চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৬ মে হজ। এদিকে ১৮ এপ্রিল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হতে যাচ্ছে। ধর্ম মন্ত্রণালয় এই বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ বিমান এবং সৌদি এয়ারলাইন ও সৌদি নাস এয়ারলাইনকে চিঠি দিয়েছে।
মৌলিকভাবে বাংলাদেশের হজযাত্রীর কোটা ১ লাখ ২৭ হাজার। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় করোনা মহামারীর পর থেকে হজের ব্যয় অনেকটা দ্বিগুণের মত বেড়ে যায়। ফলে গত ৩ বছর থেকে বাংলাদেশে কোটার তিনভাগের একভাগ হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ এখন হজযাত্রী হচ্ছে সরকারীভাবে তথা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ৪ হাজার ২ শত ৫৯ জন। বেসরকারী এজেন্সীর মাধ্যমে ৭২ হাজার ৩ শত ৪৪ জন। এতে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় হজযাত্রীর প্রায় ৫০ হাজার জনের কোটা খালি যাচ্ছে। বাংলাদেশ বিমান হজ ফ্লাইটের সিডিউল তৈরি করতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অল্প সংখ্যক হজযাত্রী ত আছেই, বেসরকারী কাফেলা এজেন্সীকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু তাদেরকে অনেক আগে থেকে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনার ঘর ভাড়া ঠিক করতে হবে। পবিত্র মদিনায় ৮ দিন এবং পবিত্র মক্কায় হজ সিজন মতে ঘরভাড়া আগে ভাগে করে রাখতে হয়। কাজেই হজ ফ্লাইট সিডিউলে কাফেলা এজেন্সী পরামর্শ সুবিধা–অসুবিধার গুরুত্ব অত্যধিক।
আগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে পবিত্র মদিনা সরাসরি ফ্লাইট ছিল না। ক’বছরের ব্যবধানে চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে বিমানের পবিত্র মদিনায় সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। হজ ফ্লাইট সিডিউলে বাংলাদেশ বিমানকে চট্টগ্রাম থেকে জেদ্দার পাশাপাশি পবিত্র মদিনার ফ্লাইটকে সমান্তরালে গুরুত্ব দিতে হবে। যেহেতু ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য জেলার হজযাত্রী বাংলাদেশ বিমানের পাশাপাশি সৌদি এয়ারলাইন ও সৌদি নাস এয়ারলাইনে হজযাত্রী পরিবহন করে থাকে। কিন্তু চট্টগ্রাম অঞ্চলের হজযাত্রীরা শতভাগ বাংলাদেশ বিমানের উপর নির্ভরশীল থাকে। যেহেতু চট্টগ্রাম থেকে সৌদি এয়ারলাইন ও সৌদি নাস এয়ারলাইন অপারেট করে না।
হজ ফ্লাইটের সাথে হজের আহকাম বিধি বিধান সংশ্লিষ্ট। আগে সরকারী হাজীরা প্রথম কয়েক ফ্লাইটে ঢাকা থেকে জেদ্দা হয়ে পবিত্র মক্কায় যেতেন। এখানে কয়েক দিন থেকে হজের আগে পবিত্র মদিনায় যেয়ারত করে আসতেন। এতে ধর্ম মতে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। যারা হজের আগে পবিত্র মদিনা যাবেন তারা পবিত্র মক্কা না ঢুকে জেদ্দা হয়ে অথবা সরাসরি পবিত্র মদিনা গমন করা অত্যাবশ্যক। অবশ্য গত কয়েক বছর থেকে সরকারী হাজীও ঢাকা থেকে সরাসরি পবিত্র মদিনা যাচ্ছেন। যা হজের আহকামে সুন্দর অতীব গ্রহণযোগ্য।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে শতের কম বেশি অনুমোদিত হজ এজেন্সী কাফেলা রয়েছে। তৎমধ্যে ৪০/৫০ টি এজেন্সী অতীব সক্রিয়। বাংলাদেশ বিমানের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ডিস্ট্রিক ম্যানেজার এর দায়িত্ব হবে এজেন্সী প্রধানের সাথে বারে বারে বসে চট্টগ্রাম থেকে হজ ফ্লাইট ঠিক করা।
