হওয়ার কি আছে!” বাবা বললেন,“তার মাও কম কিসের।”
শাহ মাওলানা আবদুল মালেক (রহ.) ১৯২৬ সাল থেকে ছমদিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু। ১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ঐ সময় তিনি তথা অল্প বয়সে সুলতানুল আউলিয়া হযরত হাফেজ মুনির উদ্দীন নুরুল্লাহ (রহ.)’র সংস্পর্শে আসেন। তাসাউফ জগতের উচ্চাঙ্গে পৌঁছে যান।
তিনি ১৯৩৬/৩৭ সালে ভর্তি হন বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায়। এখানে তিনি প্রতি জামাতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৪০ সালে কুতুবদিয়া লেমশিখালীতে প্রতিষ্ঠা করেন দাদা পীর আজমগড়ী হযরতের নামে হামেদিয়া মাদ্রাসা। দীর্ঘ ৯ বছর তিনি এ মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে সফর করতে থাকেন।
১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে কুতুবদিয়া, বৃহত্তর চকরিয়া পশ্চিমাংশ, মাতারবাড়ী ধলঘাট দ্বীপ, বাঁশখালী, আনোয়ারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কম জনসংখ্যা অধ্যুষিত অবস্থায়ও হাজার হাজার নর–নারী মারা যায়। এই সময় পশ্চিম পাকিস্তানী পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর আজম খান এই অঞ্চলে ত্রাণ তৎপরতায় ব্যাপক অবদান রাখেন। হয়ে যান জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে।
অতঃপর হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক (রহ.) কুতুবদিয়া নিজ বাড়িতে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে থাকেন। এতে তাঁর ব্যাপক কারামত প্রকাশ পেতে থাকে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার জেলা বাদেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দোয়া প্রাপ্তির ঢল নামে।
কুতুবদিয়া দ্বীপের তিনটি ঘাট প্রসিদ্ধ। বড়ঘোপ, উত্তরে ধুরং দক্ষিণে আলি আকবর ড্রেইল। এই তিনটি ঘাট হয়ে কুতুবদিয়ার মানুষ মূল ভূ–খন্ডে এবং চট্টগ্রাম কক্সবাজার যাতায়াত করতেন।
কিন্তু হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক (রহ.)’র কারণে কুতুবদিয়া ও ধুরং মধ্যবর্তী দরবার ঘাট হিসেবে ব্যাপক প্রসিদ্ধতা লাভ করে।
হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক আল–কুতুবী জীবনের শেষ বয়সে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম শহরে আসেন। এখানে তিনি ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০০০ সাল ৭ ফাল্গুন ১৪০৭ বাংলা ১২ জিলহজ্ব ১৪২১ হিজরি শনিবার ইন্তেকাল করেন। পরদিন চট্টগ্রাম মহানগরীর প্যারেড ময়দানে সকালবেলা লাখো ভক্ত অনুরক্তের উপস্থিতিতে পরপর দু’বার জানাযা হয়। অতঃপর কুতুবদিয়া দরবারে ৩য় জানাযায়ও ব্যাপক জনসমাগম হয়। এরপর তাঁর প্রতিষ্ঠিত দরবারে শায়িত করা হয়। হযরত শাহ মাওলানা আবদুল মালেক আল–কুতুবী (রহ.)’র ২৬ তম ইন্তেকাল বার্ষিকীতে তাঁর রফে দরজাত কামনা করছি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।










