প্রবাসী আয় বৃদ্ধি : দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্বস্তি

| শুক্রবার , ২ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ

প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধিতে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। বলা চলে, দেশে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে ঢল নেমেছে। পটপরিবর্তনের পর থেকে টানা রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি মাসে উল্লেখযোগ্য হারে রেমিট্যান্স আসছে দেশে। ডিসেম্বরের প্রথম ২৭ দিনে ২৭৫ কোটি মার্কিন ডলার আয় পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা দেশীয় মুদ্রায় ৩৩ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে)। ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানিয়েছেন।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, যে ধারায় রেমিট্যান্স আসছেসেটি অব্যাহত থাকলে ডিসেম্বর মাস শেষে প্রবাসী আয় ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এক শক্তিশালী ভিত্তি গড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি মাসের ১ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৭৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২৪০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। সে হিসাবে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবাসী আয় বেড়েছে। এর আগে গত নভেম্বরেই দেশে চলতি অর্থবছরের সর্বোচ্চ ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। তার আগে গত অক্টোবর ও সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছে যথাক্রমে ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ও ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। আর গত আগস্ট ও জুলাইয়ে যথাক্রমে দেশে এসেছিল ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ও ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৫৭৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের একই সময়ে ১ হাজার ৩৫৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। সে হিসাবে প্রায় ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবাসী আয় বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ, প্রণোদনা এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের উন্নতি প্রবাসী আয় বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্বস্তি বিদ্যমান রয়েছে।

সার্বিকভাবে বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগে মন্থরতার মধ্যেও রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বিনিয়োগবান্ধব নীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আমদানিরপ্তানির ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। বর্তমানে জনশক্তি রফতানি কম হলেও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির আরও কিছু কারণ আছে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলেন, রেমিট্যান্স বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছু অ্যাপস তৈরি করেছে। এসব অ্যাপসের মাধ্যমে টাকা আনতে ওইসব দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশে বিকাশ বা নগদের মতো প্রতিষ্ঠানের ওয়ালেট ব্যবহার করে রেমিট্যান্স আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে বিদেশে থাকা কর্মীরা ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াও ওয়ালেটের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পাঠাতে পারছেন দেশে। এসব কারণে হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমেছে, আর হুন্ডির দৌরাত্ম্য কমার কারণেও রেমিট্যান্স বেড়েছে। বিদেশি কর্মীরা এখন বৈধ চ্যানেলে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া রেমিট্যান্স হাউসগুলোর অনিয়মও বন্ধ হয়েছে। যেহেতু আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অপরিসীম, তাই এ আয় যেন কখনো না কমে, বরং কীভাবে তা বাড়ানো যায় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানি নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচিত। শুধু নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়, নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবেও জনসংখ্যা রফতানিকে বিবেচনা করা যায়। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে জনসংখ্যা রফতানির যেমন প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে, তেমনি বিদেশে কর্মরত জনশক্তির পারিশ্রমিক যাতে কাজ ও দক্ষতা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, সেজন্যেও সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, জনসংখ্যা রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকার যদি কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করে, তাহলে জনসংখ্যা রফতানির সুফল ও রেমিট্যান্স প্রবাহ আমাদের অর্থনীতির ইতিবাচক খাতের সঙ্গে একই ধারায় প্রবাহিত হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে