পবিত্র মদিনার ইতিহাসে দৃষ্টিপাত
পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারা। উম্মতে মুহাম্মদীর হৃদয়ে অতীব পবিত্র স্থান তথা শহর। হিজরতের আগে এই পবিত্র মদিনার নাম ছিল ইয়াছরিব। কিন্তু পবিত্র মক্কায় ১৩ বছর নব্যুওয়াত জিন্দেগীর পর আল্লাহর রাসূল (স.) এই ইয়াছরিবে হিজরত করেন। ইয়াছরিব এর নাম পাল্টিয়ে দেন (পবিত্র) মদিনা।
বিশ্বের প্রাচীন জনপদের মধ্যে অন্যতম জাজিরাতুল আরব ও মুলকে শাম। জাজিরাতুল আরবে হেজাজ প্রদেশের শহর “ইয়াছরিব” আল্লাহর রসূল (স.) নামকরণ করেন মদিনা (মুনাওয়ারা)।
মদিনা মুনাওয়ারা মক্কা মোকাররমা হতে ৪২৫ কিলোমিটার এবং জেদ্দা হতে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে। মদিনা মুনাওয়ারা ২৯টি নামে সমধিক প্রসিদ্ধ, কিন্তু বিশিষ্ট ঐতিহাসিক আলশামহুদী ৯৪টি নাম উল্লেখ করেছেন। মদিনা মুনাওয়ারার অবস্থান সমতল ভূমিতে হলেও এর উত্তরে উহুদ, দক্ষিণে “ঈর” পর্বত রয়েছে। শহরের পশ্চিম ও পূর্বদিকে হাররাতুল ওয়াবরা ও হাররাতুল ওয়াকিম অবস্থিত যা কালো পাথর এলাকা। শহরের আশপাশে কয়েকটি উপত্যকা রয়েছে। এ সকল উপত্যকা বাগান ও কৃষি কাজের জন্য প্রসিদ্ধ । ইয়াছরিব নামকরণ হিসেবে জানা যায়, এ জনপদের গোড়াপত্তন করেছেন আছরিব ইবনে কানিজা। তাঁর নামানুসারে এ শহরের নামকরণ হয় আছরিব, তিনি ছিলেন হযরত নূহ (আ.) এর বংশধরের মধ্যে ৭ম অধঃস্তন পুরুষ। হেজাজে আমালিকা গোত্রের জুলুম নির্যাতন বৃদ্ধি পেলে হযরত মূসা (আ.) তাদেরকে দমন করার জন্য একদল মোজাহিদ প্রেরণ করেন। এতে আমালিকারা পরাজয় বরণ করে এবং তাদের নেতা নিহত হয়। এ মোজাহিদ সেনাদল শা‘মে/সিরিয়ায় পৌঁছল। তখন হযরত মূসা (আ.) এর একটি নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণের অপরাধে তাদেরকে হেজাজে ফেরৎ পাঠানো হয়। তারা মদিনা মুনাওয়ারাসহ হেজাজের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস করতে থাকেন। খ্রীষ্টবর্ষের প্রথম দিকে ৭০ সালে রোমান ও ইহুদীদের মধ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের পরিণতিতে সমস্ত ফিলিস্তিন ও বায়তুল মোকাদ্দাস ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায়। ইহুদীরা বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রতিকূলতা হেতু ইহুদীদের অনেকে হেজাজে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। তৎমধ্যে মদিনা মুনাওয়ারায় ৩টি গোত্র রয়েছে, তারা হল বনু কায়নুকা, বনুনাদির ও বনু কোরাইজা।
ইতিহাসবিদগণ উল্লেখ করেন যে, উক্ত ৩টি গোত্র মিলে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সংখ্যা দু‘হাজারের উপর ছিল। প্রতিটি গোত্রের প্রায় সমসংখ্যক লোক ছিল। এ গোত্রসমূহের আবার উপগোত্রও ছিল। ইহুদী এ গোত্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল তিক্ত। প্রায় সময় দাঙ্গা–হাঙ্গামা খুন–খারাবী লেগেই থাকত।
মদিনা মুনাওয়ারায় ইহুদীরা বিভিন্ন মহল্লায় অবস্থান করত। সেখানে তাদের দুর্গ ও মজবুত ইমারত নির্মিত ছিল। শত্রুদের আক্রমণের তীব্রতায় তারা তথায় আশ্রয় নিত। তারা মদিনা মুনাওয়ারা সহ এতদঅঞ্চলের উপর প্রভাব বিস্তার করছিল।
ইহুদীদের মাতৃভাষা ছিল হিব্রু। হেজাজে এসে তারা ক্রমেই আরবি ভাষা শিখে নিয়েছিল। ফলে তাদের ধর্মীয় কাজে হিব্রু ভাষা ব্যবহার সীমাবদ্ধতা আরবি ভাষায়ই তারা ব্যবহার করত। মদিনা মুনাওয়ারায় ইহুদি ব্যতীত খ্রিস্টানরাও বসবাস করত।
ইহুদীরা নিজেদের চিরন্তন ধর্মের ও ঐশী বিধানের ধারক বাহক মনে করত। তারা তাদের শিক্ষায়তনে বিভিন্ন ধর্মীয় বিধান ও নবী রসূলের জীবনী পাঠ করত। তারা তাদের ধর্মীয় যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান পৃথকভাবে আদায় বা উদযাপন করত। এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, ইহুদীরা শিক্ষাদীক্ষা জ্ঞানগরিমায় এগিয়ে ছিল আরবীয়দের চেয়ে, যদিওবা তাদের চরিত্র হল মোনাফেকী।
ইয়েমেনে তখনকার বিখ্যাত বাঁধ ধ্বংসের পর তথাকার আওস ও খাজরাজ আরবীয় গোত্র মদিনা মুনাওয়ারায় এসে বসতি স্থাপন করে। আওস গোত্রের লোকেরা উত্তর ও পূর্বদিকে এবং খাজরাজ গোত্রের লোকেরা মধ্য ও উত্তর দিকে বসতি গড়ে তোলে। এতে স্বভাবতই আরব ও ইহুদীদের মধ্যে কলহ বিবাদ লেগে থাকত। আবার আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ বেধে যেত। আরবীয় আওস ও খাজরাজ গোত্রের বংশীয় আভিজাত্যের স্বীকৃতি মক্কা মোকাররমার কোরাইশরা দিত। এ গোত্রের সঙ্গে কোরাইশদের আত্মীয়তা ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের ইতিহাস রয়েছে। তারপরও মক্কা মোকাররমার কুরাইশরা নিজেদেরকে মদিনা মুনাওয়ারার আরব গোত্রদের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর মনে করত। আল্লাহর রসূল (স.)-র দাদা আবদুল মুত্তালিব, তাঁর পিতা হাশিম ইবনে আবদে মনাফ। আবদুল মুত্তালিবের পিতা হাশিম এর বিয়ে হয় মদিনা মুনাওয়ারার খাজরাজ গোত্রের মেয়ে সালমার সাথে। অর্থাৎ আল্লাহর রসূল (স.)-এর দাদা আবদুল মোত্তালিবের নানার বাড়ি মদিনা মুনাওয়ারায়। ফলে আল্লাহর রসূল (স.)-র পিতা আবদুল্লাহ সিরিয়া থেকে মক্কা মোকাররমায় ফিরতে অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর পিতার নানার বাড়ি বা দাদার শ্বশুরবাড়ি তথা মদিনা মুনাওয়ারায় যাত্রাবিরতি দেন। ঐ অসুস্থাবস্থায় হযরত আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। তাকে বর্তমান রওজা পাকের পশ্চিম সংলগ্ন প্রায় এক শত থেকে দেড়শত মিটার দূরত্বে সমাহিত করা হয়। সম্ভবত ঐ এলাকা সালমার পৈতিৃক তথা পারিবারিক আবাসস্থল হবে।
১৯৭৫ সাল পর্যন্ত হযরত আবদুল্লাহর কবরের স্মৃতিচিহ্ন ছিল। বর্তমানে তাঁর এই স্মৃতিচিহ্ন বিলীন করে দেয়া হয়েছে।
ইহুদী ও আরব একই জনপদে অবস্থানের কারণে ইহুদীদের ধর্মীয় অনুভূতি, দিক নির্দেশনাসহ যাবতীয় কিছুতে আরবীয়গণ পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকা স্বাভাবিক। ইহুদীরা বলে বেড়াত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ আছে, একজন নবী আসবেন এবং নবী আসার সময় অত্যাসন্ন। এমনিতেই আল্লাহর রসূল (স.) ছোটবেলা আবুতালিবের সঙ্গে সিরিয়া গমন করলে এক খ্রীষ্টান পণ্ডিত আল্লাহর রসূল (স.)-কে দেখে চিনতে পারলে ভবিষ্যতে উনি নবী হবেন বলেন। যেহেতু সাম্প্রতিক সময়ে আগত আল্লাহর রসূল (স.)’র অবয়ব সম্পর্কে যাবতীয় কথা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