গত বছর (২০২৫) চট্টগ্রাম থেকে ২২ টি হজ ফ্লাইটের মধ্যে মাত্র ২টি ফ্লাইট নাকি চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি পবিত্র মদিনা দেয়া হয়েছে। বাকী ২০ টি ফ্লাইট চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি জেদ্দা। এতে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি এজেন্সী হজযাত্রী নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে।
একাধিক এজেন্সী প্রধান বলেন, পবিত্র মক্কা মিসফালাতে গত এক বছরের ব্যবধানে অনেক দালান ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশী হজযাত্রীর প্রথম পছন্দ মিসফালাহ অতঃপর জিয়াদ। এতে এজেন্সীরা হজযাত্রীর ঘর ঠিক করতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেছেন।
হজ বিষয়ে বিগত ১০/১৫ বছরের ব্যবধানে ঢাকা বিমান বন্দর হয়ে হজ ফ্লাইটের অভিজ্ঞতা নেই বললে চলে। যেহেতু চট্টগ্রাম থেকে হজ ফ্লাইট চালু রয়েছে। আমারও পছন্দ বাংলাদেশ বিমান।
চট্টগ্রাম বিমানের ডিস্ট্রিক ম্যানেজার ও বিমান বন্দরের স্টেশন ম্যানেজারের প্রতি সুপারিশ থাকবে; তারা যাতে বিমান বন্দরে হজযাত্রীর সহযোগিতায় আরও তৎপর হয়। হজযাত্রী বলতে অধিকাংশ বয়স্ক, ৪০ দিন বা কম বেশি সময়ের সফর, লাগেজ থাকে বড়। ঢাকার অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের কল্যাণে বেসরকারী বিমানের স্টাফরা চট্টগ্রাম বিমান বন্দরের বাইরে ঘুরঘুর করে যাত্রীদের সহযোগিতার করার জন্য। বিমানও কম করছে না। হজযাত্রীর ক্ষেত্রে আরও প্রত্যাশা রাখলাম।
বিমান বন্দরের টয়লেট আন্তর্জাতিক মানের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন নয়। বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি আবেদন থাকবে যাতে টয়লেট, অজুখানা পরিষ্কারে আরও তৎপর হন।
বাংলাদেশ বিমানের হজ ফ্লাইট আর সিডিউল ফ্লাইট এক নয়। হজ ফ্লাইটের ভাড়া অনেক অনেক বেশি। অনেকটা দ্বিগুনের কাছাকাছি। সেই অনুপাতে বিমানের আতিথেয়তা দুর্বল।
সাধারণত হজ ফ্লাইটে বোয়িং–৭৭৭ ব্যবহার হয়ে থাকে। যা ৭৮৭ ড্রিম লাইনার থেকে একশতেরও অধিক আসন রয়েছে। বোয়িং–৭৭৭ আসন সংখ্যা প্রায় ৪২৫। তৎমধ্যে ৩৫টি সিট রয়েছে বিজনেস ক্লাস। হজ ফ্লাইটে আগে এই সিটগুলো উচ্চবিত্ত হজযাত্রীগণকে ফ্রি দেয়া হত। এখন কিছু কিছু ডলার নেয়া হচ্ছে। এই ব্যাপারে আমি বাংলাদেশ বিমানকে বারে বারে লেখালেখি করছি সাথে যাওয়া–আসা এই সিটগুলো ৫০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে। যাওয়া–আসায় হয়ত সর্বোচ্চ ১০০ ডলার নিতে পারে। কিন্তু গত হজে নিল যাওয়া–আসা ১৮০ ডলার। যা গ্রহণযোগ্য নয়। এই নিয়ে একাধিক হজযাত্রী আপত্তি জানায়। বাংলাদেশী প্রায় ২০ হাজার টাকার উপরে দিয়ে বিজনেস ক্লাস সিট নিলাম, দেখছি আমার আশেপাশে মাগনা (ফ্রি) বসে আছেন। বিজনেস ক্লাসে হজযাত্রীর আকর্ষণ বাড়াতে সেই অনুপাতে সুযোগ–সুবিধা দিলে অসুবিধা কোথায়। বিজনেস ক্লাসের মান অনুপাতে ৬০ কেজি ওজন দিতে পারে; যাওয়া–আসাকালে বিমান বন্দরে লাউঞ্চ দিতে পারে। তখন স্বভাবতই হজযাত্রীরা বিজনেস ক্লাসের সিটগুলো ডলার দিয়ে নিয়ে নিবে।