মদিনা মুনাওয়ারায় আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে নানান বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও উভয় গোত্র আরবী হিসেবে পরবর্তীতে পুনরায় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হত। আল্লাহর রসূল (স.) হজ্বের মৌসুমে বহিরাগতদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। মদিনা মুনাওয়ারা থেকে আওস ও খাজরাজ গোত্রের কিছুলোক হজ্ব করতে আসলে তাদের কয়েকজন মক্কা মোকাররমার আকাবার নিকট আল্লাহর রসূল (স.) এর সাথে মিলিত হন। আল্লাহর রসূল (স.) তাদের ইসলামের দাওয়াত দেন এবং কোরআন মজীদের অমিয়বাণী তেলাওয়াত করে শোনান। তাঁরা সংখ্যায় ছিল ছয়জন। উভয় গোত্রের এ সকল লোক মদিনা মুনাওয়ারায় ইহুদীদের প্রতিবেশী ছিল। এক আলাপচারিতায় ইহুদীরাও স্বীকার করে নিল অল্পদিনের মধ্যে কোন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। পরবর্তী বছর আওস ও খাজরাজ গোত্রের ১২ ব্যক্তি হজ্বের মৌসুমে একই স্থান আকাবায় আল্লাহর রসূল (স.) সাথে মিলিত হয়। তারা আল্লাহর রসূল (স.)’র হাতে ঈমান এনে চুরি, ব্যভিচার, কন্যাসন্তান হত্যা না করার এবং সৎকার্য চালিত হওয়ার আনুগত্যে ও তাওহিদ বিষয়ে বায়াত গ্রহণ করেন। মদিনা মুনাওয়ারা প্রত্যাবর্তনকালে তাদের অনুরোধের প্রেক্ষিতে আল্লাহর রসূল (স.) তাদের সাথে মুয়াল্লিম হিসেবে হযরত মোছআব ইবনে ওমর (র.) কে সাথে দেন। মদিনা মুনাওয়ারা পৌঁছে হযরত মোছআব (র.) ঘরে ঘরে ইসলামের দাওয়াত দিতে তৎপর হন। এতে মদিনা মুনাওয়ারায় ইসলামের প্রসার লাভ করে ।
পরবর্তী বছর হযরত মোছআর (র.) মক্কা মোকাররমা ফিরে আসলে তাঁর সাথে আনসারগণের একটি কাফেলা ছিল, তাঁদের সংখ্যা ছিল ৭৩ জন। তৎমধ্যে দুইজন মহিলাও ছিল। হজ্বের পর তাঁরা আকাবায় রাত্রিবেলা আল্লাহর রসূল (স.)’র সাথে মিলিত হন। আল্লাহর রসূল (স.) তাঁর চাচা হযরত আব্বাছ (র.) (তখনো তিনি ঈমান আনেন নি) কে সাথে নিয়ে গভীর রাতে আকাবায় পৌঁছেন। আল্লাহর রসূল (স.) ওয়াদার পর তাদেরকে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তা হল তাঁরা নিজেদের পরিবার পরিজনের অনুরূপ আল্লাহর রসূল (স.)’র প্রতি মুহাব্বতসহ হেফাজতে সদা তৎপর থাকবেন। আকাবার এ বাইয়াতই ইসলামের ইতিহাসে একটি সমুজ্জ্বল আলোকবর্তিকা বলে স্বীকৃত।
আনসারগণের কাফেলা মদিনা মুনাওয়ারা পৌঁছে ইসলামের জোয়ার বইয়ে দেন। মহান আল্লাহপাক তাঁর রসুল ও দ্বীনের সাহায্য সহযোগিতার জন্য আওস ও খাজরাজ গোত্রকে দাঁড় করিয়ে দেন। এ গোত্র দুটি ইয়াছরেবের প্রধান গোত্র ছিল। এ গোত্রদ্বয় এর লোকেরাই মদিনা মুনাওয়ারাবাসী আনসার সাহাবা হিসাবে গৌরবজনক উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।
মানবের স্বভাব চরিত্রে মাটির প্রভাবের প্রতিফলন অস্বীকার করা যাবে না। তেমনিভাবে আওস ও খাজরাজ গোত্রদ্বয় মক্কা মোকাররমার কুরাইশদের বিপরীত নম্র স্বভাব ও কোমল প্রকৃতির ছিলেন। কঠোরতা, অহংকার, সত্য প্রত্যাখ্যান, ওয়াদা খেলাপের মত নিম্ন স্বভাব হতে তাঁরা ছিলেন পূতপবিত্র। ইহুদীদের সাথে সহাবস্থানের দরুণ দীনের তাৎপর্য, পরিভাষা, তৌহিদ, রেসালত, আখেরাতসহ ইত্যাদি বহু কিছু পূর্বে থেকে অবহিত থাকার প্রেক্ষিতে তাঁরা মদিনা মুনাওয়ারা ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ভরিয়ে তোলেন। আকাবার ঐ বাইয়াতের পর থেকে আল্লাহর রসূল (স.) মক্কা মোকাররমার সাহাবাগণকে পর্যায়ক্রমে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের অনুমতি প্রদান করতে লাগলেন।
অতঃপর হিজরি ১৩ সনে আল্লাহর রসূল (স.) হযরত আবু বকর (র.) কে সাথে নিয়ে পবিত্র মদিনায় অতীব গোপনে ঝুঁকিপূর্ণ লোমহর্ষক হিজরত করেন। এই সব বিষয় এবং পরবর্তী বিষয় সচেতন উম্মতে মুহাম্মদীর জানা থাকার কথা।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।