বাংলাদেশ বিমান ১৯৮০ এর দশকে জেদ্দা নামার আগে জেদ্দা বিমান বন্দরে খাবার জন্য একটি শুকনো খাবারের প্যাকেট দিত। পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। সিস্টেমটি পুনরায় চালু করা হোক। সাথে সাথে হজযাত্রী দেশে ফিরতে জেদ্দা বা পবিত্র মদিনা বিমান বন্দরে বাংলাদেশ বিমানে রিপোর্ট করে লাগেজ জমা দেয়ার সময় একটু শুকনো খাবারের প্যাকেট দিতে পারে। বিমান ত হজ ফ্লাইটে লাভ করছে, হজযাত্রীর কল্যাণে খরচ করা কোন অসুবিধা দেখছি না।
হজযাত্রীর প্রতি পরামর্শ থাকবে ৬/৭ লাখ টাকা, হয়ত আরও কম বা বেশি টাকা দিয়ে হজ করতে যাচ্ছেন। ইহা দীর্ঘ ৪০ দিন বা কম–বেশি সময়ের সফর। এবাদতের সফর, ধর্মীয় সফর। হজের ধর্মীয় প্রস্তুতি অত্যাবশ্যক। একালে ধর্মীয় প্রস্তুতির চেয়ে পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতি অতীব গুরুত্ব বহন করছে। যেমন–মহিলা হলে হজের সফরে ঘর–বাড়ী কে দেখাশুনা করবে, সন্তানেরা কিভাবে থাকবে। পুরুষ হলে চাকুরী থেকে ছুটি নেয়া, ব্যবসায়ী হলে ব্যবসা গুছানো এই সবের গুরুত্ব অত্যধিক বেড়ে গেছে।
হজের সফরে ধর্মীয় প্রস্তুতি অত্যাবশ্যক। হজের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব, বিধি–নিষেধ সবকিছু শিখে নেয়া আবশ্যক। পবিত্র মক্কায় তাওয়াফ ও সায়ী এবং পবিত্র মদিনায় রওজাপাকে সালাম পেশ করতে দোয়া–দরূদ ভালভাবে জানা থাকলে তা আমল করতে মন থেকে আবেগ এসে যায়। যা অত্যাবশ্যক। হজের উপর অনেক দোয়া–দরূদের পুস্তক পাওয়া যায়। চট্টগ্রামে বড় বড় আলেমের সহযোগিতায় আমারও দোয়া–দরূদের ছোট একটি সংকলন রয়েছে। নাম দেয়া হয়েছে ‘তাওয়াফ ও যেয়ারত’। যা ১৯৯৮ সাল থেকে পুনঃ পুনঃ মুদ্রিত হয়ে আসছে। প্রকাশ করতেছে ‘সালমা–আদিল ফাউন্ডেশন’, গুলশান–১, ঢাকা। এই ছোট পুস্তিকাটি সকল মতাদর্শের নিকট গ্রহণযোগ্য। ইচ্ছা করলে যে কোন কাফেলা–এজেন্সী এবং হজ বা ওমরাহ যাত্রী বিনা হাদিয়ায় সংগ্রহ করতে পারেন ০১৮৪১–২৪৪৩৫৫।
চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে হজযাত্রী কল্যাণ পরিষদ। এটি কোন কাফেলা–এজেন্সী নয়। তেমনি বাণিজ্যিক সংগঠন/প্রতিষ্ঠানও নয়। প্রতি বছর রমজানের পর হজ ফ্লাইট ছাড়ার আগে চট্টগ্রাম মহানগরীতে কোন হলে হজ ও ওমরাহ যাত্রীর প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়ে আসছে। আপনি উক্ত নামারে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানতে পারবেন। পরিশেষে বাংলাদেশ বিমান হজ ফ্লাইট পরিচালনায় সাফল্য কামনা করছি। যাতে হজযাত্রীরা সুন্দর সুষ্ঠুভাবে আরামে দেশ থেকে যাওয়া–আসা করতে পারে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।












